সিদ্দিকে আকবর (রঃ) 

প্রথম কথা 
ইসলামী বিশ্বের ইতিহাস প্রকৃতপক্ষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কা হতে মদীনায় হিযরত ও সেখানে বসবাস আরম্ভ করার পর থেকেই শুরু হয়েছে। এ বিখ্যাত ঘটনাকেই ইসলামী ইতিহাসের প্রারম্ভ ধরা হয়। কারণ, এ সময় থেকেই প্রকৃতপক্ষে ইসলামের সঠিক উন্নতি ও অগ্রগতি শুরু হয়েছে। আর এ সময় থেকেই মূলতঃ আল্লাহর সাহায্য-সহযোগিতা বিশেষভাবে শুরু হয়েছে। একাধারে তের বছর পর্যন্ত ইসলামের ঘোর বিরোধিতা করেও যখন উদ্দেশ্য সিদ্ধ হলো না, তখন মক্কার কাফেররা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যা করার সিদ্ধান্তে একমত হলো। কিন্তু এবারও তাদেরকে পরিপূর্ণ ব্যর্থতা বরণ করে নিতে হলো। এ ঘোর কঠিন সময়ে একমাত্র হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুই রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘনিষ্ট সহচর হিসেবে পরিগণিত হবার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। এ ঘটনার দশ বছর পর রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মৃত্যু শয্যায় শায়িত — নামাযের ইমামতি করতে মসজিদে তশরীফ আনতে পারছেন না ; তখন তাঁর পরিবর্তে তিনি যাঁকে ইমামতির জন্য নির্বাচিত করেছিলেন, তিনি হলেন হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু। এ সৌভাগ্য হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহ আনহুর ন্যায় মর্যাদাশালী সাহাবারও হয়নি।

হিজরাতের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু বকরকে কেন সাথী নির্বাচন করেছিলেন এবং মৃত্যু শয্যায় নামায পড়াবার জন্য কেন তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা বেশ সুস্পষ্ট। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু হচ্ছেন সেই প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি, যিনি সর্বপ্রথম রাসূলের রিসালাতের উপর ঈমান এনেছিলেন। সত্য দ্বীনের জন্য স্বীয় জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করে দেবার ব্যাপারে তিনি ছিলেন সকলের শীর্ষে। ইসলাম গ্রহণ করার দিন থেকে শুরু করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় বরাবর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহায্য, দীনের প্রচার এবং কাফেরদের নির্যাতন নিষ্পেষণের হাত থেকে মুসলমানদেরকে রক্ষা করার জন্য হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীকে তিনি দিতেন সবচেয়ে বেশী অগ্রাধিকার। তাঁর জন্য জীবন বিলিয়ে দিতেও তিনি কুণ্ঠিত হতেন না। প্রতিটি যুদ্ধে তিনি তাঁর পাশে থেকে কাফেরদের মুকাবিলা করতেন। অতীব বলিষ্ঠ ঈমান ছাড়াও তাঁর সুমধুর চরিত্রও ছিল অত্যন্ত উন্নত। এ উন্নত চরিত্রের জন্য তিনি সকলেরই প্রিয় ছিলেন। প্রতিটি মুসলমান অন্তর দিয়ে ভালবাসতেন তাঁকে।

হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর দীনি মর্যাদা এবং তাঁর প্রতি মানুষের সীমাহীন আস্থার কারণেই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর স্থলাভিষিক্তের প্রশ্নে মানুষের দৃষ্টি তাঁর দিকেই নিবদ্ধ হয়েছিল। আর সকলেই একমতে তাঁকেই প্রথম খলিফা হিসাবে মনোনীত করেন। তিনি তাঁর স্বল্পতম খিলাফত আমলে ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজে যে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, ইতিহাসে তা নজীরবিহীন। তাঁর খেলাফতকালেই ইসলামী শাসনের সূচনা হয়েছে। ধীরে ধীরে এ শাসন বিশ্বের অনেক অংশকে তার আওতার মধ্যে এনে দিয়েছে। এ বিশাল রাষ্ট্রের সীমা একদিকে এশিয়ার হিন্দুস্তান ও চীন পর্যন্ত ও অপরদিকে ইউরোপের স্পেন ও ফ্রান্স পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। মানব সভ্যতা ও কৃষ্টিকে উন্নতির দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য এ রাষ্ট্রীয় শাসনামল যে অবদান রেখেছে তা পৃথিবীর শেষদিন পর্যন্ত অমর অক্ষয় হয়ে বেঁচে থাকবে। আমার রচিত গ্রন্থ “হায়াতে মোহাম্মদী” ও “মানজালুল ওহী” রচনা হতে অবসর হবার পর ইসলামী শাসনামলের ইতিহাস, এর উন্নতি ও অবনতির কারণ সম্পর্কে কিছু গবেষণামূলক লেখার বাসনাও মনে জাগে। এ বাসনা আরো তীব্র হলো এ কারণে যে, এ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আপ্রাণ প্রচেষ্টার ফসল। মানবতার অস্তিত্ব ও তাদের পথপ্রদর্শনের জন্য রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নজীরবিহীন শিক্ষা পেশ করেছেন, আর তারই কারণে এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে। এ শিক্ষার ফলেই আমরা আজ বিভিন্ন জায়গায় ইসলামী রাষ্ট্রের বিবিধ সোপান দেখতে পাই।

