গীবত এবং অপবাদ প্রসঙ্গ
গীবত কী ?
গীবত শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দোষারোপ করা, অনুপস্থিত থাকা, পরচর্চা করা, পরনিন্দা করা, কুৎসা রটনা করা, পিছে সমালোচনা করা ইত্যাদি।
মানুষ সব সময় সুখ ও শান্তি চায়।শান্তি মানুষের একটি পরম কাংখিত বিষয়।
কিন্তু এই প্রত্যাশিত সুখ-শান্তি নির্ভর করে সমাজবদ্ধ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর। উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্র এসব পার্থক্যই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। মানুষের পারস্পরিক পরিচয়ের জন্যই এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ সূরা হুজরাতে এরশাদ করেছেন, হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।
(সূরা হুজুরাত: ১৩)
মানব সমাজের এই পার্থক্য আল্লাহ্ কতৃক পরিকল্পিত। সুতরাং যে যেই অবস্থায় আছে সেইটুকুতে সন্তুষ্ট থাকাই ( তাকওয়া)। যেসব কারণে সমাজের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ বিনষ্ট হয়, সমাজ বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হয়, সামাজিক মূল্যবোধ বিনষ্ট হয়, পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হয়, তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো গীবত, যা মানুষকে নিকৃষ্টতম প্রাণীতে পরিণত করে।
সাহাবি আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, "গীবত কাকে বলে, তোমরা জান কি?" সাহাবিগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -ই ভালো জানেন। তিনি বললেন, "তোমার কোনো ভাই (দীনি) সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে, তা-ই গীবত।"" সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি যে দোষের কথা বলি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে তাহলেও কি গীবত হবে? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যে দোষের কথা বল, তা যদি তোমার ভাইয়ের থাকে তবে তুমি অবশ্যই তার গীবত করলে আর তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে না থাকে তবে তুমি তার ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছ।"
(মুসলিম)(মিশকাতঃ পৃ-৪১২)
একথায় বুঝা গেল মিথ্যা অপবাদ গীবতের চাইতেও জগন্যতম অপরাধ।
পবিত্র কোরআনুল করীমে আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন এরশাদ করেন
“আর তোমরা একজন অন্যজনের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের আড়ালে নিন্দা করো না। তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে চাইবে? প্রকৃতপক্ষে তোমরা তো এটাকে ঘৃণ্যই মনে কর। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ তওবা গ্রহণকারী পরম দয়ালু।”
(সুরা হুজুরাত- ৪৯ : ১২)
সুস্থ, স্বাধীন কোনো বিবেকবান মানুষই জ্ঞান অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত মৃত মানুষ তো দূরের কথা, যে পশু জীবিত থাকলে হালাল সেই পশু মৃত হলে তার গোশতও ভক্ষণ করবে না। অথচ মানুষ সুস্থ মস্তিষ্কে, স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে গীবতের মতো জঘন্য ফেতনায় নিমজ্জিত হয়।
এখানে আল্লাহ্ আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যদি আমরা এই ঘৃন্য কাজ করেথাকি আল্লাহর কাছে যেন ক্ষমা প্রার্থনা করি,আল্লাহ নিশ্চয় ক্ষমা করবেন।
