কারবালা – ১৩
হানীর গ্রেফতারী (পর্ব- ২)
শামে কারবালা - (পর্ব- ১৩)
কারবালার ইতিহাস
এদিকে হযরত মুসলিম (র.) আব্দুল্লাহ্ ইবনে হাযেমকে রাজ প্রাসাদের দিকে পাঠালেন এ বলে যে, “যাও, দেখে আস হানীর কী দশা হল।” তিনি গিয়ে অবস্থা পর্যবেক্ষন করলেন এবং হযরত মুসলিমকে এসে বললেন, ইবনে যিয়াদ হানীকে প্রহারে প্রহারে জখম করে ছেড়েছে। এখন তিনি বন্দী অবস্থায় আছেন। হানীর গোত্রীয় মহিলারা সে সময় আর্তনাদ আহাজারী করতে থাকে।
হযরত মুসলিম আব্দুল্লাহ্ ইবনে হাযেমকে বললেন, 'জাতি আজ বিপন্ন'-বলে আহবান কর এবং নিজের সাহায্যকারীদের ঐক্যবদ্ধ কর।"
যেইমাত্র তিনি আহবান জানালেন, তখন এই মুহুর্তের জন্য অপেক্ষমান চারহাজার লোক, খারা আহলে বাইতের একান্ত প্রেমিক আশে পাশের জায়গাগুলোতে লুকিয়ে থেকেছিল তারা সকলেই তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে আসল।
মূহুর্তের মধ্যেই এ আওয়াজ সমগ্র কুফায় ছড়িয়ে পড়ল এবং যারা ইমাম মুসলিমের হাতে বাইআত গ্রহন করেছিল সকলেই জমায়েত হয়ে গেল।
আঠার হাজার লোক সাথে নিয়ে হযরত মুসলিম এগিয়ে গেলেন এবং রাজপ্রাসাদ ঘেরাও করলেন। আর লোকজনও অবরোধকারীদের সাথে যোগ দিতে লাগলে এ সংখ্যা চল্লিশ হাজারে উপনীত হল। এরা সবাই ইবনে যিয়াদ এবং তার বাবাকে নিন্দা জানাতে লাগল
ইবনে যিয়াদের নিকট সে সময় শুধুমাত্র পঞ্চাশজন উপস্থিত ছিল। ত্রিশজন পুলিশ এবং বিশজন শীর্ষস্থানীয় কুফাবাসী। এ ছাড়া প্রতিরক্ষার জন্য অন্যকোন শক্তি ছিলনা। সে ভীষণ শংকিত হয়ে পড়ল এবং রাজপ্রাসাদের মূল দরজা বন্ধ করিয়ে দিল।
সেই মূহুর্তে পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, যদি হযরত মুসলিম আক্রমনের নির্দেশ দিতেন, তখনই রাজ প্রাসাদ অধিকৃত হয়ে যেত এবং ইবনে যিয়াদ ও তার সাথীদের জান বাঁচানোর কোন উপায় থাকত না। আর এই বাহিনীই বাঁধভাঙ্গা স্রোতের মত এগিয়ে যেত এবং এক সময় ইয়াযিদের আধিপত্যকে কুটোর মত ভাসিয়ে নিয়ে যেত।
কিন্তু তিনি হামলা করার নির্দেশ দিলেন না।যদিও ইয়াযীদ এবং ইবনে যিয়াদের শত্রুতা দিবালোকের চেয়েও স্পষ্ট ছিল; তার পরেও কিন্তু সাবধানতা অবলম্বন করা শ্রেয় মনে করলেন। তিনি এ অপেক্ষায় ছিলেন যে, প্রথমতঃ কথাবার্তার মাধ্যমে শেষ চেষ্টা করা যাক, হয়তোবা সমঝোতার কোন পন্থা সৃষ্টি হতে পারে। এতে করে মুসলমানদের মধ্যে খুন রক্তপাত থেকে অব্যাহতি মিলবে। কিন্তু এই অবকাশ শত্রুদের পক্ষেই লাভজনক সাব্যস্থ হল।
ইবনে যিয়াদ সে সুযোগকে কাজে লাগাল। কুফার প্রভাবশালী যারা তার কাছে ছিল, তাদের পরামর্শ দিল এভাবে যে, “তোমরা প্রাসাদের চুড়ায় আরোহন করে নিজ নিজ গোত্রের লোকদের আমার এবং ইয়াযীদের পক্ষাবলম্বনে পুরস্কার ও সুযোগ-সুবিধার লোভ লালসা দেখাও। এছাড়া বিরুদ্ধাচরণ করলে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া ও কঠিন শাস্তির ভয় দেখাও। তাদের এটাও শুনিয়ে দাও যে, শাম (সিরিয়া) থেকে ইয়াযীদের সৈন্যরা ইতোমধ্যে রওয়ানা হয়ে গেছে, যারা অবশ্যই পৌঁছে যাবে। তখনকার পরিণতি একবার ভেবে দেখতে বলো। মোট কথা যে ভাবেই হোক মুসলিম থেকে তাদের পৃথক করে দাও।'
