নুৱে-হাকিকী বলিতে কি বুঝায় ?
নুৱে-হাকিকী বলিতে কি বুঝায় ?
ইমাম গাজ্জা্লী রহঃ বলেন,-
আমাকে প্রশ্ন করা হইয়াছে : —
আল্লাহ, তিনিই নূর,—
এই কথা দ্বারা আপনি কি বুঝাইতে চাহিয়াছেন ?
নূর বলিতে আমরা যা বুঝি তা হইল, যে বস্তুর মধ্যে আলো রহিয়াছে এবং যার মধ্যে শিখাও দেখা যায়, কিন্তু আল্লাহ সম্পর্কে কি এই কথা খাটে ?
জবাব আমি আমার কিতাবের মধ্যে নূর শব্দের তাৎপর্য ও নুরের স্বরূপ এমনভাবে ব্যাখ্যা করিয়া দিয়াছি, যে বিষয়ে একটু চিন্তা করিলেই সবকিছু সুস্পষ্ট হইয়া যাইবে । নূর বলিতে শুধুমাত্র শিখাযুক্ত আলোকেই বুঝায় না । যদি তাহাই হইত, তবে স্বয়ং আল্লাহ, তাহার রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এবং কোরআন মজীদ নূর শব্দ দ্বারা আখ্যায়িত হইত না । কেননা, কুরআন বা রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) তো শিখাযুক্ত কোন আলো নন । সুতরাং বুঝা যাইতেছে যে, নূরে হাকিকী বা আল্লাহর নূর আমাদের সাধারণ দৃষ্টিগ্রাহ্য আলোর সমপর্যায়ের কোন কিছু নয় । ইহা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জিনিষ । দৃষ্টিশক্তির জন্য আলোর প্রয়োজন, কিন্তু সেই আলো দৃষ্টিগ্রাহ্য কোন বস্তু নয় । তেমনি অন্তরের জন্যও আলোর প্রয়োজন, যে আলোর মাধ্যমে সবকিছু অনুধাবন করা হয় । অস্তরের কোন বাহ্যিক চক্ষু নাই । তাই চক্ষুর দৃষ্টিশক্তির জন্য যে আলোর প্রয়োজন অস্তরদৃষ্টির জন্য সেই আলো প্রযোজ্য নয় । এই জন্যই বুদ্ধিকে অস্তরের নূর নামে অভিহীত করা হয় ৷ কুরআন এবং আল্লাহর রসূল(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) যেহেতু মানুষের বোধী এবং অনুভূতির জগতে পথপ্রদর্শন করিয়া থাকেন, সেইজ্য এতদুভয়কেও নুর বলা হইয়াছে । বাহ্যিক নুর বা জ্যোতির তবুও একটা রূপ আছে কিন্তু যে জ্যোতি অস্তর জগৎকে পথ দেখায়, তার কোন স্বরূপ নাই । কিন্তু সকলেই তা অনুধাবন করেন । বুদ্ধি মানুষ অনুভব করে, বুদ্ধির দ্বারা অনেক কিছু অনুধাবন করা হয়; কিন্তু বুদ্ধির কোন রূপ নাই বুদ্ধিকে কেহ কোনদিন দেখে না । তেমনি অন্তর চক্ষুর জ্যোতি আল্লাহর নুরকে দেখা যায় না, কিন্তু তা বাস্তব, অন্তর জগতের সাধক মাত্রই তা অনুভব করিয়া থাকেন । দুনিয়াতে যা কিছু আছে, তাকে অনুভব করার, বুঝবার একমাত্র মাধাম হইতেছে মানুষের অন্তর জগতের অনুভূতি, সেই অনুভূতির নুরই হাকিকী নুর । যার অন্তর জগত যত তীক্ষ্, সে সেই নূর তত বেশী মোশাহাদা বা অনুভব করিতে সক্ষম । কোরআন-হাদীছে এই দিক লক্ষ্য করিয়াই আল্লাহর রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) এবং কুরআনকে নূর শব্দের দ্বারা বুঝানো হইয়াছে । আমার লিখিত কিতাব 'মেশকাতুল আনওয়ার' এর মধ্যে উপরোক্ত দিকগুলির প্রতি লক্ষ্য করিয়াই আল্লাহ তালাকে 'নুরে হাকিকী' শব্দের দ্বারা ব্যাখ্যা করা হইয়াছে । এইখানে যদি শব্দের প্রতি কোন আপত্তি থাকে, তবে জানা উচিত যে, এই শব্দ কুরআন মজিদে উল্লেখিত হইয়াছে, — “আল্লাহ তা'লাই আসমান যমিনের নূর ।"
হাদীছ শরীফে আসিয়াছে , —মে'রাজের ঘটনাবলী সম্পর্কে ছাহাবায়ে কেরাম হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে প্রশ্ন করিতে যাইয়া জানিতে চাহিয়াছিলেন যে, আপনি কি সেই রজনীতে আল্লাহ তা'লাকে দেখিয়াছেন ? জবাব দিয়াছিলেন, —আমি ‘নুর’ দেখিয়াছি ? ‘নূর’ শব্দ এবং তার তাৎপর্য সম্পর্কে যদি এর পরও কেহ আপত্তি উত্থাপন করেন এবং উপরে বর্ণিত আমার ব্যাখ্যার কোন পরওয়া না করিয়াই নানা প্রকার সন্দেহ পোষণ করিতে শুরু করেন, তবে বুঝিতে হইবে, এই ধরনের আপত্তি নিতান্তই মুর্খতা । এমন মূর্খতা, — যার চিকিৎসা নাই ।
-------------------

Comments
Post a Comment