দুনিয়ার পরিবেশে মানুষের রুহ্ অপরিচিত কেন ?
দুনিয়ার পরিবেশে মানুষের রুহ্ অপরিচিত কেন ?
প্রশ্ন করা হইয়াছে , —
মানুষের আত্মা এই দুনিয়াতে এক অপরিচিত আগন্তুক সর্বাবস্থায় সে উদ্ধ‘জগতে উড়িয়া যাওয়ার জন্য উন্মুখ থাকে, —এই কথার অর্থ কি ?
এই ধরণের বিশ্বাস তো নাছারা এবং ভ্রান্ত দার্শনিকেরা প্রকাশ করিয়া থাকে ! এই প্রশ্নের জবাবে তোমাদের জানিয়া রাখা দরকার যে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্, ঈসা রাছুলুল্লাহ — এই কথাটি নাছারাদের, তাই বলিয়াকি কথাটি সত্য নয় ? হযরত ঈসা কি আল্লাহর প্রেরীত রাছুল নহেন ? স্মরণ রাখিও, কোন বাতিলপন্থী লোক যদি হক কথা বলে, তবে বক্তার বাতিলপন্থী হওয়ার কারণেই তা বাতিল প্রতিপন্ন হইয়া যাইবে না । এইরূপ মনে করা নিতান্ত মূখ'ত । যে কোন ব্যক্তি কতৃক যে কোন একটি অন্যায় কথা একবার উচ্চারণ করার পর আর তার মুখ হইতে কখনও কোন হক কথা বাহির হইবে না, তার মুখ হইতে অতঃপর যা কিছু বাহির হইবে সবই বাতিল বলিয়া বিবেচিত হইবে । প্রকৃত বুদ্ধিমানগণের রীতি হইল 'কথাটি যথার্থ কিনা, তা যাচাই করিয়া দেখা । যেমন হযরত আলী (রঃ) বলিয়াছেন , “তোমরা আল্লাহ তা'লাকে মানুষের মাধ্যমে চিনবার চেষ্টা করিও না, বরং প্রথমে পরম সত্যকে জানবার চেষ্টা কর, তাহার সম্পর্কে জানা হইয়া গেলে কারা হকপন্থী তাহাদের পরিচয় স্বাভাবিক ভাবেই হইয়া যাইবে ।”
মানুষের রুহু এই দুনিয়ার পরিবেশে সত্যসত্যই অপরিচিত । তার প্রকৃত ঠিকানা এই দুনিয়ায় নয়. তার আসল ঠিকানা উদ্ধ-জগতে বেহেশতের মধ্যে । এই জন্যই তার আত্মার পূর্ণ পরিতৃপ্তি বেহেশতের পরিবেশে তথা উদ্ধ'জগতের সঙ্গেই সম্পম্পৃক্ত । কুরআন শরীফের পাতায় পাতায় এই সত্যের সমর্থন এবং সাক্ষ্য বিদ্যমান রহিয়াছে । এখন যদি কোন খৃষ্টান বা ভ্রান্ত দাশ'নিক এই একই কথা বলিয়া থাকে, তবে কি এই কথা মিথ্যা হইয়া যাইবে ? কুরআন এবং হাদীছে বরং প্রমাণের মাধ্যমে এই সত্য প্রমাণিত, সুতরাং একই কথা কোন আহলে-বাতিলের মুখ হইতে বাহির হইলেই তাহা বাতিল বলিয়া ধরিয়া নেওয়া যাইবে না । কেহ যদি অন্তর্দৃষ্টি একটু প্রসারিত করিয়া আত্মার প্রকৃত পরিচয় লাভ করিতে চেষ্টা করে, তবে সে দেখিতে পাইবে যে, রুহের একমাত্র প্রবনতাই হইতেছে মহান পরওয়ারদিগারের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হওয়ার একাগ্র আকাংখা ৷ সেই মহান সত্বার জ্যোতিই হইল তাহার পক্ষে প্রকৃত শক্তির আধার । অবশ্য দুনিয়ার কিছু কিছু বিষয়ের সঙ্গেও রুহের কিছুটা একাত্মতা লক্ষ্য করা যায়, তবে তা নিতাই গৌণ; সেই মহা সত্বার সান্নিধ্য লাভ এবং তাহারই প্রতি ধাবিত হওয়া ব্যতীত সে প্রকৃত অর্থে তৃপ্ত হইতে পারে না । মারেফাতে-ইলাহীর অমৃত সুধা পান করিয়াই তার প্রাণ প্রাচুর্য্য লাভ হয়, এ অমৃতের তালাশেই সতত সে উন্মুখ হইয়া অগ্রসর হইতে থাকে । মারেফাতে ইলাহীর অমৃত সন্ধান করিয়াই তার জীবন প্রবাহ আবর্তিত হইতেছে এবং সেই মকসুদের পথে অগ্রসরমান অবস্থাই তার প্রকৃত প্রাণবস্ততার লক্ষ্মণ । এহইয়াউল-উলুম এবং কিমিয়ায়ে সাআদাত কিতাবে রুহের এই অবস্থা এবং চিরন্তন প্রবণতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হইয়াছে । কেহ যদি এই সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান লাভ করিতে চায়, তবে তার উচিত সেই দুইটি কিতাব গভীর মনোযোগ সহকারে পাঠ করা । অপরপক্ষে যদি কেহ নিছক বিদ্বেষ বশতঃই সমালোচনা করিতে শুরু করে, তবে যেহেতু উপরোক্ত দুইট কিতাবের বিস্তারিত আলোচনা তাহাকে তৃপ্তি দিতে পারে