হযরত আবু তালিব (রঃ) কুরায়েশ বংশের বনি হাশিম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি ছিলেন গোত্রের একজন প্রবীণ ও সম্মানিত নেতা । নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এর নবুয়াত প্রচারকালীন সময়ে তিনি তার সর্বাত্মক নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন । হযরত আবু তালিব রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ছিলেন মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এর আপন চাচা এবং খলিফা আলী ইবন আবী তালিব রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর পিতা ।(উইকিপিডিয়া)
রসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এবং উম্মুল মুমিনিন খাদীজা (রঃ) এর বিবাহের খুতবা পাঠ করলেন হজরত আবুতালিব (রঃ) খুতবায় তিনি বললেন, "সমুদয় প্রশংসা ওই আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে ইব্রাহীমের সন্তান ইসমাঈলের বংশদ্ভুত করেছেন । সৃজন করেছেন আমাদেরকে মাআদ ও মুদার এর মূল থেকে। আমাদেরকে করেছেন তার গৃহের সেবক ও তত্ত্বাবধায়ক । সে গৃ্হকে করেছেন জনসমাগমমুখর । তাই বিভিন্ন দিক ও দেশ থেকে মানুষ এ গৃহের জিয়ারতে ছুটে আসে । ওই পূণ্যপথিকদের নিরাপত্তা দানের দায়িত্বও তিনি অর্পন করেছেন আমাদের উপর । আমাদেরকে বানিয়েছেন জনশাসক । অতঃপর আমার বক্তব্য এই যে, নিশ্চয় আমার ভ্রাতুষ্পৃত্র মুহম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ্ এমন এক যুবক যার সমকক্ষ কেউ নেই । সেই সকলের অগ্রণী । সম্পদ-প্রাচুর্য তার নেই বটে, কিন্তু সে মহান । নিঃসন্দেহে সে ‘খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ’-এর পতির আসনে আসীন হওয়ার যোগ্য । আমি আমার সম্পদ থেকে তাঁর বিবাহের মহর বাবদ বিশটি উট নির্ধারণ করিলাম । আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, এ বিবাহের পর তাঁর মর্যাদার ক্ষেত্রে যুক্ত হবে এক নতুন অনুষঙ্গ" ।
(মাদারেজুন্নবুয়ত পৃঃ ১৫৬)
এখানে সহজে অনুমান করা যায় তিনি ইসলামের পূর্বে ইব্রাহীম (আঃ)-এর ধর্মের উপর দৃঢ় ছিলেন । মুর্তি পূজারী কিংবা কাফের ছিলেননা । বাইতুল্লাহ্ শরীফের রক্ষক হওয়ার সৌভাগ্য তখন তিনিই অর্জন করেন । তার ইব্রাহীমি ধর্মের উপর সন্দেহ করাটাও অসংগত । আর ইব্রাহীম (আঃ)-এর ধর্মের উপর যে অটল ছিল তার ব্যপারে মহান রব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন "আর দীনের ব্যাপারে তার তুলনায় কে উত্তম, যে সৎকর্মপরায়ণ অবস্থায় আল্লাহর কাছে নিজকে পূর্ণ সমর্পণ করল এবং একনিষ্ঠভাবে ইবরাহীমের আদর্শ অনুসরণ করল? (সুরা নিসা ১২৫) এই আয়াতের শর্তে আবুতালিব (রঃ)- কোন অংশে দীন ইসলামের বাইরে নন । যারা ইব্রাহীম (আঃ)-এর দীনকে অস্বীকার করে তারা অঅনুগত বান্দা । কারন "ইসলামই আল্লাহর একমাত্র মনোনিত ধর্ম" সেই আয়াতটি তখন নাজিলই হয়নি ।
যারা আবুতালিব (রঃ)-কে কাফের বলে থাকেন তারা কি কখনো এই কথা ভেবে দেখেছেন রসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) উনার বিবাহের খুতবা পাঠকারী এবং উনার বিবাহের মহরানা আদায় কারী যদি কাফের হয়ে থাকেন তাদের নবীর সন্মান বাড়ল নাকি অসন্মানি করা হল ? কতটুকু মূর্খ হলে তা নিঃসংকোচে মানুষের কাছে প্রচার করতে পারে । মেনে নিলাম তিনি কুফরী হালতে ইন্তেকাল হয়েছেন তার পরওতো নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) উনার খাতিরে মুখ বন্ধ রাখা উচিত ছিল । রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর বিবাহের খুৎবা দানকারিকে কাফের বলা কিংবা উনার (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) পিতা-মাতাকে কাফের বলা মূলত রসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে কষ্ট দেওয়ার দৃষ্টান্ত । কুরআন ও হাদিসের আলোকে সকল মাজহাবের ঐক্যমত হল রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে কষ্ট দানকারী মুরতাদ কিংবা মুনাফেক । কাজী আয়াজ রহমতুল্লাহ্ আলাইহি তার শিফা শরীফে লিখেছেন,- "স্মরণ রেখো যাহেরী হায়াতে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যেমন সন্মান প্রদর্শন করা হতো, তেমনি তাঁর ইন্তিকালের পরও তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ওয়াজিব।" তাহলে বিবেককে কাজে লাগিয়ে দেখুন, হুজুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) উনার বিবাহের খুতবা পাঠকারী এবং উনার বিবাহের মহরানা আদায় কারী যদি কাফের সাব্যস্ত করতে চেষ্টা করেন তা কি হজুরের সন্মান বৃদ্ধি করলেন নাকি লোপ করলেন ?
ইমাম মালেক রহমতুল্লাহ আলাইহি বলেন,- আমি হযরত ইমাম জাফর সাদেক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে দেখেছি যে, তিনি উত্তম স্বভাব আর হাস্যোজ্জ্বল ব্যক্তি ছিলেন। তবুও যখন তাঁর সামনে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলোচনা করা হতো তখন তাঁর মুখমণ্ডল
ফ্যাকাশে হয়ে যেতো।
হযরত আবদুর রহমান বিন কাসিম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু যখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আলোচনা করতেন । তখন তাঁর মুখমণ্ডলের প্রতি তাকানো যেতো না। মনে হতো তাঁর দেহের রক্ত শুকিয়ে গেছে । তাঁর জবান হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের ভয়ে শুকিয়ে গেছে।
হযরত ইমাম মালেক রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু হাদীস বর্ণনা করার পূর্বে অযু করতেন । তারপর উত্তম পোশাক পরিধান করতেন, অতঃপর হাদীস বর্ণনা করতেন ।
তাঁকে এরূপ করার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন,— এটা আল্লাহর রাসূলের বাণী। (এটা কোনো সাধারণ কথা নয়। এটা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র বাণী, কাজেই এই বাণীর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা ওয়াজিব।) (শিফা শরীফ)
এই যদি হয় হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র বাণীর প্রতি সন্মান প্রদর্শন করার হুকুম তাহলে হুজুরের সন্মানে কতটুকু করা অপরিহার্য কিংবা ওয়াযিব ?
