কারবালা – ১৪
শামে কারবালা - (পর্ব- ১৪)
(কারবালার ইতিহাস)
আফসোস্! এই কুফাবাসীরা তো আহলে বাইতের সেই প্রেমিক, আলী (র.) এর সেই অনুরাগী, যারা অসংখ্য চিঠি ও প্রতিনিধি পাঠিয়ে এবং সীমাহীন ভক্তি প্রেমের প্রকাশ ঘটিয়ে তাঁকে এখানে ডেকে এনেছিলে, এরাতো সেই জনগোষ্টি, যারা বড় বড় শপথ করে বাইআত নিয়েছিল এই বলে যে, 'আমরা জান মাল সর্বস্ব উৎসর্গ করে দেব। কিন্তু আপনার সঙ্গ কখনো ছাড়ব না।' আর আজ কী অবস্থা! সাধারণ ধমক শুনে আর পার্থিব সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের লালসায় তাঁকে ত্যাগ করে গেল! ঘরে ঢুকে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল!
রসূল- খান্দানের এক প্রিয় প্রদীপ, ইমামে আলী মকাম হোসাইন (র.) এর প্রতিনিধি, অনুজ বিজনদেশে বান্ধবহীন পথিক হয়ে বড়ই পেরেশান ! কোথায় যাবেন? এই বিমর্ষতার সাথে আরো একটি উদ্বেগ যোগ হয়ে তাঁকে আরো বিচলিত করে তুলল। তিনি ভাবছেন- আমি তো ইমাম হোসাইন (র.) কে চিঠি লিখে দিয়েছি। এতে তাঁকে এখানে আসতে ও জোর সুপারিশ করেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ইমাম আমার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করবেন না। আর নিশ্চিত সপরিবারেই তিনি তশরীফ নিয়ে আসবেন। তখন? এই কুফাবাসীদের বিশ্বাসঘাতকতা তাঁকে কোন্ বিপদের সম্মুখীন করে দেবে?
কবির ভাষায়—
“কোথায় বাহক, আমার সালাম, পৌঁছাবে তাঁরে,
বার্তা আমার পৌঁছে দেবে তাঁর বরাবরে?
বিজন দেশে রই যে একা, নাইকো সহচর
সহায়হীনের খবর নিবে তাহার বরাবর।
এমন জ্বালায় জলছিল সেই মুসলিমের অন্তর
এমন সময় স্মরণ আসে শহীদি রাহবর।
ব্যথার ভারে বুক ভেঙ্গে যায়, নিজেরে ধমকায়
আফসোস্ তুই লিখলি চিঠি, ডাকলি কেন তায়।
সেই কুফারই অধিবাসীর ভক্তি,
মহব্বত অনেক অনেক, বলেই আমি দিয়েছি সেই ‘খত’।
হয়তো এখন পৌঁছে গেছে পত্র ও সালাম
শান্ত মনে সবাই সাথে এগুচ্ছেন ইমাম।
নাই ফিরাবেন তিনি আমার এমনি এ পয়গাম
হলেন বুঝি রওনা সবার সাথে সেই ইমাম।
হায়রে হেথায় আসবে তাঁহার পরে বালার ঢেউ
দুঃখ যাতনা আসবে কত জানবে না সে কেউ।”
সেই চিন্তায় নিজকে হারিয়ে হযরত মুসলিম যারপর নাই শঙ্কিত অবস্থার ছিলেন। ‘ত্বাওআ' নামী এক মহিলাকে নিজ ঘরের চৌকাঠে বসে থাকতে দেখলেন। মহিলা নিজ পুত্রের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি তার কাছে পানি চাইলেন। মহিলা পানি এনে দিলে তিনি পান করলেন, পানির পেয়ালা ভেতরে রেখে মহিলা আবার বাইরে আসলে দেখতে পেলেন, তিনি সেখানেই বসে আছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“হে আল্লাহর বান্দা, আপনি কি পানি পান করেন নি?”
উত্তরে বললেন, “হ্যাঁ, পান করেছি।”
তখন মহিলা বললেন, “তবে এখন আপন ঘরে যান !
ইমাম মুসলিমকে নিরুত্তর দেখে মহিলা তিনবার একই কথা বললেন। মহিলা এবার একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “রাতের বেলা আমার ঘরের সামনে আপনার এভাবে বসে থাকা উচিত নয়, আমি আবারও বলছি আপনি আপনার পথ দেখুন।"
এবার তিনি বললেন, “এই শহরে আমার ঘর বা ঠিকানা নেই। একজন মুসাফির আমি ! এই মুহুর্তে কঠিন বিপদে পড়েছি। এই দুরাবস্থায় আপনি কি আমার সাথে একটু সদাচরণ করতে পারেন? হয়তো কোন এক সময়ে আমি তার প্রতিদান দিতে পারব। নয়তো আল্লাহ্ ও রাসুল তাঁর বদলা আপনাকে দেবেন।”
মহিলা শুধালেন, “কীরূপ সদাচরণ?” তিনি বলতে লাগলেন, “আমি মুসলিম ইবনে আকীল। কুফাবাসীরা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারা সবাই প্রতারণা করে আমার সঙ্গ ত্যাগ করেছে। এখন আমার কী দশা আপনি নিজেই দেখছেন। আমার জন্য এমন কোন জায়গা নেই, যাতে আমি রাত কাটাতে পারি,
মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, “আপনিই মুসলিম ইবনে আকীল?” তিনি উত্তরে দিলেন, “হ্যাঁ।” খোদাভীরু ঐ নেক্কার মহিলা তাঁকে ভেতরে ডেকে আনলেন এবং ঘরের একটি কামরায় তাঁর জন্য বিছানা পেতে দিলেন। তিনি আসন গ্রহণ করলেন। মহিলা খাবার পরিবেশন করলে তিনি খাবার নিলেন না। আর ঐ মহিলাকে দোয়া করলেন।
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments
Post a Comment