কারবালা – ৮
কারবালার ইতিহাস (পর্ব- ৮)
——————
মুসলিম বিন্ আকিল কুফায় অতঃপর ইয়াযীদকে সংবাদ জ্ঞাপন—
হযরত মুসলিম তার ছোট্ট দু'জন ছাহেবজাদা মুহাম্মদ ও ইবরাহীমকে সাথে নিয়ে কুফায় পৌঁছলেন। কুফাবাসীরা পথ চেয়ে অপেক্ষমান ছিল। তারা তাঁর শুভাগমনে যারপর নাই ভক্তি প্রেমের প্রকাশ ঘটাল।
তিনি মুখতার বিন আবু উবাইদা, কারো মতে ইবনে আওসাজার ঘরে অবস্থান করেন। আহলে বাইতের ভক্ত প্রেমিকেরা ভক্তি ও আবেগের উচ্ছাস নিয়ে বাইআত গ্রহণ করতে লাগল এবং বাইআতকালে বড় বড় শপথবাণী উচ্চারণ করতে লাগল যে, 'আমরা জান-মাল উৎসর্গ করব, কখনও আপনার সঙ্গ ত্যাগ করব না।'
ইমাম মুসলিম যখন তাদের মধ্যে ভক্তি প্রেমের আবেগ-জযবা দেখলেন তখন ইমাম আলী মকাম হোসাইন (আঃ) এর নিকট চিঠি লিখলেন, তাতে অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করলেন। জানালেন যে, এ যাবৎ আঠার হাজার লোক বাইআত গ্রহণ করে ফেলেছে, আপনি অবশ্যই চলে আসুন, যাতে এই ইসলামী মিল্লাত ইয়াযীদের কালো হাত থেকে মুক্তি পায় এবং মানুষ যাতে প্রকৃত একজন ইমাম ও ন্যায়নিষ্ট যথার্থ খলিফার বাইআতের সৌভাগ্যে সৌভাগ্যবান হতে পারে এবং দ্বীনে হক' এর যেন সহায়তা হয়।
ভক্তেরা করে চলে খুশীর প্রকাশ,
মুসলিমে যা বলেন তাই সাব্বাশ।
মুসলিমে দেখে লোক জড়ো চার পাশ,
ইমামের চিঠি শোনে, মুখে উচ্ছাস।
প্রেমিকের ভিড় বাড়ে, নাই অবকাশ,
বাইআতে ঢল নামে ইমাম-সকাশ।
মুসলিম যবে দেখে কুফীদের আশ,
জান দিতে অজস্র বীরের আভাস।
ইমামে লিখেন তিনি এই সে প্রকাশ,
আসুন! বরণ ডালা কুফার নিবাস
ইয়াযীদকে সংবাদ জ্ঞাপন—
হযরত মুসলিমের আগমনের সংবাদে, কুফাবাসীর ভক্তির স্ফুরণ, প্রস্ফুটিত বাইআত, তাদের ভক্তি বিশ্বাসে শনৈঃ শণৈঃ উন্নতি দেখে ইয়াযীদের সহযোগী আব্দুল্লাহ ইবনে মুসলিম এবং উমারা ইবনে ওয়ালিদ ইয়াযীদকে জানিয়ে দেয় যে, ইমাম হোসাইন (র.)-র পক্ষে মুসলিম ইবনে আকীল কুফায় আগমন করেছেন আর প্রায় সহস্র জনতা ইতোমধ্যে তার হাতে বাইআত গ্রহণ করেছে। অথচ কুফার গভর্ণর নোমান ইবনে বশীর তার বিরুদ্ধে বিশেষ কোন পদক্ষেপ এখনও গ্রহণ করেন নি। আর না কোন দমন প্রক্রিয়া এখনও কার্যকর করেছেন। অতএব, যদি বাদশাহী টিকিয়ে রাখতে চান, তবে এখনই তার তাৎক্ষনিক প্রতিকারে মনোযোগী হওয়া উচিৎ। কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হোক । নচেৎ এভাবে সমগ্র ইরাক হাতছাড়া হয়ে যাবে।
ইয়াযীদ এই সংবাদ পাওয়া মাত্রই ক্রোধান্বিত হয়ে পড়ে। বিশিষ্ট বন্ধুদের নিয়ে পরামর্শে বসে। তারা বলল, “কাল বিলম্ব না করেই কোন কঠোর ব্যক্তিকে নিযুক্ত করা উচিৎ, যে কারো প্রতি ভ্রুক্ষেপ বা পরোয়া করেনা । আর তেমন ব্যক্তি হল ওবায়দুল্লাহ্ ইবনে যিয়াদ।