সুতরাং এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, কোনো (মুমিনের) ভাইয়ের এমন দোষের কথা বলা গীবত যা সে অপছন্দ করে। তা সত্য হোক কিংবা মিথ্যা । সামনে হোক কিংবা তার আড়ালে ।
কেউ গীবত শুনলে তার অনুপস্থিত ভাইয়ের পক্ষ থেকে তা প্রতিরোধ করতে হবে সাধ্যমতো। আর যদি প্রতিরোধের শক্তি না থাকে তবে তা শ্রবণ থেকে বিরত থাকতে হবে । কেননা, ইচ্ছাকৃতভাবে গীবত শোনা নিজে গীবত করার মতোই অপরাধ।
হাদিসে আছে, সাহাবি মায়মুন (রাঃ) বলেন, - একদিন স্বপ্নে দেখলাম এক সঙ্গী ব্যক্তির মৃতদেহ পড়ে আছে এবং এক ব্যক্তি আমাকে তা ভক্ষণ করতে বলছে । আমি বললাম, আমি একে কেন ভক্ষণ করব? সে বলল, কারণ তুমি অমুক ব্যক্তির সঙ্গী গোলামের গীবত করেছ । আমি বললাম, আল্লাহর কসম আমি তো তার সম্পর্কে কখনো কোনো ভালোমন্দ কথা বলিনি । সে বলল, হ্যাঁ, এ কথা ঠিক। কিন্তু তুমি তার গীবত শুনেছ এবং সম্মত রয়েছ ।’
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মিরাজের সময় আমাকে এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো যাদের নখ ছিল তামার। তারা তাদের মুখমণ্ডল ও দেহ আঁচড়াচ্ছিল। আমি জিবরীল (আঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা নিজ ভাইদের গীবত করত ও ইজ্জতহানি করত।
(মাজহারি)
আবু সায়িদ ও জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
‘গীবত ব্যাভিচারের চেয়েও মারাত্মক গুনাহ। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, এটা কিভাবে? তিনি বললেন, ব্যক্তি ব্যভিচার করার পর তওবা করলে তার গোনাহ মাফ হয়ে যায়। কিন্তু গীবত যে করে তার গোনাহ আক্রান্ত প্রতিপক্ষের ক্ষমা না করা পর্যন্ত মাফ হয় না।’
সুতরাং এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হল যে, গীবত একটি জঘন্য পাপাচার। এ থেকে সবাইকে সতর্কতার সাথে বিরত থাকতে হবে । মিথ্যা অপবাদকারী সাময়িক আনন্দ, কোন প্রাচুর্য পেলে বা তার কোন পদোন্নতি হলেও মিথ্যা অপবাদকারীর চেয়ে হতভাগা আর কেহ নেই।
মিথ্যা অপবাদকারী,জুলুম কারী,খুনী ও খেয়ানতকারী সবাই হতভাগা:
আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
তোমরা কি জান গরীব কে? সাহাবীগণ বললেন, আমাদের মধ্যে যার সম্পদ নাই সে হলো গরীব লোক। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে সে হলো গরীব যে, কিয়ামতের দিন নামায, রোযা ও যাকাত নিয়ে আসবে অথচ সে অমুককে গালি দিয়েছে, অমুককে অপবাদ দিয়েছে, অন্যায়ভাবে লোকের মাল খেয়েছে, সে লোকের রক্ত প্রবাহিত করেছে এবং কাউকে প্রহার করেছে। কাজেই এসব নির্যাতিত ব্যক্তিদেরকে সেদিন তার নেক আমল নামা দিয়ে দেয়া হবে। এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
[সুনান আত তিরমীযি ২৪১৮]
আবু যার রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলূল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
যে ব্যক্তি কোন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোন বানোয়াট অভিযোগ আনল, সে যেন নিজেই নিজের স্থান জাহান্নামে করে নিল
[সহীহ বুখারী:৩৫০৮]
মিথ্যা আরোপ করে সফল হওয়া যায় না, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সাময়িকভাবে কাওকে হেয় করা যায় বা সাময়িক কষ্ট দেয়া যায় । প্রকৃকপক্ষে মিথ্যা অপবাদ ব্যর্থ হয় । কেননা পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,
"আর যে ব্যক্তি মিথ্যা আরোপ করে, সে-ই ব্যর্থ হয়।" [সূরা তাহা :৬১]
--------------------------------
যাদের দোষ বর্ণনা করা যায়ঃ