একদা আবু লাহাব, আবু সুফিয়ান, ওৎবা, শাইবা, সহ আরো কয়েকজন কাফের মুশরিক নেতৃবর্গ জনাব আবু তালিবের নিকট উপস্থিত হয়ে অভিযোগ করল যে, -“আপনার ভ্রাতুষ্পুত্র মোহাম্মদ আমাদের বাপ-দাদার ধর্মের বিরোধিতা করছে । এমনকি আমাদের পূজনীয় দেব-দেবী লাত, মানাত ও ওজ্জা মূর্তি সম্পর্কে অপমানজনক কথা বলছে” । হযরত আবু তালিব তাদের অভিযোগ শুনে তাদেরকে সান্তভাবে বুঝিয়ে বিদায় জানালেন । এদিকে
রসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) অবিরত দীন প্রচার করে যাচ্ছেন, কিন্তু আবুতালিবের ভয়ে কেউ সরাসরি উনাকে আক্রমনের সাহস পাচ্ছেনা । (মুহম্মদ ইবনে ইসহাক এর থেকে বিদায়া ওয়ান্নিহায়া)
অবশেষে কাফের সর্দাররা পুনরায় হযরত আবু তালিবের স্মরনাপন্ন হলো । তারা বললো ,“ হে আবু তালিব ! আপনার মর্যাদা ও ঐতিহ্যের সম্মানে আমরা এতদিন আপনার ভাতিজা মোহাম্মদের কার্যকলাপ অনেক সহ্য করেছি । কিন্তু আমাদের ধৈর্যেরও একটা সীমা আছে । এখন আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম । কেননা, মোহাম্মদ প্রকাশ্যে আমাদের বাপ-দাদার ধর্মের ও দেব-দেবীর বিরোধিতা করছে । আপনি হয় তাকে একাজ থেকে বিরত রাখুন । না হয় তার পক্ষে অস্ত্রধারণ করুন । তরবারির দ্বারাই বিষয়টির ফয়সালা হোক ।” একথা শুনে হযরত আবু তালিব বললেন,“ মোহাম্মদ কি মানুষদের মন্দ কাজের দিকে আহবান করছে ?” হযরত আবু তালিবের এমন কথায় কাফেরেরা হতভম্ব হয়ে ফিরে গেল । আবার হাশেমিদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারনের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ ভেবে তারা অগ্রসর হতে সাহসী হলো না ।
বহু বাধা বিপত্তি ও গোপণ ষড়যন্ত্র করেও যখন ইসলামের ক্রমাগত অগ্রযাত্রা ঠেকানো গেল না, তখন কাফের সর্দারেরা লোভ-লালসা ও প্রলোভনের পথ বেছে নিল । আবার তারা হযরত আবু তালিবের স্মরণাপন্ন হলো এবং বলল ,“ হে আবু তালিব ! আমরা আপনার ভাতিজার সাথে এ পর্যন্ত অনেক ভাল ব্যবহার করেছি । আমরা তাকে সমগ্র আরবের নের্তৃত্ব কর্তৃত্ব ও সবচেয়ে সুন্দরী নারী এবং অজস্র ধন-সম্পদ দেয়ারও প্রস্তাব করেছি । বিনিময়ে সে আমাদের বাপ-দাদার ধর্মকে মেনে নিবে । কিন্তু সে আমাদের উপহার ও প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে । শুধু তাই নয় এখন সে আরও জোরেশোরে প্রকাশ্যে দেব-দেবীর বিরুদ্ধে অপমানজনক কথা বলছে এবং আমাদের বাপ-দাদার ধর্মকে ভ্রান্ত বলে আখ্যায়িত করছে । এ অবস্থা আমরা আর চলতে দিতে পারি না । এর পূর্বেও আমরা আপনাকে এ বিষয়ে নালিশ করেছিলাম কিন্তু আপনি আমাদের কথা গ্রাহ্য করেননি । সুতরাং আজই এর সুরাহা করতে হবে । হয় আপনার ভাতিজা মোহম্মদের ধর্ম প্রচার বন্ধ করুন, না হয় তাকে আমাদের হাতে সোপর্দ করুন ।”
কাফের সর্দারদের এরূপ বক্তব্যে হযরত আবু তালিব গর্জে উঠে বললেন ,“ হে কুরায়েশ সর্দারগণ সুস্পষ্ট ভাবে জেনে রাখো, মোহাম্মদকে সোপর্দ করা তো দূরের কথা কেউ তার চুল পরিমাণ ক্ষতির চিন্তাও করো না । কুরায়েশদের সহিত অনেক বাকবিতন্ডার পর এক পর্যায়ে আবুলালিব (রঃ) রসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে বললেন, হে ভাতিজা (মুহম্মদ) যা খুশী প্রচার কর । আল্লাহর কসম কোন কিছুর বিনিমযে আমি তোমাকে ওদের হাতে তুলে দেবনা । অতৎপর বলেন : আল্লাহর কসম ! তারা ককনোই তাদের সন্মিলিত শক্তি নিয়েও তোমার কাছে পৌছতে পারবেনা । যতক্ষন পর্যন্ত না আমি মাটিতে সমাহিত হব । অতএব তুমি তোমার কাজ চালিয়ে যাও । তোমার উপর কোন বাধা আসবেনা । তুমি খুশী হও এবং এর ফলে তোমার থেকে চক্ষুসমুহ শীতল হোক ।[আল বিদায়া ওয়ান্নিহায়া- 3/42]
এখান থেকে বুঝা যায় দীন-ইসলাম প্রচার ও প্রসারে আবুতালিব (রঃ) রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) উনাকে কতটুকু সাহায্য ও মনোবল দিযেছিলেন । এই পর্যন্ত এমন কোন দৃষ্টান্ত আমি দেখিনি যা মানুষ সর্বশক্তি দিয়ে সমর্থন ও সহায়তা করে যা কিনা তার পথ, মত, ধর্ম, বিশ্বাস, নীতি, সকল কিছুর বিপরীত । অথচ আমাদের কিছু কিছু আলেমগণ আবুতালিব (রঃ)-এর মাঝে ঈমানের গন্ধও খুজে পাননা । যার প্রত্যেকটি কর্মই ইমানদারের শর্তে অ্রগ্রনি ছিল ।
আল্লাহ্ তা'আলা নুহ্ (আঃ) ও লুত (আঃ) উনাদের অধীন থাকার পরও উনাদের স্ত্রী দেরকে তাদের মুনাফেকির কারণে জাহান্নামী করেছিলেন।(সুরা তাহরিম -10)
এখানে ইমান প্রকাশ পেলেও মুনাফেকির কারণে তারা যাহান্নামী হয়েছিল ।
নুহ আলাইহিস্সালাম যখন কাফেরদের অত্যচারে অতিষ্ট হয়েছিলেন তখন আল্লাহ কোন কাফেরের তত্বাধানে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেননি । সমস্থ কাফেরদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা পানিতে নিমর্জিত করে তার রসুলের নিরাপত্তা দিয়েছিলেন । কুরায়েশরা যেমন দুর্বল সাহাবীদের প্রত্যাখ্যান করার জন্য রসুলুল্লাহ্ সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম-কে কু-পরামর্শ দিয়েছিল ঠিক তেমনি নুহ্ (আঃ) এর যুগের কাফেররাও সেই রকম দু্র্বল শ্রেণীর মুমিনদের তার সান্নিধ্য থেকে সরিয়ে দেয়ার পরামর্শ দিয়েছিল ।(বিদায়া ওয়ান্নিহায়া ১ / ২৫২ পৃ)
