কারবালা – ২




শামে কারবালা - (পর্ব- ২)
————————
মক্কা থেকে মদিনায় হিযরত

ওয়ালীদের কাছ থেকে ফিরে আসার পর ইমাম হোসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু) চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান। ইয়াযীদের আনুগত্য তাঁর কাছে মনে প্রাণে অপছন্দনীয় ছিল। কেননা সে খেলাফতের জন্য কোন ভাবেই উপযুক্ত ছিলনা। এছাড়া খলীফা হিসাবে তার নিযুক্তিও খোলাফায়ে রাশেদীনের নৈর্বাচনিক ইসলামী পদ্ধতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং শরিয়তের নীতিবর্জিতভাবে হয়েছিল। বরং তাঁর দৃষ্টিতে এটা রোম ও পারস্যের কায়সার ও কিসরার অনুসরণে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম একনায়কতান্ত্রিক প্রশাসন ছিল। এজন্যে তিনি স্পষ্টতঃই এর ঘোর বিরোধী ছিলেন। 

অন্যদিকে পরিস্থিতি এটাও সমর্থন করছিলনা যে, তিনি নিজে এর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। অন্যদিকে আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর বিভিন্ন কৌশলে ওয়ালীদের বার্তাবাহককে এড়িয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ওয়ালীদের কাছে আসেন নি। দ্বিতীয় দিন তিনি মদীনা মুনাওয়ারা থেকে মক্কা মুআজ্জামার দিকে রওয়ানা হয়ে যান। 

ওয়ালীদের কর্মচারীরা সারাদিন তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজে ফেরে; কিন্তু তাঁর সাক্ষাৎ লাভে ব্যর্থ হয়। এদিকে সন্ধ্যার দিকে ওয়ালীদ আবার ইমামের কাছে লোক পাঠালেন। তিনি বললেন, "এখনই তো আমি যেতে পারছিনা, সকাল হোক, দেখি কী করা যায়।” 

ওয়ালীদ তা মেনে নেন, আর ইমাম হোসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সে রাতেই পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজনসহ মদীনা মুনাওয়ারা থেকে মক্কা মুআজ্জমায় চলে যেতে মনস্থ করেন। পরিবারের সবাইকে বললেন, 'তোমরা (হিজরতের জন্য) তৈরী হয়ে যাও।” আর নিজে মসজিদে নববী শরীফে রাসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর রওযা পাকে এসে উপস্থিত হলেন। নফল নামায আদায় করতঃ নবীজির চেহারা মুবারাকের সামনে এসে যেই মাত্র বিনম্র বদনে সালাম পেশ করলেন, অজান্তেই চোখের পানি এসে গেল। রাসুলের (সল্লল্লাহু আলাইহে  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সান্নিধ্য থেকে দূরে যাওয়া এবং নবীজির শহর ছেড়ে যাওয়ার কথা মনে করেই তিনি ব্যথিত হয়ে পড়েন। 

এটাতো ঐ শহর, যাতে প্রিয় জিন্দেগীর এই পর্যন্ত এ শহরেরই আলোময় উন্মুক্ত পরিবেশ এবং সুরভিত হাওয়ায় তাঁর দিন রাতের পালাবদল ছিল। এটাতো প্রিয়তম নানাজানের শহর ছিল। তিনি ছিলেন নবীজির প্রিয় বাগিচার সুবাস ছড়ানো ফুল। কিন্তু এখন? এই প্রিয় শহরে তাঁর অবস্থান করাটাই যে সঙ্গীন! এই শহরেই তো তাঁর শ্রদ্ধেয় জননীর পবিত্র সমাধি! তার সহোদর তো এখানেই চির শায়িত। 

এমনি একটি মূহুর্তে ইমামে পাকের মনের অবস্থা কী হতে পারে? রওজায়ে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ তাঁর সমগ্র আবেগ আর অনুভূতি উজাড় করে দিচ্ছিলেন। নানাজানের সামনে দাঁড়িয়ে অবস্থার বিবরণী দিচ্ছেন
দিনান্তে নবীর সমাধি পাশে দাঁড়িয়ে ইমাম অনুমতি চেয়ে পেশ করে দেন 'বিদায়ী সালাম।'

কবির ভাষায় তা উপস্থাপন করা হল। [ কবির ভাষা এজন্য লিখলাম-তখন পরিস্থিতি ছন্দ মিলিয়ে বলার মত ছিলনা ]

“কান্নার মাঝে করেন 'সালাম' 
সৃষ্টির মহাজন, 
ভূবনের রাজ, নিবেদন করি সালাম, রাজন। 
একটু দেখুন, চেহারা পাকের খুলে অবগুণ্ঠন, 
আলীর তনয় হোসেনের আজ মদীনা বিজন।
গুম্বদ আর হুজরা ছেড়ে একটু দেখুন, 
নিজ ঘর হতে বিলাপের সুর নিজেই শুনুন। 
ইয়াযীদের তাপে ইসলাম আজ বিপন্ন হায়, 
দৌহিত্র তব অসহায় যেন শত্রুর ঘা'য়।
কুরবান হই, দয়া দখিনায় বাড়ালে আমায়, 
হাজার বিপদের ওগো বিতাড়নকারী, গ্রাসে শংকায়। 
ব্যথিত হৃদয়, অসহায় জনে মান তো বাঁচান, 
দৃষ্টিতে আজি রাখুন, হে মে'রাজেরই মেহমান। 
প্রাণের হে নাথ, বিদায়ের ক্ষণে অনুমতি চাই, 
পবিত্র মুখে বলুন 'বিদায়, হোসাইন, তবে যাই। 
মদীনায় ছেড়ে চলেছেন প্রিয় নবীর নয়ন, 
নিজদেশ হতে পরদেশে চলে দেশের স্বজন।

অতঃপর ইমাম নিজ পরিবার-পরিজন নিয়ে মদীনা মুনাওয়ারাহ্ থেকে মক্কা মুআজ্জামাতে হিজরত করলেন। (ইবনে আছীর ৬/৪, ত্বাবারী ১৯০/৬)
———————
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments

Popular posts from this blog

শুধু মুখে কলেমা পড়লে জান্নাত যাওয়া যাবেনা

মসনবী শরীফ বই - মউলানা রুমী (রহঃ)