নাই, এই সামান্য জবাব তার বিদ্বেষতাপে তপ্ত অন্তর শান্ত হইবে বলিয়া আশাকরা যায় না । তাই এই শ্রেণীর আপত্তি উত্থাপনকারীগণের প্রশ্নের জবাব দেওয়া বৃথা সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছু নয় । অবশ্য যদি কোন প্রকৃত সত্যান্বেষী ব্যক্তি কিতাব পাঠ করিয়া বিষয়টি যথার্থভাবে অনুধাবন করিতে সমর্থ না হইয়া থাকেন এবং সত্যই এই সূক্ষ্ বিষয়টি সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান লাভ করিতে চান, কিন্তু যথেষ্ট ধীশক্তির অভাবে প্রকৃত সত্যের গভীরতায় পৌঁছিতে অসমর্থ হইয়া থাকেন, তবে তাঁহার পক্ষে উচিত সরাসরি আমার সম্মুখে হাজির হইয়া পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি অনুধাবন করিতে চেষ্টা করা । কেননা, উলামাগণের ষবানী যে এলেম হাছিল করা হয়, সেই এলেমই মজবুত এবং যথার্থ হইয়া থাকে । অবশ্য আমি আমার রচিত কিতাবসমুহে এমন কোন বিষয়ের অবতারণা করিনাই, যা যে কোন বুদ্ধিমান জ্ঞানান্বেষী, এবং যাহাদের অন্তর বিদ্বেষবিষে জর্জরিত নয়, এমন লোকের সম্মুখে প্রমাণসহ ব্যাখা করিতে সমর্থ হই নাই । তবে এমন লোককে আমি কোন দলীল প্রমাণ দ্বারাই বুঝাইতে সমর্থ হইব না, যাহাদের সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে যে, — “ প্রকৃত সত্য অনুধাবন করা হইতে আমি তাহাদের অন্তরে পর্দা দিয়া রাখিয়াছি । আর তাহাদের শ্রবণশক্তি আবৃত করিয়া রাখ : হইয়াছে শক্ত আবরণে, যদি আপনি তাহাদিগকে হেদায়েতের পথে আহবান করেন, তবে তাহা কখনও তারা শুনিতে পাইবে না ।” – কুরআন ! তুমি আগ্রহ প্রকাশ করিয়াছ যে, এই ধরণের জটিল বিষয়গুলি যেন ব্যাখ্যা করিয়া দেওয়া হয় । মনে রাখিও আমার কোন কিতাবেই এমন কোন বিষয়ের অবতারণা করা হয় নাই যা উত্তমরূপে ব্যাখ্যা করা হয় নাই । সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন প্রত্যেকটি লোকের পক্ষেই এই সমস্ত বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝা অত্যন্ত সহজ । কিন্তু যে সমস্ত লোক যথাযথ ধীশক্তিসম্পন্ন নয় এবং এই সমস্ত বিষয় পাঠ করিয়াও বুঝে না, তাহাদের সেই সমস্যার একমাত্র সমাধান হইতেছে, তারা আমার সম্মুখে আসিয়া যেন প্রত্যেকটি সূক্ষ্ম বিষয় মীমাংসা করিয়া নেয় । আমার কথাবার্তা শুনিয়া এবং আমার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করিয়া এই সমস্ত সমস্যার সমাধান করা ব্যতীত তাহাদের পক্ষে আর কোন পথ দেখি না ।
মূর্খলোক কখন কোন বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন করিবে তা নির্ধারণ করা দুরুহ ব্যাপার । সুতরাং তাহাদের জন্য পূর্ব হইতে কোন জবাব লিখিয়া দেওয়া সম্ভব নয় ৷ মূর্খতাজনিত বুঝের অভাব, অন্তরের রোগ এবং তার কারণসমূহ বিচিত্রধর্মী একটির সঙ্গে অপরটির অনেক সময় কোন সম্পর্ক থাকে না । অন্তরের রোগ যে কত প্রকার ও নিৰ্দ্ধারণ করাও সম্ভবপর নয় । সেই দিকে লক্ষ্য করার কোন প্রয়োজনীয়তা আছে বলিয়াও আমি মনে করি না । এই ধরণের রোগে আক্রান্তদের ব্যাধী সারাইতে হইলে কুরআন শরীফের প্রতি গভীরভাবে মনোযোগ দিতে হইবে । অবশ্য মূর্খদের এতেরাজ সমূহ কুরআন শরীফের দ্বারাও অনেক সময় দূর করা যায় না । ইহাদের অস্তরে অহর্নিশি এমন অসংখ্য শোবা-সন্দেহের উদ্রেক হইতে থাকে যার কোন চিকিৎসা নাই । এদের মনোজগতের সব রোগ সারানোর আশা করাও বৃথা । কেননা, – “ যে ব্যক্তির জিহ্বার স্বাদই বিগড়াইয়া গিয়াছে, তাহার মুখে সুপেয় মিষ্টি পানিও তিক্ত বলিয়া অনুভূত হয় ।
-----------------------

Comments
Post a Comment