এখানে বুঝা যায কোন ইমানদার প্রভাবশালী না থাকার কারণে আল্লাহ তার রসুলের নিরাপত্তার জন্য পুরা কওম ধংস করে দিতে দ্বিধা করেননি । এটা আল্লাহর একটা রহমত যে রসুলুল্লাহ সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম আবুতালিব (রঃ) এর তত্বাবধানে থাকার কারণে কাফেরদের বিরুদ্ধে বদ্দোয়া করার প্রয়োজন হয়নি । যেমনটি নুহ্ (আঃ) বলেছিলেন , "হে আল্লাহ্ আমিতো অসহায় অতএব আপনি প্রতিবিধান করুন" (আল্ কুরআন 54:10)
অনেকে আবুতালিবের ঈমান প্রকাশ না হওয়াটা উনার ঈমানহীনতার সাক্ষ্য সাব্যস্ত করেছেন । তাহলে দেখুন নুহ্ আলাইহিস্সালামের নৌকায় যারা ছিলেন সবার ঈমান প্রকাশ পেয়েছিল । সেখানে উনার স্ত্রী কি করে যাহান্নামী হয়? এটাতো আল্লাহ্ তাআলার ফয়সালা । ঈমান প্রকাশ হওয়া-নাা হওয়ার উপর নির্ভর নয় । অন্তরের খবর একমাত্র আল্লাহই জানেন । সুতরাং আবুতালিবের বেলায় কেন ঈমান প্রকাশ হওয়া-না হওয়ার অজুহাত আসল ?
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,- "হে মুমিনগণ ! মুমিনগণ ছাড়া কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।" (সুরা আন্-নিসা : ১৪৪)
এটা সঙ্গত নয় যে কোন নবী কাফেরের সহচর্যে দিনাতিপাত করবেন কিংবা দীন প্রচার করবেন । (আল্লাহই ভাল জানেন) যেমন আল্লাহ্ তা'আলার খলীল ইব্রাহীম আলাইহিস্সালাম যখন জানতে পারলেন তার পিতা আল্লাহর শত্রু তখন তিনি তার সাথে আর সম্পর্ক টিকিয়ে রাখেননি । পবিত্র কুরআনে তা আল্লাহ্ তাআলা এভাবে তুলে ধরেন, -
ইরশাদ করেন,
"যখন এটা তার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল যে সে আল্লাহর শত্রু, তখন সে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।" (সুরা আত-তওবা : ১১৪)
তাহলে আবুতালিব কাফের হলে কি করে রসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) তার সাথে সম্পর্ক রেখেছিলেন । যেখানে ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ প্রত্যখ্যান করেছিলেন নিজের পিতাকে । (আল্লাহই ভাল জানেন)
উক্ত আয়াতের উদৃতি দিয়ে আল্লামা ইদ্রিস কান্দলভী (রহঃ) সিরাতুল মোস্তফা কিতাবে লিখেন, "এ আয়াত দ্বারায় পরিষ্কার প্রকাশ পেল যে, যেভাবে ঈমানদারের জন্য আল্লাহ্ জাল্লাসানুহু ও তার রসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি ভালবাসা ও আনুগত্য ঘোষনা করা আবশ্যিক ঠিক তেমনিভাবে (ক্ষেত্র বিশেষে) আল্লাহর দুশমনদের সাথে শত্রুতা ও বিদ্বেষের ঘোষনা দেওয়াও জরুরী।"
তাই যদি হয় আল্লাহ্ তা'আলার বিধান তারই প্রিয় হাবীব সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম কি করে তার হুকুমের প্রতিকুলে থাকতে পারেন? এ কথা মেনে নেয়া রসুলের উপর ঈমান দুর্বলতারই পরিচয়।
এখানে আমরা আল্লাহর রসুলের ভালবাসা আবুতালিবের মাঝে পেলাম এবং আল্লাহর দুশমনদের সাথে বিদ্বেষ ও পেলাম । বাকী রইল আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার ব্যাপারটি ! তা হল একান্ত গোপনীয় ব্যাপার কারো অনুমান করার সাধ্য নেই শুধু মাত্র আল্লাহ ব্যতিত । ঈমান প্রকাশ না করেও ঈমানদার হওয়ার প্রমান পাই আমরা পবিত্র কুরআন পাকে । ফেরাউনের চাচাত ভাই যিনি ফিরআউনের গোত্রের একজন হওয়া সত্বেও মুসা আলাইহিস সালাম এর আনুগত্যে ঈমান এনেছিলেন । কিন্তু নিরাপত্তা ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিজের ঈমান তখন পর্যন্ত গোপন রেখেছিলেন । যা আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন পাকে এভাবে উল্লেখ করেন, -
ইরশাদ করেন, - "ফেরাউনের দলের এক মু’মিন ব্যক্তি- যে তার ঈমানকে গোপন রেখেছিল- বলল, তোমরা একজন লোককে শুধু কি এজন্য মেরে ফেলবে যে, সে বলে, আল্লাহ আমার প্রতিপালক । অথচ সে তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে এসেছে ।" (সুরা আল্-মু'মিন : ২৮)
তিনিতো শুধু মুখে বলেছেন । আবুতালেবতো কাফেরদের বিরোদ্ধে মোকাবেলার জন্যও প্রস্তুত ছিলেন । কিন্তু তিনিও ঈমান গোপন করেছিলেন । যা আমরা অনুমান করতে পারি এই কথার উপর,- আবুতালিব বলেন,- "ভাতিজা ! তুমি আমাকে সত্যের (ইসলামের) দাওয়াত দিয়েছ তা আমি নিশ্চিত জানি, আমি এও জানি, তুমি আমার (পরকালের) কল্যানকামী । তুমি সত্য বলেছ, তুমিতো পূর্ব থেকেই আল-আমিন ও বিশ্বাসী বলে খ্যাত । তুমি আমার নিকট যে দীন (ইসলাম) পেশ করেছ, আমি জানি তা সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ট দীন ।"
তিনি 'রসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে বলেলেন, "ভাতিজা আমার মৃত্যুর পরে তোমার ও তোমার ভাই-বেরাদর (অনুশারী) অপমানিত হতে হবে এবং কুরায়েশরা ভাববে যে আমি শুধু মৃত্যুর ভয়ে ঈমান এনেছি । এই আশংকা যদি না থাকত তাহলে আমি কলেমা (প্রকাশ্যে) পড়তাম ও ঈমান (প্রকাশ্যে) আনতাম ।"উপরউল্লিখিত ঘঠনাবলী প্রমান করে যে চাচা আবুতালিব দীন ও ধর্ম মতের ক্ষেত্রে (প্রকাশ্যে) অমিল থাকা সত্বেও তারই মাধ্যমে আল্লাহ্ তা'আলা রসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে হিফাজত করেছেন নিরাপদ রেখেছেন ।
(সিরাতে ইবনে হিসাম পৃ: 63)
