ওয়াহাবীদের প্রতি নসীহত পর্ব- ২
ওয়াহাবীদের প্রতি নসীহত পর্ব- ২
ওয়াহাবী পুস্তকটির *1 ৪৮ এবং ৩৪৮ নং পৃষ্ঠায় লেখা রয়েছে,
এবাদত তথা আমল (সৎকর্ম) মূল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। এবাদত করে না এমন ব্যক্তির ঈমান বিদূরিত হয়। ঈমান বৃদ্ধি অথবা হ্রাস পেতে পারে। আশ্ শাফেয়ী, আহমদ ইবনে হাম্বল এবং অন্যান্যরা সর্বসম্মতভাবে তাই বলেছেন।
*1 [ফাতহুল মাজীদ : বাবু দু'য়ায়ি ইলা শাহাদাতিল লা ইলাহা ১/৯৩।
*1ফাতহুল মাজীদ : বাবু ফদ্বলিত তাওহীদ ১/৪৮।]
জবাব হল
এবাদত যে একটি কর্তব্য তা বিশ্বাস করা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বিশ্বাস ও কর্তব্য পালন দুইটি ভিন্ন বিষয়, যেগুলোকে তালগোল পাকিয়ে ফেলা মোটেই উচিৎ নয়। কোনো ব্যক্তি বিশ্বাস স্থাপন করে যদি আলস্যবশতঃ তার বিশ্বাসকে আমল না করে, তবে সে কাফেরে পরিণত হবে না।
ওয়াহহাবীরা এ ব্যাপারটি বুঝতে না পেরে লক্ষ- কোটি মুসলমানকে কাফের ফতোয়া দিয়ে ফেলছে। অথচ কেউ যদি কোনো মুসলমানকে কাফের আখ্যা দেয়, তা হলে সে নিজেই কাফেরে পরিণত হয়।
'কাসিদা-এ আমলী' পুস্তকের তেতাল্লিশতম পংক্তিটি বলে, ”ফরয এবাদত (মূল) ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়”।
হযরত ইমামে আ'যম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ঘোষণা করেন যে,
আমল (পুণ্যময় কর্ম) ঈমানের অংশ নয়।
ঈমান অর্থ বিশ্বাস। বিশ্বাসের মধ্যে আধিক্য অথবা স্বল্পতা নেই। যদি এবাদত ঈমানের অন্তর্ভুক্ত হতো, তাহলে ঈমান বৃদ্ধি বা হ্রাস পেতো। মৃত্যুকালে পর্দা ওঠে যাবার পর যদি আযাব দেখে ঈমান আনা হয়, তবে তা গ্রহণীয় হবে না। কিন্তু মৃত্যুকালে কেউ ঈমান আনলে সেটা হবে অন্তরের বিশ্বাস; এবাদত তার পক্ষে পালন করা সম্ভব হয়নি। আর এটাই হলো আয়াতে উল্লেখিত ঈমান। বহু আয়াতে ঈমানদারদেরকে এবাদত পালন করতে আদেশ দেয়া হয়েছে। অতএব, ঈমান আমল থেকে পৃথক। নিচের কুরআনের আয়াত-
“যারা বিশ্বাস করো এবং যারা সওয়াবদায়ক কাজ করো”
আয়াতে পরিস্ফুট করে যে ঈমান ও এবাদত একই বিষয় নয়। ‘ঈমানদার যারা সওয়াবদায়ক কাজ করে' আয়াতটি স্পষ্টই প্রতীয়মান করে যে আমল ঈমান থেকে ভিন্ন। কারণ কোনো কিছু আরোপের আজ্ঞা এবং আরোপিত বিষয় এক হতে পারে না। এ কথা সর্বসম্মতিক্রমে জ্ঞাত হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি মৃত্যুর পূর্বে ঈমান আনে এবং আমল করার সময় না পায়, তবে তাকে ঈমানদার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
হাদীস আল জিবরীল-এ ঘোষিত হয়েছে যে “ঈমান অর্থ বিশ্বাস।”