পরামর্শ অনুযায়ী ইয়াযীদ কুফার গভর্ণর নোমান ইবনে বশীরকে তখনই বরখাস্ত করে তদস্থলে ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে নিযুক্ত করে। ইতিপূর্বে সে বসরার গভর্নর হিসাবে দায়িত্বরত ছিল। ইয়াযীদ তাকে এ মর্মে নির্দেশ প্রদান করে যে, অবিলম্বে কুফায় গিয়ে মুসলিমকে গ্রেফতার কর এবং নজরবন্দী করে রেখ, যদি তাতে বাধ সাধে, তবে কতল করে দেবে। বাইআত গ্রহণকারীদের ভয়-ধমক দাও, যাতে ফিরে যায়, যদি তাতেও না হয় তবে তাদেরকেও খতম করে দাও।
ইতিমধ্যে যদি হোসাইন এসে পড়ে, তবে তার কাছ থেকে আমার পক্ষে বাইআত আদায় করো। বাইআতে সম্মত হলে তো উত্তম, নচেৎ তাকেও কতল করে ফেলবে।
ইবনে যিয়াদের কাছে ইয়াযিদের এ নির্দেশনামা বসরায় থাকতে পৌঁছে। দৈবক্রমে ইমাম আলী মাকাম ইমাম হোসাইনের (র.) পক্ষ থেকে একজন দূত বসরাবাসীদের প্রতি লেখা তাঁর একটি চিঠি সেদিনই নিয়ে আসে। কেননা বসরার অধিবাসীও তাঁর প্রতি অনুরক্ত ছিল। সে চিঠিতেও তিনি বসরাবাসীদের উদ্দেশ্যে লিখেন “আমি আমার পত্র বাহককে এ চিঠি দিয়ে তোমাদের কাছে পাঠালাম। আর আমি আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাতের প্রতি তোমাদের আহ্বান করছি। আর তা এ কারণে যে, সুন্নাতের তিরোধান হয়েছে, তদস্থলে হয়েছে বিদআতের উত্থান। তোমরা যদি আমার কথা শোন এবং মেনে চলো, তবে আমি তোমাদের সঠিক পথেই পরিচালিত করবো। সালামান্তে-
বসরার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ চিঠি পড়লেন এবং তা গোপন করে রাখলেন। কিন্তু মুনযির ইবনে আল্ জারোদ সন্দেহে পতিত হলেন এবং আশংকা করলেন যে, এ দূত না জানি ইবনে যিয়াদের গুপ্তচর কিনা। এমনও হতে পারে যে, ইবনে যিয়াদ পরীক্ষামূলক তাকে পাঠিয়ে দিয়েছে। তিনি দূতকে নিয়ে সরাসরি ইবনে যিয়াদের কাছে চলে আসলেন। ঐ চিঠি তাকে দেখায়ে তা জানতে চাইলেন। ইবনে যিয়াদ সেই মূহুর্তেই ইমামের দূতকে গ্রেফতার করে হত্যা করে ফেলে। অতঃপর বসরা জামে মসজিদে জনতার উদ্দেশ্যে কঠোর হুমকিমূলক বক্তব্য দেয়। যার সংক্ষেপ হল –
“আমীরুল মুমিনীন আমাকে বসরার সাথে কুফার শাসনক্ষমতাও দান করেছেন। এ জন্যই আমি কুফাতে যাচ্ছি। আমার অনুপস্থিতিতে আমার ভাই ওসমান ইবনে যিয়াদ আমার স্থলাভিষিক্ত হবে। তোমরা মতানৈক্য আর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকবে। অন্যথায় খোদার কসম, যার সম্পর্কেই আমি জানতে পারবো যে, সে মতবিরোধ ও বিদ্রোহে অংশ নিয়েছে তাকে এবং তার সকল সহযোগী ও সহচরদেরও আমি ছেড়ে দেবো না। পলাতকদের স্থলে যাকেই কাছে পাওয়া যাবে পাকড়াও করা হবে। আর সবাইকেই আমি যমের ঘাটে নামিয়ে দেবো। যতক্ষণ না তোমরা সঠিক পথে ফিরে আসো। আর বিরোধের নাম নিশানাও থাকবে না। মনে রেখো আমি যিয়াদের পুত্র। আর ঠিক আমি আমার বাপের মতোই।” (ইবনে আছীর ১/৪, ত্বাবরী ২০০/৬)
——————
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments
Post a Comment