পবিত্র কুরআনের উক্ত আয়াতে করিমায় (সুরা আল্-মু'মিন : ২৮) আমরা দেখতে পাই কোন মানুষের সন্মুখে ঈমানদারের লক্ষন প্রকাশ পাওয়া জরুরী নয়, আল্লাহ্ তা'আলার কাছে প্রকাশ পাওয়াই জরুরী । ফেকা্হ্-বিদগণ তাদের শর্তানুযায়ী আবুতালেবের ঈমানের প্রমান দিতে না পারায় ঈমানদার ঘোষনা করতে পারেননি । শর্তানুযায়ী তাদের সিদ্ধান্তে সঠিক কিংবা ভুল উভয় অবস্থাতেই তাদের জন্য পুরষ্কার (সওয়াব) আছে । সুতরাং তাদের সমালোচনা করাও গর্হিত কাজ হবে । নিজের অন্তরকে নিজেই সঠিক করতে হবে ।
অন্যত্র আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন, - 'যারা ঈমান আনে আল্লাহর উপর, কেয়ামত দিনের উপর এবং নিজেদের ব্যয়কে আল্লাহর নৈকট্য এবং রসূলের দোয়া লাভের উপায় বলে গণ্য করে। জেনো! তাই হল তাদের ক্ষেত্রে নৈকট্য। আল্লাহ তাদেরকে নিজের রহমতের অন্তর্ভূক্ত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুনাময়। [সুরা তাওবা - ৯৯]
এখানে দর্শনিয় কোন আমলের কথা বলা হয়নি, যা প্রকাশ পাওয়া ঈমানের শর্ত। এটা আল্লাহ ও তার বান্দার মাঝেই সিমাবদ্ধ। যদিও ফেকাহবিদগণ ইমান প্রকাশ পাওয়াকে ইমানদারের শর্তে যোগ করেছেন। কিন্তু সেই সময়তো এই শর্ত ছিলনা । থাকলে হয়ত আবুতালেব (রঃ)-ও প্রকাশ করতে বাধ্য হতেন। ইসলাম যেদিকেই যাক তিনি নিজের ইমান রক্ষার জন্য হয়ত প্রকাশ করতে বাধ্য হতেন।
ইবনে সা'দ আবদুল্লাহ ইবনে ছালাবা ইবনে ছগীর ওযরী থেকে রেওয়ায়েত করেন যে, আবূ তালেবের ওফাতের সময় নিকটবর্তী হলে তিনি সকল পুত্রকে কাছে ডেকে এনে বললেন,- “যে পর্যন্ত মোহাম্মদের অনুসরণ করতে থাকবে, কল্যাণ তোমাদের সঙ্গে থাকবে । তাই তাঁকে অনুসরণ ও সাহায্য করবে।” (খাসায়েসুল খোবরা ১ম খন্ড)
এখানে প্রমানিত হয যে, মৃত্যুশয্যয়ও আবু তালেব (রঃ) দীন-ইসলামের দাওয়াতের কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন । যে নিজেই ঈমান আনেনি সে কি করে ইসলামের দাওয়াত কার্যে নিজেকে বিলিযে দিতে পারে? এখানে কি আবু তালেবের ঈমান প্রকাশ পায়নি ? তারপরও আমরা কিভাবে বলতেপারি আবুতালেব ঈমান আনেননি ?
'মাওয়াহেবে লাদুন্নিয়া' গ্রন্থে হেসাম ইবনে সায়েব থেকে বর্ণিত হয়েছে, আবু তালিবের ইন্তেকালের সময় যখন ঘনিয়ে এলো তখন তিনি কুরায়েশদের যুবক ও বয়োবৃদ্ধদেরকে ডেকে আনলেন । তাদের অসিয়ত করলেন, হে কুরায়েশ সম্প্রদায় ! আল্লাহ্ তা'আলা সকল মানুষের মধ্যে তোমাদেরকে সন্মান দান করেছেন । আমি তোমাদেরকে মুহম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এর ব্যাপারে অসিয়ত করছি, তার সঙ্গে সদাচরণ করো । কেননা সে কুরায়েশদের মধ্যে আমীন এবং সমগ্র আরবে সত্যবাদী । সমস্ত সৌন্দর্য ও কল্যাণ তার মধ্যে সন্নিবেশিত হয়েছে । আমি তার ব্যাপারে তোমাদেরকে অসিয়ত করছি । সে নিশ্চয় এমন ধর্ম নিয়ে আগমন করেছে, যা প্রত্যেক অন্তরই গ্রহণ করতে চায় । কিন্তু নিন্দার ভয়ে তা অস্বীকার করে । আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি যেন দেখতে পাচ্ছি, আরবের সকল ফকির-দরবেশ, বেদুইন ও সাধারণ জনতা সকলেই তার দাওয়াত কবুল করেছে । তারা সকলেই বিশ্বাস স্থাপন করে তাকে সন্মানিত পথ প্রদর্শক হিসাবে মেনে নিয়েছে । আরবের বড় বড় লোকের মস্তকও অবনত হয়ে গিয়েছে । তাদের মর্যাদা হয়েছে ধুলিসাৎ । বিত্তহীনেরা হয়েছে সম্পদশালী ও সন্মানীত । আর যারা সন্মানীত ছিল, তার হয়েছে অপদস্থ ও লাঞ্চিত । নিসন্দেহে সে আরবদের বানিয়ে দিয়েছে শুদ্ধাচারী । তার ভালবাসা আরবীয়দের অন্তরে সুদৃঢভাবে গ্রথিত হয়েছে । তারা সকলেই তার অনুগত্য করে চলেছে । ভবিষ্যতে এ রকমই ঘঠবে । কিন্তু তা যেন আমি এখনই দেখতে পাচ্ছি ।
হে কুরায়েশ জনতা ! তোমরা তাকে ভালবেসো । হয়ে যেয়ো তার সাহায্যকারী । আল্লাহ্ তা'আলার শপথ ! যে তার অনুসরণ করিবে, সেই পথপ্রাপ্ত হইবে, হবে সফল (ঈমানদার) । কোন সৌভাগ্যবান ব্যাক্তি তার চরিত্র ও বৈশিষ্টকে অস্বীকার করতে পারবেনা । আমি যদি আর অল্পকালও বেচেথাকি, তবুও তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করবো । তাকে রক্ষা করবো বিপদাপদ থেকে । এই পর্যন্তা বলার পর তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নেন।
\ছোবহানাল্লাহ\ আল্লাহ্ তা'আলা আবুতালেব (রঃ)-কে এমন জ্ঞান দান করছেন যার দ্বারায় বুঝা যায় তিনি শুধু ঈমান এনেছেন তা নয় ! তিনি আল্লাহর একজন নির্বাচিত আউলিয়াও ছিলেন । যার কারণে তিনি কাশফ এর মাধ্যমে ইসলামের আগামি দিনের মর্যাদা কত উর্ধে তা অনেক পূর্বেই প্রকাশ করে দিয়েছেন।
এখানে লক্ষ্যনীয় যে, - অনুসরণ ও সাহায্য তাকেই করতে বলা হয় নিজের চিন্তাধারায় যিনি ন্যায় ও সঙ্গত । পৃথিবীতে এমন কেউ কি আছেন যে নিজে এক নীতি অনুসরণ করবে আর সকলকে অন্য নীতি অনুসরণ করার উপদেশ বানী শুনাবে ? এটা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য কথা । যা উদ্দেশ্যগত ভাবে হযরত আবুতালিবের বেলায় সঙ্গতের রূপ দেয়া হয়েছে ।