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম শাফেয়ী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ও বহু হাদীসবিদ ওলামা এবং আশ'আরী ও মুতাযিলা সম্প্রদায় বলেছেন যে এবাদত ঈমানের অংগীভূত এবং এটা হ্রাস বা বৃদ্ধি পেতে পারে; এও বলেছেন যে ঈমান ও এবাদত যদি ভিন্ন হতো, তবে নবীগণের ও ফাসিকদের (পাপী) ঈমানও একই (পর্যায়ের) হতো। তাঁরা বলেন যে,
“আমার আয়াতগুলো শ্রবণের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়”-
[আল কুরআন: সূরা আনফাল, ৮/২।]
আয়াতটি এবং ’ঈমান বৃদ্ধি পেলে এর অধিকারীকে বেহেশতে নিয়ে যায়, আর হ্রাস পেলে দোযখে’- হাদিসটি ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধিকে বোঝায়।
এর বহুকাল পূর্বেই ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ব্যাপারটির প্রত্যুত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, ঈমানের বৃদ্ধি মানে স্থায়িত্ব, দীর্ঘায়ু।
ইমাম মালেক রাহমাতুল্লাহি আলাইহিও একই কথা বলেছেন। ঈমানের প্রাচুর্যের মানে হচ্ছে বিশ্বাস স্থাপনের বিষয়গুলোর বৃদ্ধি।
উদাহরণস্বরূপ, সাহাবা-এ-কেরাম প্রাথমিক অবস্থায় অল্প কিছু বিষয়ে বিশ্বাস করেছেন, কিন্তু নতুন নতুন ঐশী আদেশের অবতরণের সাথে সাথে তাঁদের ঈমানও বৃদ্ধি পায়। ক্বলবে (অন্তরে) নূরের (জ্যোতির) বৃদ্ধি হওয়াটাই হচ্ছে ঈমানের বৃদ্ধি। এ আলোকচ্ছটা এবাদত করলে বৃদ্ধি পায় আর গুনাহ করলে হ্রাস পায়। এ ব্যাপারে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে ’শরহে মাওয়াক্বিফ' এবং 'জওহারাতুত্ তাওহীদ' কিতাবগুলোতে। উলামা-এ- ইসলাম এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা লিপিবদ্ধ করে ওহাবী গোমরাহদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন।
ওয়াহাবী পুস্তকটির ৯০ নং পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ আছে,
”একজন সাহাবী মদ্যপান বর্জন করেননি। তাঁকে শাস্তিস্বরূপ বেত্রাঘাত করা হয়; যখন কিছু সংখ্যক সাহাবা তাঁকে লা'নত (অভিসম্পাত) দেন তখন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, "তাকে লা'নত দেবে না। কারণ সে আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম-কে ভালোবাসে।”
ওয়াহাবীটিও স্বীকার করেছে যে কোনো ফাসিক-গুনাহগার মুসলমান তার ফিসকের (পাপ) জন্যে কাফের (অবিশ্বাসী) হয় না। এ হাদীস ওয়াহাবীদের দাবিকে সমূলে উৎপাটিত করেছে। এটা আরও প্রমাণ করে, “যে ব্যক্তি যেনা করে না, সে চুরিও করে না”- হাদীসটা ঈমানকে নয়, বরং তার পরিপক্বতাকে ইশারা করে।