প্রকৃতপক্ষে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত পরস্পর পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত। একটাকে আর একটা হতে পৃথক করা যায় না। কোনো জাতির ভবিষ্যত সম্পর্কে অনুমান করার জন্য তার অতীতের প্রতি গভীর দৃষ্টিপাত করা ছাড়া আর কোনো উত্তম পন্থা নেই । জাতির মধ্যে যেসব ক্ষতের সৃষ্টি হয়, তা দূর করার জন্যও অতীত দিনের প্রতি তাকিয়ে বর্তমানকাল দ্বারা তার প্রতিবিধান করার চেষ্টা চালাতে হয়। একজন রোগীর রোগ নির্ণয় ও তার চিকিৎসার জন্য যেমন রোগীর পূর্বাবস্থা সম্পর্কে অবগত হওয়া প্রয়োজন, তেমনি একটি জাতির বর্তমানের জন্যও এর পূর্বাবস্থা তথা অতীত জানা থাকা প্রয়োজন। মুসলমানদের আজ অবনতির যুগ। যে জাতি শতাব্দির পর শতাব্দি সুখ্যাতির সাথে বিশ্বের একটি বৃহৎ অংশে রাষ্ট্রীয় শাসন পরিচালনা করেছে, তাঁরা আজ লাঞ্ছনার গহীন গহ্বরে নিপতিত। আজ চৌদ্দশত বছর আগেকার কার্যক্রম ও ঘটনাবলীর প্রতি গভীর মনোনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন ও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। যেসব কারণ আমাদের অবনতির জন্য দায়ী, তা তালাশ করে বের করে দূর করতে হবে। আর যে পথে আমরা আমাদের হৃত সুনাম-সুখ্যাতি ফিরে পেতে পারি তা খুঁজে বের করতে হবে।

এসব চিন্তা-ভাবনায় আমি যখন হাবুডুবু খাচ্ছি, সে সময় আমার রচিত গ্রন্থ “হায়াতে মোহাম্মদী” পড়ে কিছু পাঠক-এ ধারায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খলীফা ও আল্লাহর মর্যাদাশালী বান্দাদের জীবন চরিত রচনার জন্য আমাকে বার বার বলতে থাকেন। আমিও আগ থেকেই তা ভেবেছিলাম। তাই বন্ধুদের অনুরোধ আমার উৎসাহকে আরো বাড়িয়ে দিলো। এ কাজ আমার একার দ্বারা সম্ভব নয়। বরং জ্ঞান সমৃদ্ধ লোকের প্রয়োজন জেনেও আমি অবশেষে এ কাজে হাত দিলাম।

হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে তো অনেক গবেষণামূলক কাজ হয়েছে। তাঁর জীবনের অনেক ঘটনাবলী বিভিন্ন সাহাবীগণ লিখেছেন। কিন্তু আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো জীবন চরিত বর্তমান ছিল না। এ কারণেই আমি তাঁর জীবন চরিত রচনার প্রতিই বেশী মনোযোগ দিলাম। হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়াত জীবনের প্রথম নিবেদিত বন্ধু ও পরিপূর্ণ অনুসারী। অপরিসীম দয়ালু ও অসংখ্য গুণের অধিকারী ছিলেন। ইসলামী বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া লাখো মুসলমান তাঁর সাথে সম্পৃক্ত হওয়াকে গর্বের কারণ বলে মনে করেন। হযরত আবু বকর সে ভাগ্যবান ব্যক্তি, যাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর সর্বসম্মতিক্রমে মুসলমানদের প্রথম খলিফা হিসাবে নির্বাচিত করা হয়েছিলো। ধর্মদ্রোহীদের হাতে যখন ইসলামের কঠিনতম অবস্থা বিরাজ করছিলো, সে সময় একমাত্র আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ব্যক্তিত্ত্বই মুসলমানদেরকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে। তৎকালীন বিশ্ব পরাশক্তি ইরান ও রোম সাম্রাজ্যের উপর সামরিক তৎপরতা চালিয়ে তিনি যে বিরাট ইসলামী রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার পত্তন করেছিলেন, তার প্রভাব আজও বিশ্ব জাতির মন থেকে মুছে যেতে পারেনি। তাই এ গ্রন্থে আমি যা কিছু বর্ণনা করবো, তা শুধু সিরাত ও জীবনীর সাথে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এসব হবে ইসলামী শাসনব্যবস্থার ইতিহাস। আর এ ইতিহাসের সূচনা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাল থেকেই শুরু হয়েছে।