আবুতালেব (রঃ) এত কিছু করার পরও কিছু কিছু আলেম অভিমত প্রকাশ করেন যে, তিনি ইমান গ্র্হন করেননি । তাদের মতানুযায়ী তিনি কলেমার উপর মৌখিক সীকৃতি দেননি । বরং অন্তরে বিশ্বাস করেছিলেন । তার থেকে মেনে নেওয়া, গ্রহন করা, অনুগত্য করা পাওয়া যায়নি । যেহেতু আকায়েদের কিতাবাদিতে আছে বিশ্বাস ও সিকৃতির সঙ্গে মেনে নেওয়া, গ্রহন করা ও অনুগত্য করা যদি পাওয়া যায় তাহলে তাকে ইমানদার বলে গন্য করা হয় । আবুতালিব সেই রকম কিছু করেছেন বলে প্রমান পাওয়া যায়নি । তারাই আবার বলতেছেন, একটি বর্ণনায় এসেছে, ইবনে ইসহাক বলেছেন, তার মৃত্যুর সময় যখন ঘনিয়ে এলো তখন হযরত আব্বাস রদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু দেখেছেন তিনি ঠোট মৃদু মৃদু নাড়ছেন, তখন তিনি তার কান আবুতালিবের মুখের কাছে নিলেন । অতঃপর রসুলআল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে বললেন : হে ভাতিজা নিঃসন্দেহে আমার ভাই সেই কলেমা পাঠ করেছেন যা তুমি তাকে বলেছিলে । এক বর্ণনায় এসেছে রসুলে পাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন আমি শুনেছি ।
'রওজাতুল আহবা' কিতাবে বর্ণনায় এসেছে যখন আবুতালিবের ইন্তেকাল সংবাদ হুজুর পাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে জানানো হল তখন তিনি বলেছিলেন "তোমরা তাকে গোসল দাও এবং কাফন-দাফনের ব্যাবস্থা কর । বার্তা বাহক ছিলেন মাউলায়ে কায়েনাত আলী ইবনে আবুতালেব রাদিয়াল্লাহু আনহু । এখানে উল্লেখ করা হয়েছে তিনি তার পিতার ব্যাপারে বলেছিলেন তিনিতো কুফর অবস্থায় ইন্তেকাল হয়েছেন (মন্তব্য নিচে) তার পর রসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বললেন তাকে মাটির মধ্যে ঢেকে দাও । এবং দোয়া করলেন "আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন এবং তার প্রতি দয়া করুন)। আবার এর বিপরিতেও হাদিস আছে যা আমি এখানে নিয়ে আসা প্রয়োজন মনে করিনি ।
এত কিছুর পরও আমাদের আলেম ওলামারা উনাকে জান্নাতী বলে সীকৃতি দিতে পারেননা । বরং জাহান্নামী বলতে কুন্ঠিত হননা ।
এখানে আমার মনে হয় ইস্তেহাদি বিষয়ে কিছুটা ভুল হতে পারে, যা ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত । যেমন তিনি যে ইমান এনেছেন তা প্রকাশ পাওয়া যায়নি । মুস্তাহীদ গণের ইস্তেহাদে এই কথাটি নিয়ে আনা হয়নি যে তখন ইমান প্রকাশের জন্য ফরজ কি ছিল ? যা তিনি প্রকাশ করেননি, যা দেখে আজকাল আমরা অবগত হতে পারি কোন লোক মুসলিম নাকি অমুসলিম । নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত তথা লৌকিক এবাদত সবইতো তাহার ইন্তেকালের পরেই ফরয হয়েছিল । তাছারা এমন কোন অনুগত সাহাবী আছেন, যিনি রসূলুল্লা্হ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর কথার আগে কথা বলেছেন? যদিও কেউ বলেছেন সাথে সাথে আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন পাকের আয়াত দ্বারা সংশোধন করে দিয়েছেন। তাহলে লক্ষ্য করুন,-
মউলা আলী কি করে রাসৃল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) উনার আগে বলতে পারেন 'সে কুফরী হালতে মৃত্যু বরণ করেছেন'? (নাউযুবিল্লাহ্) তাও নিজের পিতার ব্যাপারে ! অথচ রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) তাকে দাপন-পাফনের নির্দেশ দিয়েছিলেন । এইটা মউলা আলী (রঃ) এর বিরোদ্ধে অপবাদ মাত্র । জ্ঞানবান মানুষ অবশ্যই এই কথা সহজে মেনে নিতে পারেননা । যদিও ফেকাবিদগণ তাদের যুক্তি খুঝে পাননি । এইটা একটা কারসাজি যাতে অনুমিত হয় মউলা আলি (রঃ) রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) উনার হুকুমের তাবেদারী না-করে বিপরীত মনোভাব পোষন করেছেন । যা কষ্মিনকালেও মুমিন মাত্রই মেনে নেওয়ার মত নয় ।
একজন প্রসিদ্ধ কাফেরের সন্তান হলেন ইকরামা ইবনে আবু জাহেল (রঃ), যে ছিল তার পিতার যোগ্য উত্তরসুরী । সে এত অত্যচার করেছিলেন মুসলিমদের উপর তার কোন হিসাব নেই । তার পর মক্কা বিজয়ের দিনও সে একজন সাহাবী (র:) কে শহীদ করেছিলেন । অতঃপর রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এর মহানুভবতায় ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে সে ইসলাম গ্রহন করেন । এবং তাকে বললেন ইকরামা তুমি যা ইচ্ছা আমার কাছে চাও ! আমি তা সামর্থানুসারে দান করব । এমন একজন লোক এত যুলুম অত্যচার করার পরও যখন ইসলামে দাখিল হয়েছেন তার মনে কোন কষ্ট না পাওয়ার উদ্দেশ্যে রসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) অন্যেন্য সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বলেছেন 'খবরদার' ! "তোমরা তার পিতার (আবু-জাহেল) দোষ বর্ণনা করোনা । তাহলে সে মনে কষ্ট পাবে।"
[ মাদারেজুন্নবুয়ত 4/195 অবলম্বনে ]
তাই যদি হয় একজন সাধারণ সাহাবী (রঃ) এর মনে কষ্ট দেয়ার হুকুম, তাও একজন চিহ্নিত কাফেরের সমালোচনায় ! তাহলে যিনাকে ভালবাসা মুমিনের ঈমানের শর্ত, যিনার মনে কষ্ট দেয়া রসূল সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম উনার-মনে কষ্ট দেয়ার সমান । তার পিতার সমালোচনার জন্য কি হুকুম হতে পারে? যার মধ্যে কোন কুফরী প্রকাশ পায়নি । তার মানে মউলা আলি (রঃ)-এর মর্যাদা কি এতই নিচে যে, মক্কা বিজযের পরের সাহাবীদের ছেয়েও কি নিচে রয়ে গেল ? এটাযে সরাসরি মওলা আলি ও আবু তালিব রদিয়াল্লাহু আনহুমা উনাদের বিরোদ্ধে চক্রান্ত তা সহযেই অনুমান করা যায় । যাদের অন্তরে আহলে বাইতের প্রতি মহব্বত নেই বরং ঘৃনা লুকায়িত তাদের দৃষ্টিতে এসব ভাল নাও লাগতে পারে । তবে যাদের অন্তর আলোকিত তারা জাহান্নামের ভয় ও জান্নাতের আশা নয়, বরং সত্য মেনে নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিই কামনা করবে। আল্লাহ্ তা’আলা যেন আমাদের অন্তরকে আলোকিত করে দেন এই দেয়া রইল । আমিন ছুম্মা আমিন। শান্তি বর্ষিত হোক সকল নবী-রসুলদের প্রতি,আহলে বাইতের প্রতি ও সকল মুমিন এর প্রতি। যাবতীয় প্রসংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। আমিন।