আল্লামা বিরগিউয়ীর লেখনী ব্যাখ্যাকালে হযরত আবদুল গনী আন্ নাবলুসী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর প্রণীত 'আল হাদিক্বা' গ্রন্থের ২৮১ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ”হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক উম্মোচিত আল্লাহ পাকের জ্ঞানের প্রতি অন্তরের বিশ্বাস এবং জিহ্বা দ্বারা তা ঘোষণা করাই হচ্ছে ঈমান। এ জ্ঞানের প্রত্যেক অংশ অধ্যয়ন এবং উপলদ্ধি করা আবশ্যক নয়। মু'তাযিলা গোমরাহ সম্প্রদায় বলেছিল যে, বিশ্বাস করার পর উপলদ্ধি করতে হবে। হযরত আয়নী সহিহ বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকালে ( শরাহ) বলেন যে, মুহাক্কিকিন তথা উলামা-এ-হক্কানী, যেমন, আবুল হাসান আল আশ্আরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, কাযী আবদুল জব্বার, ওস্তাদ আবুল ইসহাক্ব আল ইসফারাইনী, হুসেইন ইবনে ফযল প্রমুখ বলেছেন, ‘ঈমান হচ্ছে সুস্পষ্টভাবে ঘোষিত বিষয়গুলোর প্রতি অন্তরের বিশ্বাস। জিহ্বা দ্বারা ঘোষণা করা অথবা এবাদত করা ঈমান নয়'। হযরত সা'দ উদ্দীন তাফতাযানীও তাঁর 'শরহে আকাইদ' গ্রন্থে এটা লিখেছেন এবং রেওয়ায়াত করেছেন যে শামস্ আল আয়ো ও ফখরুল ইসলামের মতো উলামা এটাকে জিহ্বা দ্বারা ঘোষণা করা অপরিহার্য বলেছেন। অন্তরের ঈমানকে জিহ্বা দিয়ে সমর্থন করার কারণ হলো, এতে মুসলমানগণ একে অপরকে চিনতে পারেন সহজেই। যে মুসলমান বলেন না যে তিনি মুসলমান, তিনিও মুসলমান বটে। অধিকাংশ উলামা, যেমন, ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম মালেক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন যে আমল (মূল) ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। যদিও ইমাম আলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম শাফেয়ী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন যে, ঈমান হচ্ছে বিশ্বাস স্থাপন এবং তা জিহ্বা দ্বারা ঘোষণা ও এবাদত পালন, তবুও বস্তুতঃ তাঁরা বুঝিয়েছেন ঈমানের পরিপক্কতা বা পূর্ণতাকে। এ কথা সর্বসম্মতভাবে ঘোষিত হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি তার অন্তরে ঈমানের উপস্থিতির কথা ঘোষণা করে, তবে সে মু'মিন (বিশ্বাসী)। কোনো আলেমই তাকে বিশ্বাসী আখ্যায়িত না করে থাকেন নি। সহিহ বুখারী শরীফের ব্যাখ্যায় হযরত আল্ কারমানী লিখেছেন, 'যদি এবাদতকে (মূল) ঈমানের অন্তর্ভুক্ত বিবেচনা করা হতো, তবে ঈমান বৃদ্ধি বা হ্রাস পেতো। কিন্তু অন্তরের ঈমান হ্রাস বা বৃদ্ধি পায়না। যে বিশ্বাস হ্রাস বা বৃদ্ধি পায়, সেটা কোনো ঈমানই নয়, বরং সন্দেহ ও অনাস্থা'। ইমাম মুহিউদ্দীন ইয়াহইয়া আন্ নববী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, 'বিশ্বাস স্থাপনের বিষয়গুলোর কারণসমূহ অধ্যয়ন এবং উপলদ্ধি (বোঝা) করাই হচ্ছে ঈমান। হযরত আবু বকর রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর ঈমান অন্য লোকদের ঈমানের মতো না' । ইমাম নববীর এই বাক্যটি ঈমানের দৃঢ়তা অথবা দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করে। এর