গীবত নিঃসন্দেহে হারাম।
তারপরও যাদের দোষ বর্ণনা করা যায় তা হচ্ছে -
> কোনো অত্যাচারীর অত্যাচারের কাহিনী প্রতিকারের আশায় বর্ণনা করা।
> সন্তান ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে তার পিতা ও স্বামীর কাছে অভিযোগ করা।
> ফতোয়া গ্রহণ করার জন্য ঘটনার বিবরণ দেয়া ও - প্রয়োজন ও উপযোগিতার কারণে কারো দোষ বর্ণনা করা জরুরি।
> আবার যাদের স্বভাব গীবত করা তাদের সম্পর্কে অন্যদের সাবধান করার জন্য তার দোষ বর্ণনা করা জায়েজ।
যেমন উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একদা এক ব্যক্তি (মাখরামা ইবনে নওফেল) নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে সাক্ষাতের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তখন তিনি বললেন, তাকে আসার অনুমতি দাও, সে গোত্রের কতই না নিকৃষ্ট লোক। অতঃপর তিনি তার সাথে প্রশস্ত চেহারায় তাকালেন এবং হাসিমুখে কথা বললেন। অতঃপর লোকটি চলে গেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তার সম্পর্কে এমন কথা বলেছেন, অতঃপর আপনিই প্রশস্ত চেহারায় তার প্রতি তাকালেন এবং হাসিমুখে কথা বললেন। এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আয়েশা, তুমি কি কখনো আমাকে অশ্লীলভাষী পেয়েছ ? নিশ্চয়ই কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালার কাছে মর্যাদার দিক দিয়ে সর্বাধিক নিকৃষ্ট সেই লোক হবে, যাকে মানুষ তার অনিষ্টের ভয়ে ত্যাগ করেছে।
(বুখারি, মুসলিম)
গীবত থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত জরুরি। এ থেকে বাঁচার প্রথম উপায় হচ্ছে অপরের কল্যাণ কামনা করা। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
> প্রথমত : ‘দীন হচ্ছে নিছক কল্যাণ কামনা করা।’
> দ্বিতীয়ত, আত্মত্যাগ অর্থাৎ যেকোনো প্রয়োজনে অপর ভাইকে অগ্রাধিকার দেয়া। যেমন আল্লাহ সূরা হাশরের ৯ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন,
‘তারা নিজের ওপর অন্যদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা অনটনের মধ্যে থাকে।’
> তৃতীয়ত, অপরের অপরাধকে ক্ষমা করে দেয়া।
> চতুর্থত, মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী বেশি বেশি করে অধ্যয়ন করা।
পরিশেষে বলতে হয়
* গীবত হল অন্যের অনুপস্থিতি তে তার এমন দোষ আলোচনা করা যা তার মধ্যে বিদ্যমান।
* অপবাদ হল উপস্থিতি হওক কিংবা অনুপস্থিতি মানুষ কে এমন দোষে দোষারোপ করা যা তার মধ্যে নাই।
* গীবতের হুকুম হল হারাম।
গীবত এমন অপরাধ যা জিনার থেকেও মারাত্মক।
গীবত করা মানে নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া।
* অপবাদের হুকুম হল গীবতের হুকুম থেকেও মারাত্মক।
গীবত এবং অপবাদের গোনাহ আল্লাহ পাক ক্ষমা করবেন না যতক্ষণ না বান্দা ক্ষমা করে।
অর্থাৎ গীবত এবং অপবাদের গোনাহ ক্ষমা পাওয়ার শর্ত হল যার গীবত করা হয়েছে এবং যাকে অপবাদ দেওয়া হয়েছে সেই ক্ষমা করতে হবে।নতুবা আল্লাহ পাক ক্ষমা করবে না।
কিয়ামতের ময়দানে যারা গিবত করে এবং অপবাদ দেয় তাদের আমলনামায় কোন পূন্য থাকবে না।কারন তাদের পূণ্য সব যাদের গিবত করা হয়েছে এবং যাদের কে অপবাদ দেওয়া হয়েছে তাদেরকে দিয়ে দেয়া হবে ।
**************************
আল্লাহ আমায় মাফ করুন ও উত্তম আমল করার তৌফিক দান করুন। গীবত থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
------------------------------

Comments
Post a Comment