--------------------
চাচা আবুতালিবের ইন্তেকালের পর রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) যে কষ্ট সহ্য করিয়াছেন,-
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর (রঃ) বলেন, আবুতালিবের ইন্তেকালের পর কুরাইশের এক দুরাচার (রসুলুল্লাহ্ সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) উনার সন্মুখে আসিল এবং তাহার গায়ে মাটি দিল । তিনি নিজ ঘরে ফিরিয়া আসিলেন । তাহার এক কন্যা পিতার চেহারা হইতে মাটি মুছিতে মুছিতে কাদিতেছিলেন । তখন নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলিতে লাগিলেন, কাদিওনা মা, আল্লাহ্ তা'আলা তোমার পিতাকে হেফাজত করিবেন । তিনি ইহাও বলিতেছিলেন যে,-"আবুতালিবের ইন্তেকালের পূর্বে কুরায়েশগণ এরুপ ব্যাবহার করতে পারে নাই। এখন এই দুর্ব্যবহার আরম্ভ করিয়াছে ।"
[আমিতো মনেকরি সেই একটি বাক্যই আবুতালিবের পরকালের জন্য যতেষ্ট হবে ।]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আবুতালিবের ইন্তেকালের পর কোরাইশের লোকেরা নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এর সহিত রুক্ষ ব্যবহার আরম্ভ করিলে তিনি বলিলেন, "হে চাচা কত শীঘ্রই না আপনার শুন্যতা অনুভব করিতেছি।" - (হায়াতুস্ সাহাবা ১ম খন্ড পৃ: ১৪২)
রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) যার শুন্যতা দুঃখের সহিত অনুভব করিতেছেন তাকে আমরা কি করে জাহান্নামী বলে আখ্যায়িত করতে পারি ? এই কথাতো সাধারণ বিবেকেও বিবেচনার বিষয় ।
হারেস ইবনে হারেস (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি একদিন এক যায়গায় লোকদের ভিড় দেখিয়া আমার পিতাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, এখানে এত মানুষের ভীর কেন ? তিনি বলিলেন, লোকেরা তাহাদের কওমের এক বেদ্বীনকে লইয়া ভীর জমাইয়াছে।হারেস (রঃ) বলেন আমরা সেখানে বাহন হইতে নামিয়া দেখিলাম, রসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) লোকদেরকে তাওহীদ ও ঈমানের দিকে আহবান করিতেছেন, আর লোকেরা তাহার বিরোদ্ধাচরণ করিতেছে । এবং তাহাকে নানা রকম কষ্ট দিতেছিল এভাবে দুপুর পর্যন্ত গড়াইল । তার পর তাহাকে লোকজন ছাড়িয়া চলিয়া গেলে একজন মহিলা একটি পাত্রে পানি ও একটি রুমাল লইয়া আগাইয়া আসিল । রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) তাহার নিকট হইতে পাত্রটি লইয়া পান করিলেন এবং ওযু করিলেন । তারপর মহিলাটির প্রতি মাথা তুলিয়া বলিলেন, বেটি ! তোমার পিতার জন্য ভয় করিওনা, আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম এই মহিলাটি কে ? লোকেরা বলিল তাহার মেয়ে জয়নাব (রাদিয়াল্লাহু আনহা)।
এই নির্যাতন দেখতে হয়েছে আবুতালিবের ইন্তেকালের পরে । যা ইতিপূর্বে কেউ সাহস করেনি ।
হযরত ওরওয়া ইবনে যুবাইর (রঃ) বলেন, আবু তালেবের ইন্তেকালের পর রসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এর উপর নির্যাতনের মাত্রা অত্যাদিক পরিমানে বাড়িয়া গেল । তখন তিনি আশ্রয় ও সাহা্য্যের আশায় (তায়েফের) বনু সাকীফ গোত্রের নিকট গেলেন । যেখানে তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) চরম নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন ।
(হায়াতুস্ সাহাবা ১ম খন্ড পৃ: 457)
আমাদের সন্মানিত আলেম-ওলামা মায়াকান্না করে তায়েফের হৃদয়বিদায়ক ঘঠনা করুন সুরে বর্ণনা করলেও একথা বর্ণানা করেননা যে, কেন এবং কোন পরিস্থতির স্বীকার হয়ে তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) তায়েফের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন । তার একমাত্র কারণ হল,- বিস্তারিত বলতে গেলে আবুতালিবের অবদানের কথা এসে যাবে ।
আপসোস ! আমরা মুসলিম হয়ে আমাদের ইসলামের ইতিহাস প্রকাশ করতে পারছিনা । তার একটাই কারণ, দুনিয়ার লোভ আমাদের কাছে প্রধাণ্য পেয়েছে । যারাই ইতিপূর্বে সত্য প্রকাশ করেছেন তাদেরকে অপবাদের বোঝা মাথায় নিয়ে দুনিয়া ত্যাগ করতে হয়েছে ।
ইমাম মুসলিম (রহঃ) আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব থেকে রেওয়ায়েত করেন যে, তিনি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ! আপনি আবূ তালেবের কোন উপকার করেছেন কি? তিনি তো আপনার হেফাযত করতেন এবং আপনার জন্যে মানুষের প্রতি ক্রুদ্ধ হতেন । তিনি বললেনঃ হাঁ, তিনি জাহান্নামের কিনারায় আছেন । আমি না থাকলে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকতেন ।
এই রেওয়ায়েতকে আবুতালেবের জাহান্নামের দৃষ্টান্ত বলে প্রকাশ করে থাকেন অনেক দুনিয়ালোভী আলেম নামধারী লোক । অথচ তারা এটা চিন্তা করেনা-যে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) না আসলে আবুতালেব কেন সে বা তারা নিজেও জাহান্নামের নিন্মস্থলে থাকত। আমি আপনিও কিভাবে জান্নাতের আশা করতে পারতাম?