মানে এই নয় যে ঈমান বৃদ্ধি বা হ্রাস পায়। এটা অনেকটা একজন অসুস্থ লোকের সঙ্গে স্বাস্থ্যবান লোকের তুলনা দেয়ার মতোই ব্যাপার; তারা একই রকম শক্তিধর নয়, কিন্তু উভয়ই মানুষ এবং তাদের মানুষ হওয়ার গুণের মধ্যে কোনো হ্রাস বা বৃদ্ধি নেই। হযরত ইমাম আল আযম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ঈমানের গুণ বর্ণনাকারী আয়াত ও হাদীসগুলোকে নিম্নরূপ ব্যাখ্যা করেছেন, 'সাহাবা-এ-কেরাম ইসলাম গ্রহণের সময় সকল বিষয় বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন। সময়ের বিবর্তনে পরবর্তীকালে আরও বহু বিষয় ফরয হয়ে যায়। তাঁরা এক এক করে সবগুলোকেই বিশ্বাস করে নেন। ফলে তাঁদের ঈমান ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। এটা শুধু সাহাবা-এ- কেরামের জন্যেই খাস (নির্দিষ্ট)। পরবর্তীকালে আগত মুসলমানদের জন্যে ঈমানের বৃদ্ধি চিন্তাই করা যায় না।'শরহে আকাঈদ' গ্রন্থে হযরত সাদ-উদ-দ্বীন তাফতাযানী লিখেছেন, 'যারা অল্প জানে তাদেরকে সংক্ষিপ্তভাবে ঈমান আনতে হবে, আর যারা বিস্তারিত জানে তাদের জন্যে সেই অনুসারে বিশ্বাস স্থাপন করা অপরিহার্য। পূর্ববর্তীদের চেয়ে পরবর্তীদের ঈমান অবশ্যই বেশি। কিন্তু পূর্ববর্তীদের ঈমানও সম্পূর্ণ। তাদের ঈমান ত্রুটিযুক্ত নয়।' শরহে আকাঈদ হতে উদ্ধৃতি শেষ হলো ।
হযরত আবদুল গণী নাবলুসী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এরপর সিদ্ধান্ত টানেন, ”সংক্ষেপে ঈমান নিজে নয় বরং তার দৃঢ়তাই হ্রাস বা বৃদ্ধি পায়। অথবা যারা বলেছেন যে এবাদত ও আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত, তাঁরা আসলে ঈমানের পূর্ণতা বা মূল্যকে এর হ্রাস-বৃদ্ধির মর্মার্থস্বরূপ বুঝিয়েছেন। ঈমানের সিফাত (গুণ) বর্ণনাকারী আয়াত ও হাদীসগুলোর ব্যাখ্যা তা-ই করা হয়েছে। যেহেতু এটা এ রকম একটা বিষয় যেখানে ইজতেহাদ (গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত) প্রয়োগ করা যায়, সেহেতু বিভিন্ন ধরণের ব্যাখ্যার আবির্ভাব ঘটেছে। কিন্তু কোনো ব্যাখ্যাকারী অপর কাউকে দোষারোপ করেননি”। অথচ ওয়াহাবীরা ঘৃণ্য ঔদ্ধত্য দেখিয়ে এবাদতে বিশ্বাসী কিন্তু আলস্যবশতঃ আমল করতে অক্ষম মুসলমানদের কাফের ও মুশরিক ফাতোয়া দিচ্ছে।
“বারিকা' গ্রন্থে লিখেন, এবাদত ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। হযরত জালালুদ্দিন আদ্ দাওয়ানী বলেছেন, মু'তাযিলা সম্প্রদায় এবাদতকে ঈমানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতো এবং বলতো যে, এবাদত করে না এমন ব্যক্তিবর্গ বেঈমান (কাফের, অবিশ্বাসী)। এবাদত ঈমানকে পরিপক্বতা ও সৌন্দর্য দান করে; সালাফ আস্ সালেহীন বলেছেন যে এবাদত একটি গাছের শাখা-প্রশাখার মতোই' । ইমাম আল্ আযম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম মালেক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম আবু বকর রাযী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং আরও বহু আলেম বলেছেন যে, এবাদতের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি অথবা পাপের (গুনাহ) মাধ্যমে ঈমান হ্রাস পায় না কারণ ঈমান মানে পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস এবং তাই এটার কোনো হ্রাস-বৃদ্ধি নেই। কলবে (অন্তরে) ঈমানের বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত কুফরের হ্রাস পাওয়া, যেটা একেবারেই অসম্ভব। ইমাম শাফেয়ী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম আশআরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন যে ঈমান হ্রাস-বৃদ্ধি পায়। কিন্তু 'মাওয়াক্বিফ' গ্রন্থে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে তাঁরা এই মন্তব্য দ্বারা ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধিকে বোঝাননি, বরং ঈমানের শক্তি (দৃঢ়তা)-কে বুঝিয়েছেন। কারণ নবী আলাইহিস্ সালাম-এর ঈমান ও তাঁর উম্মতের ঈমান এক নয়। যা শোনে তাতেই বিশ্বাস স্থাপনকারী ব্যক্তির ঈমান, জ্ঞান ও যুক্তি সহকারে বিচার- বিশ্লেষণকারী শ্রোতার ঈমান হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কুরআনে লিপিবদ্ধ আছে যে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর ক্কলবে 'ইতমিনান' (প্রশান্তি) অথবা ‘ইয়াকিন' (দৃঢ় বিশ্বাস) অর্জন করতে চেয়েছিলেন। ইমাম আল আযম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর 'ফিকাহ-এ-আকবর' কিতাবে লিখেছেন: 'বিশ্বাস স্থাপনের বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে আসমানের বাসিন্দা (ফেরেশতা) এবং পৃথিবীবাসীদের (মানব ও জ্বিন) ঈমান হ্রাস বা বৃদ্ধি পায় না; ইত্বমিনান কিংবা ইয়াক্বিনের ফলেই ঈমান বাড়ে বা কমে।
আরেক কথায়, ঈমানের শক্তি হ্রাস বা বৃদ্ধি পায়; তবে ইয়াকিনবিহীন (শক্তিবিহীন) ঈমান কোনো ঈমান নয়, বরং ধারণা অথবা সন্দেহ'। ফিকাহ-এ-আকবরের উদ্ধৃতি শেষ হলো।
'মকতুবাত' গ্রন্থে ইমামে রব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেছেন, “যেহেতু ঈমান হচ্ছে অন্তরের (ক্বলবের) সম্মতি ও দৃঢ় বিশ্বাস, সেহেতু এর হ্রাস-বৃদ্ধি নেই। যে বিশ্বাস বাড়ে বা কমে সেটাকে ঈমান বলে না, বরং কল্পনা বলে। যখন কোনো ব্যক্তি এবাদত ও আল্লাহ তা'আলার পছন্দকৃত আদেশসমূহ পালন করে, তখন তার ঈমান আলোকোজ্জ্বল (নূরাণী) হয়ে ওঠে। আর যখন কোনো ব্যক্তি গুনাহ সংঘটন করে, তখন তার ঈমান নিষ্প্রাণ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। অতএব, এবাদতের ফলে (ঈমানের) ঔজ্জ্বল্যের