এ পূত-পবিত্র ও স্বর্ণযুগের যেসব ঘটনাবলী বিভিন্ন গ্রন্থে আমরা দেখতে পাই তা খুবই বিস্ময়কর ও চিত্তাকর্ষক। এসব ঘটনাবলী থেকে হযরত সিদ্দীকে আকবরের বিরাট ব্যক্তিত্ব ও তাঁর বিভিন্ন উজ্জ্বল দিক আমাদের চোখের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। একদিকে দুঃখী ও নিঃস্ব মানুষের জন্য সত্যের পতাকাবাহী এ মানুষটিকে সবসময় উদ্গ্রীব থাকতে দেখা যায়। মনে হয়, এমন সংবেদনশীল ও পরোপকারী মানুষ দুনিয়ায় আর কেউ হবে না। অপরদিকে আল্লাহর বাণীকে উজ্জীবিত করে তোলার ও ইসলামের উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য যে কোন বিপদের ঝুঁকি মাথায় বহন করার জন্যও প্রস্তুত হয়ে যেতেন তিনি। দুনিয়ার কোনো শক্তিই তাঁকে তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ থেকে বিরত রাখতে পারতো না। দৃঢ়তা ও সংকল্পে অবিচল। এ বিরাট ব্যক্তিত্ব ছিলেন উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সাথেও অপরিচিত । মানুষের সুপ্ত গুণের বিকাশ ঘটিয়ে তাদের থেকে প্রত্যেকের যোগ্যতা অনুসারে কাজ আদায় করে নেবার মেধার মালিকও ছিলেন তিনি।

সিদ্দিকে আকবর রঃ (পর্ব- ৪)

——————-

প্রথম কথা (পর্ব- ৪)


রাসূলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর একজন খাটি প্রেমিকের ন্যায় জীবনযাপন করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কুরাইশবাসীর অত্যাচার ও নির্যাতনের নির্মম শিকারে পরিণত হয়েছিলেন, সে সময় আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদের মুকাবিলায় বুক টান করে এসে সামনে দাঁড়াতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতে যে  (প্রাপ্তবয়স্ক) ব্যক্তি সর্বপ্রথম “লাব্বাইকা” বলেছিলেন, তিনি এই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুই ছিলেন। হিজরতের ভয়াবহ ও কঠিন সময়ে গারে সাওর থেকে শুরু করে মদীনা পর্যন্ত দীর্ঘ পথের নিবেদিত সাথী ছিলেন এ আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুই। মদীনায় ইহুদী চক্রান্ত ও মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র এবং মক্কার কুরাইশদের অবিরত হীন কারসাজীতে যখন গোটা আরব উঠে পড়ে লেগেছিল সে ঘোর দুর্দিনে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাস পরামর্শদাতা হিসাবে দায়িত্ব পালন করার ঝুঁকি গ্রহণ করেছিলেন।


ইসলামের উন্নতি ও অগ্রগতি সাধনের জন্য আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসাবে চিরদিন যে সেবা করেছেন, তা শুধু স্বর্ণাক্ষরেই লেখা থাকবে না বরং প্রতিটি কাজই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য যথেষ্ট হবে। প্রকৃত কথা হলো, হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহ আনহুর উন্নত মর্যাদা ও চরিত্র লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কেননা, আল্লাহর কালেমাকে উড্ডীন করার জন্য যে ত্যাগ তিনি স্বীকার করেছেন, তাঁর সম্পর্ক প্রকৃতপক্ষে হৃদয়ের সাথে। আর এটা শুধু আল্লাহই অবহিত। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর মনে ইসলাম ও রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে অকৃত্রিম ভালবাসা উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল, তা বাহ্য দৃষ্টির তুলনায় অন্তর দৃষ্টিতে কত গভীর ছিল এবং তার আভ্যন্তরীণ ইখলাস, বাহ্যিক ইখলাস থেকে কত নিগূঢ় ও নিবিড় ছিল তা শুধু আল্লাহরই জানা।

———————

#সিদ্দিকে_আকবর

#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা



Comments

Popular posts from this blog

শুধু মুখে কলেমা পড়লে জান্নাত যাওয়া যাবেনা

মসনবী শরীফ বই - মউলানা রুমী (রহঃ)