ইবনে সা'দ বলেন, আমাকে আফফান ইবনে মুসলিম বলেছেন, তার কাছ থেকে ছাবেত বানানী এবং তাঁর কাছ থেকে ইসহাক ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে হারেছ বর্ণনা করেছেন যে, আব্বাস (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেনঃ ইয়া রসূলুল্লাহ! আপনি আবূ তালেবের জন্যে কোন মঙ্গলের আশা রাখেন কি? তিনি বললেনঃ “আমি আমার পরওয়ারদেগারের কাছে সকল প্রকার মঙ্গলের আশা রাখি । ইবনে আসাকিরও এটি রেওয়ায়েত করেছেন।
(খাসায়েসুল খোবরা ১ম খন্ড)
[এখানে সকল প্রকার মঙ্গল বলতে কতটুকু বুঝা যায় ? কুরআনুল করিমের এই দোয়া কি তার ছেয়ে কম বা বেশী ? “রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানা ওয়া ফিল আখেরাতে হাসানা” আপনি নিজের জন্য চাইলেন দুনিয়া ও আখের এতটুকুতে আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টি আশা করতে পারেন, অথচ রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) আশা করেছেন তাঁর ছেয়ে আপনারটা বেশী হয়ে গেল ? আপনার আশার তুলনায় রসুলুল্লাহ্’র (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর আশাকে তুচ্ছ মনে করলেন ? কেমন ঈমান আপনার ? আপনার নবীর চাইতে আপনি অগ্রে চলে গেলেন ।
যেখানে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) সর্বপ্রকার কল্যনের আশা করেন সেখানে আপনি আবুতালিব (রঃ)-কে জাহান্নামী বলে সহজ ভাবে মেনে নিলেন । এটাই কি রসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) উনার প্রতি ইমানের পরিচয় ?
ইবনে আসাকিরের রেওয়ায়েতে আমর ইবনুল আছ (রাঃ) বলেনঃ আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি- আবূ তালেবের আমার উপর হক আছে, যা আমি শোধ করব ।
(খাসায়েসুল খোবরা ১ম খন্ড)
[এমন আর কে আছে,আবুবকর ও আবুতালেব রদিয়াল্লাহু আনহুমা ছারা অন্য কারো হক বাকী রয়ে গেল ! যা রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এই দুনিয়াতে শোধ করেননি ? আপনি কিভাবে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি আশা করেন ? যেখানে আবুতালিব (রঃ) হকদার হওয়ার পরও উনাকে জাহান্নামী মনে করেন ! আশ্চর্য ব্যাপার : নিজের বেলায় অনধিকারকে অধিকার মনে করেন আর যখন আবুতালিবের (রঃ) ব্যাপারে আসলেন তখন অধিকারকে অনধিকার মনে করছেন ।
মনে রাখবেন সূর্য পূর্ব দিকে উদিত হয় এটা চিরন্তন সত্য; দুনিয়ার সকল মানুষ মিলেও যদি বলে পশ্চিমে উদয় হয়েছে তা কষ্মিন কালেও গ্রহনযোগ্য হবেনা। তদ্রুপ দুনিয়ার সকল মানুষ ও জ্বিন মিলে কিয়ামত পর্যন্ত যদি বলে 'আবুতালেব জাহান্নামী' সেটা কার্যকর হবেনা যদি আল্লাহ্ তা'আলার দৃষ্টিতে তিনি জান্নাতী হয়ে থাকেন।
***********
ইন্তেকালের পূর্বে কাফেরের বিরোদ্ধে আবুতালিবের কঠোর অবস্থান।
আবুতালিব (রঃ) এর ইন্তেকালের পূর্বে, রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) রাতে-দিনে এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে সর্বদা সর্বপ্রকারে মানুষকে আল্লাহ্’র প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। কোন বাধা প্রদানকারী উনাকে তা থেকে বিরত রাখতে পারেনি তিনি মাহফিলে, মজলিসে, সমাবেশে মেলার মওসুমে এবং হজ্জ সম্পাদনের স্থানসমূহে সমবেত লোকদের নিকট গিয়েছেন আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয়ার জন্যে। ধনী-নিধন, স্বাধীন-অধীন, এবং সবল-দুর্বল যার সাথেই উনার সাক্ষাত হয়েছে, তাকেই তিনি দাওয়াত দিয়েছেন। দাওয়াতের ব্যাপারে তিনি কোনরূপ ভেদাভেদ করেননি। কুরায়শের সবল ও শক্তিমান লোকেরা নানা প্রকারের অত্যাচার ও নির্যাতন সহকারে উনার উপর ও উনার অনুসারী দুর্বল ব্যক্তিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। উনার প্রতি সর্বাধিক কঠিন ও কঠোর আচরণকারী ছিল স্বীয় চাচা আবূ লাহাব ও তার স্ত্রী উম্মু জামীল আরওয়া বিন্ত হারব ইব্ন উমাইয়া। আবূ লাহাবের মূল নাম আবদুল উযযা ইব্ন আবদুল মুত্তালিব। তার স্ত্রী উম্মু জামীল ছিল আবূ সুফিয়ানের বোন তথা আমির মুয়াবিয়ার ফুফু ।
চাচা আবূ তালিব ইব্ন আবদুল মুত্তালিব কিন্তু এ ব্যাপারে তার বিরোধী ছিলেন। বস্তুত রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) তাঁহার চাচা আবূ তালিবের প্রিয়তম মানুষ ছিলেন। উনার ভরণ-পোষণে তিনি অকাতরে অর্থ ব্যয় করতেন এবং তিনি উনার প্রতি অত্যন্ত সদয় আচরণ করতেন। অন্যদের জুলুম-নির্যাতন ও কটাক্ষ থেকে তিনি তাঁহাকে রক্ষা করতেন। তিনি নিজে প্রকাশ্যে ইব্রাহীমী ধর্মমতের অনুসরণকারী থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে কষ্ট দেয়ার ব্যাপারে তিনি কাফেরদের বিরোধিতা করতেন। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর অন্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি ভালবাসা দিয়েছিলেন।(আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া/৩)