পরিবর্তনই হচ্ছে হ্রাস বা বৃদ্ধি। ঈমানের নিজের মধ্যে কোনো হ্রাস-বৃদ্ধি নেই। কেউ কেউ বলেছেন যে নূরাণী (আলোকোজ্জ্বল) ঈমান অন্ধকারাচ্ছন্ন ঈমান থেকে বেশি এবং তারা অন্ধকারাচ্ছন্ন ঈমানকে ঈমান হিসেবে গণ্যই করেননি। তাঁরা কিছু মানুষের কম আলোকোজ্জ্বল ঈমানকে ঈমান হিসেবে বিবেচনা করেছেন, তবে বলেছেন যে এই ধরণের ঈমান অন্যদের ঈমানের চেয়ে কম যেন এই দুই ধরণের ঈমান দুইটি আয়নার মতো, যেগুলোর ঔজ্জ্বল্য দুইটি ভিন্ন পর্যায়ের এবং উজ্জ্বল আয়নাটি কম উজ্জ্বলটির চেয়ে পরিষ্কার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম। আবার কেউ কেউ বলেন যে উভয় আয়নাই সমকক্ষ, তবে তাদের ঔজ্জ্বল্য এবং প্রতিফলন, অর্থাৎ, তাদের উপাদান ভিন্ন। যাঁরা প্রথমোক্ত তুলনাটা দিয়েছেন, তাঁরা বাহ্যিক চাকচিক্যটাই দেখেছেন কিন্তু মূল বিষয়বস্তু উপলব্ধি করতে পারেন নি। ‘আবু বকরের ঈমান আমার সকল উম্মতের ঈমানের চেয়ে ভারি'- হাদিসটি ঔজ্জ্বল্যের দৃষ্টিকোণেরই তুলনামাত্র”। ২
ওহাবী ‘ফাহ আল্ মজিদ' গ্রন্থটি একটি হাদীস উদ্ধৃত করে,-“কোনো মুসলমানের ঈমান সম্পূর্ণ হতে পারে না যদি সে আমাকে তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও অন্যান্যদের চেয়ে বেশি ভালো না বাসে”। এবং তার পর লিখে, “ক্বলবের মধ্যে ভালোবাসা আছে। এটা ক্বলবের একটা কাজ; সুতরাং এই হাদীসে প্রতিভাত হয় যে এবাদত ও আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত এবং ঈমানের পূর্বশর্ত।”
ভালোবাসা ক্বলবের (অন্তরের) কোনো কাজ নয়, বরং সিফাত (গুণ)। যদি তাকে আমরা একটি বারের জন্যে কাজ হিসেবে ধারণা করিও, তবুও এ কথা বলা যাবে না যে শরীরের সম্পাদিত কাজসমূহ অন্তরেরই কাজ। মহা-অপরাধীকে শাস্তি দেয়া হবে। কিন্তু যে ব্যক্তি সেই সব অপরাধ সংঘটনের ইচ্ছা মনে মনে পোষণ করে, তাকে শাস্তি দেয়া হবে না। সংক্ষেপে, অন্তরের ভাল কাজ হচ্ছে ঈমান স্থাপন করা এবং খারাপ কাজ হচ্ছে অবিশ্বাস (কুফর) করা অথবা বিশ্বাসবিহীন থাকা। অবিশ্বাস (কুফর) দেহের কোনো কাজ নয়। উদাহরণস্বরূপ, মিথ্যা কথা বলা হারাম (নিষিদ্ধ) এবং মিথ্যাবাদী একটি খারাপ কাজ সংঘটনকারী। কিন্তু সে কাফিরে রুপান্তরিত হবে না। তবে, মিথ্যাকে যে ব্যক্তি হারাম হিসেবে বিশ্বাস করবে না, সে কাফের হয়ে যাবে।
ওয়াহাবীটি দাবি করে, ”অন্তরের বিশ্বাস ও আমলের মাধ্যমে এবং জিহ্বা দ্বারা সমর্থন ও এবাদতের মাধ্যমে ঈমান খাঁটি হয়।” কিন্তু ৩৩৯ পৃষ্ঠায় সে বলে, ”যদি কেউ আল্লাহকে ভালোবাসে, তাহলে তাঁর অনুগত ও ভালোবাসাপ্রাপ্ত নবী-ওলীদেরও তার ভালোবাসা উচিৎ।”