এখানে একটি কথা উল্লেখ না করলে বিষয়টা একটু অপূর্ণ রয়ে যায় - আমাদের সুন্নি আলেম ওলামাগণ রসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি আবু তালেবের ভালবাসাকে ভাতিজা হিসেবে ভালবেসেছেন বিধায় তাকে জান্নাত থেকে খারিজ করে দিয়েছেন। অথচ লক্ষ্য করুন প্রথম সারির কাফের ছিল আবু-লাহাব যার পরিনতির কথা আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন করিমের সুরা দ্বারা ধার্য করে দিযেছেন। তার পরও রসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) উনাকে ভ্রাতুষ্পূ্ত্র হিসেবে ক্ষনিকের ভালবাসার কারণে সপ্তাহের সেই দিনটি নিয়মিত জাহান্নামের আযাব লাঘব করার প্রমান হাদিসে ভাষ্যে প্রমানিত। তাহলে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের দলিল চতুষ্টয় যথা.- [কোরআন,সুন্নাহ্, ইজমা,কিয়াস] সেই ্হিসেবে আবুতালিবের বেলায় আরোপিত ্হয়নি কেন ? যিনি আমরণ রসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে প্রাণের ছেয়েও বেশী ভালবেসেছিলেন। কাফের আবু-লাহাব ক্ষণিকের ভালবাসায় প্রতি সপ্তাহে একদিন আযাব থেকে মুক্তি পেতে পারে পক্ষান্তরে আমরণ ভালবাসার বিনিময়ে অবিরত জাহান্নামের শিকলাবদ্ধ করা হয়েছে চাচা আবু-তালেবকে। (আল্লাহ্ তার প্রতি অনুগ্র্ করুন)
আবূ তালিব একদিকে তাঁর পূর্বপুরুষের ধর্মমতে থেকেছিলেন, আর অন্যদিকে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে জান-প্রাণ দিয়ে রক্ষা করেছিলেন। এ দ্বিমুখী কর্মকাণ্ডের মধ্যে নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলার হিকমত রয়েছে। কারণ, আবূ তালিব যদি ইসলাম (প্রকাশ্যে) গ্রহণ করতেন, তবে কুরায়শ বংশীয় মুশরিকদের নিকট তাঁর কোন প্রভাব ও গুরুত্ব থাকত না। তাদের উপর বড় কথা বলার মত অবস্থা তাঁর থাকত না। তখন তাঁরা তাঁকে ভয়ও পেত না, তাঁকে সমীহও করত না। উপরন্তু তাঁর বিরুদ্ধাচরণের দুঃসাহস দেখাত এবং মুখে ও কাজে তাঁর প্রতি অসদাচরণের চেষ্টা করত ।
(আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া/৩)
আবুতালিবের কঠোর প্রতিরোধের মুখে কাফেররা যুদ্ধ উন্মাদনায় তীব্র হয়ে উঠে। এক পর্যায়ে তা সাম্প্রদায়িক ভাবে যুদ্ধের রূপ নেয়। অতঃপর আবুতালিবের নেতৃত্বে সম্প্রদায়ের লোকেরা যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণ করে। একে অন্যকে যুদ্ধের জন্যে আহবান জানায় ।
এ প্রেক্ষাপটে মুঈম ইব্ন 'আদীকে কটাক্ষ করে আব্দ মানাফ গোত্রের যারা তাঁকে অপমানিত করেছে, তাদেরকে তিরস্কার করে এবং কুরায়শ গোত্রের যারা তাঁর প্রতি শত্রুতা পোষণ করেছে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে আবূ তালিব নিম্নোক্ত কবিতা পাঠ করেন।
তারা যে প্রস্তাব করেছে, সে প্রস্তাব যে তাঁর নিকট মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়, তা তিনি কবিতায় উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন :
"হে পথিক! আমর (আবূ জাহল ওয়ালীদ) ও মুতঈমকে বলে দাও যে,
যদি তাদের সংস্পর্শ থেকে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যেত তবে ভাল হত।
[এখানে তিনি রসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর খাতিরে রক্ত-সম্পর্ক ছিন্ন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন]
আমার সম্পর্ক যদি ছিন্ন হয়ে যেত তার থেকে যে দুর্বল,
মন্দ চরিত্র এবং খর্বকায়,
অথচ চীৎকার করে খুব বেশী।
যার প্রস্রাবের ফোঁটা ঝরে পড়ে পায়ের গোছার উপর ।
যে সব সময় কাফেলা ও যাত্রীদলের পেছনে পড়ে থাকে। ওদের নাগাল পায় না। মসৃণ পাথরে ও উঁচুতে উঠলে তাকে অনেকটা খরগোশের মত দেখায়।
আমাদের দুই সহোদার ভাইকে আমি দেখি যে,
তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া হলে তারা বলে সকল ক্ষমতা অন্যদের হাতে।
না, ক্ষমতা বরং তাদেরই হাতে।
কিন্তু তারা একজন অপরজনের উপর গড়িয়ে পড়ছে
যেমন মূ'আলাক পাহাড়ের চূড়া থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ে।
বিশেষভাবে আমি উল্লেখ করছি আব্দ শাম্স ও নাওফিল এ দু' গোত্রের কথা।
তারা আমাদেরকে দূরে নিক্ষেপ করেছে যেমনটি ফেলে দেয়া হয় জ্বলন্ত অঙ্গার ।
সম্প্রদায়ের মধ্যে তারাই আপন ভাইদের অধিক নিন্দাকারী ও অপমানকারী।
নিজ ভ্রাতৃবংশের জন্যে তাদের হাতে কিছু উঠে না ।
সকল মানুষের মধ্যে তারা দু গোত্রই পিতৃহীন বালকের সাথে মর্যাদায় শরীক।
তারা তার নাম-নিশানা মুছে ফেলতে চায় ।
তায়ম, মাখযূম ও যুহরা গোত্রের কথাও আমি উল্লেখ করছি।
সাহায্য প্রার্থনাকালে ওরা আমাদের সাহায্যকারী ছিল।
তবে আল্লাহর কসম, এখন তোমাদের মাঝে আর আমাদের মাঝে শত্রুতা ও বৈরিতার অবসান হবে না-
যতদিন আমাদের একজন [রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর অনুসারী] বংশধরও জীবিত থাকে।"
ইবন হিশাম বলেন, দু'টি পংক্তিতে কটূক্তি থাকার কারণে আমরা ওই দুটো পংক্তি উল্লেখ করিনি।
[আমার একটি অনুরোধ কারো নজরে যদি সেই দু'টি উক্তি পরিলক্ষিত হয় অপূর্ন লিখাটি ফূর্ণ করতে সাহা্য করবেন।]
(চলবে)
-------------------------
অসমাপ্ত
Comments
Post a Comment