অতএব, আউলিয়া এবং মুরশিদদেরকে ভালোবাসা আল্লাহকেই ভালোবাসার চিহ্নমাত্র। যারা এভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলা মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়। আল্লাহ পাক যাদেরকে ভালোবাসেন না তাদেরকে ভালোবাসা হারাম ও কুফর; আর তিনি যাঁদেরকে ভালোবাসেন তাঁদেরকে ভালোবাসা ঈমানের লক্ষণ এবং অত্যন্ত জরুরি দায়িত্ব বটে। এটাই হলো 'আল হুব্বু ফিল্লাহ ওয়াল বুগদু ফিল্লাহ্' নামক এবাদত। এই এবাদতকে সর্বশ্রেষ্ঠ এবাদত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
কাফের ও মুশরিকরা আল্লাহ তা'আলা ভিন্ন অন্য জিনিসকে ভালোবাসে। কিন্তু মুসলমানগণ যেহেতু আল্লাহ পাককে ভালোবাসেন, সেহেতু তাঁর ভালোবাসাপ্রাপ্ত নবী-ওলীদেরকেও তাঁরা ভালোবাসেন। ওয়াহ্হাবীরা এই দুই ধরণের ভালোবাসার মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। কাফেরদের ভালোবাসাকে তিরস্কারকারী আয়াতগুলো তারা মুসলমানদের ভালোবাসার ওপর চাপিয়েছে।
ওহাবী পুস্তকটি এবাদতকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত করে আহলে সুন্নতের কুৎসা রটনা করেছে। কারণ আহলে সুন্নত ওয়াহাবীটির কথায় বিশ্বাস করেন না। বাহাত্তরটি ভ্রান্ত ফেরক্কার অন্তর্গত খারেজী সম্প্রদায় এবং তাদের ওহাবী অনুসারীরা আয়াত ও হাদীসসমূহ অস্বীকার করে না, কিন্তু ভুল বুঝে থাকে এবং বলে থাকে যে ফরয পালন করা ও হারাম পরিহার করা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত, আর ঈমানের ছয়টি ভিত্তিতেই শুধু বিশ্বাস করা অপরিহার্য নয় বরং মুমিন (বিশ্বাসী) হতে হলে শরিয়ত অনুযায়ী আমলও করতে হবে; এবং তারা আরও বলে যে শুধুমাত্র একটি ফরযকে অমান্য করলেই কাফের হয়ে যেতে হবে এবং যে ব্যক্তি হারাম (নিষিদ্ধ) সংঘটন করে, সে নিঃসন্দেহে কাফের। ভুল বুঝে ওহাবীরা মুসলমানদেরকে কাফের আখ্যায়িত করছে অথচ, ঈমান হচ্ছে ফরযকে ফরয এবং হারামকে হারাম হিসেবে বিশ্বাস করা। অবিশ্বাস (কুফর) ও আমলবিহীন বিশ্বাস দুইটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। খারেজী এবং ওহাবীরা এই দুটোর মধ্যে তালগোল পাকিয়ে শেষ পর্যন্ত আহলে সুন্নত থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তবুও এর জন্যে তারা কাফের হবে না। তারা আহলে বিদআত (ধর্মের মধ্যে নতুন প্রথা প্রবর্তনকারী) হবে। কিন্তু যারা বেআমল, ফাসিক মুসলমানদেরকে কাফের আখ্যা দেয় তারা নিজেরাই কাফেরে পরিণত হয়। একটি হাদীসে ইরশাদ হচ্ছে, ”বিদয়াতীদের প্রতি ঘৃণা পোষণকারীদের হৃদয়কে আল্লাহ তা'আলা ঈমান দ্বারা পূর্ণ করে দেন।" যে ব্যক্তি বিদয়াতীকে সমালোচনা করবে তাকে আল্লাহ পাক পুনরুত্থান দিবসের ভীতি থেকে নিজ খাস রহমতে মুক্ত করে দেবেন।” পুনরুত্থান দিবসের আযাব থেকে মুক্তি কামীদের উচিৎ আহলে সুন্নতের শিক্ষা গ্রহণ করা এবং ঈমান-আক্বিদা খাঁটি করে সেই অনুযায়ী আমল করা।
**********************

Comments
Post a Comment