যথানির্দেশ কাসীর ইবনে শিহাব হারেসী, মুহম্মদ বিন আশআস, কা'কা বিন শুর যুহলী, শবছ বিন রবয়ী তমিমী, হাজর বিন জুবাইর ইজলী, শিমর বিন যিলজওশন দ্বারাবী প্রমূখ রাজপ্রাসাদের ছাদে চড়ে লোকদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল,
“উপস্থিত জনতা ! তোমরা নিজ নিজ ঘরে ফিরে যাও। অরাজকতা ও হানাহানি ছড়াবেনা। নিজেদেরকে ধংসের মুখে ঠেলে দিওনা। আমীরুল মুমিনীন ইয়াযীদের সৈন্যবাহিনী সিরিয়া (তদানীন্তন শাম) থেকে কুফা অভিমুখে রওয়ানা হয়ে গেছে। তোমরা কোনভাবেই তাদের মোকাবিলা করতে পারবে না। আমীর ইবনে যিয়াদ আল্লাহর নামে প্রতিজ্ঞা করেছেন, যদি তোমরা এখনই ফিরে না যাও, নেহায়াৎ লড়াই করতেই উদ্যত হয়ে থাক, তবে তিনি তোমাদের সাথে অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণ করবেন, তোমাদের কঠোরতম শাস্তি দিবেন। তোমাদের সন্তান-সন্ততিদের কতল করা হবে, ধন-সম্পদ কেড়ে নেয়া হবে। স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করা হবে। তোমরা নিজেদের পরিণতির কথা ভেবে দেখ, যদি তোমরা তার অনুগত হয়ে ফিরে যাও, তবে তিনি তোমাদের সম্মান-সম্ভ্রম ও পুরষ্কার, বখশিশ দিয়ে ধন্য করবেন। তোমরা নিজেদের ও আমাদের অবস্থার উপর দয়া কর। এখনই নিজ নিজ ঘরে ফিরে যাও।"
কুফার নেতৃস্থানীয় এই লোকদের ভীতি সঞ্চারক বক্তব্যে প্রভাবিত হয়ে লোকগুলো ক্রমে বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করল। নারী পুরুষ সবাই নিজদের ভাই-পুত্রদের ডেকে ডেকে বুঝাতে এবং দলছুট হওয়ার জন্য বাধ্য করতে শুরু করে দিল। মানুষ ফিরে যেতে শুরু করল। দশজন এদিকে, বিশজন ওদিকে, এভাবে লোকেরা তাঁর (ইমাম মুসলিম) সঙ্গ ছেড়ে দিতে লাগল।
ক্রমান্বয়ে মাগরিবের নামাযের সময় মাত্র ত্রিশজন লোক হযরত মুসলিমের সাথে থাকল। যখন তিনি সাহায্যে আসা লোকদের এ অকৃতজ্ঞসুলভ আচরণ ও বেঈমানী করতে দেখলেন, তখন অত্যন্ত হতাশ হয়ে পড়লেন। নামায আদায়ের পর ঐ ত্রিশজন লোককে সাথে নিয়ে তিনি কান্দাহ্ মহল্লার দিকে ফিরে চললেন। ওই মহল্লা পর্যন্ত পৌঁছতে পৌঁছতে ঐ ত্রিশজনও একে একে সটকে পড়ল।
সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়লেন তিনি। নিদারুণ অসহায় অবস্থা! যে শুভাকাংখীর দরজায় যান, তা বন্ধ দেখতে পান। সমগ্র শহর জুড়ে এমন একটি নিরাপদ জায়গা খুঁজে পেলেন না তিনি, যেখানে নিঃশঙ্ক চিত্তে রাতটা কাটাতে পারেন।
কবির ভাষায়—
“নাইকো সুহৃদ, নাই সহৃদয়, নাই কোন সহায়,
মনের ব্যথা বুঝাই কারে, দুঃখ রাখি কোথায়।
হায়রে বিধি, এই মুসলিম, সুপ্রিয় মেহমান,
বুক ভরা সব আশার ভাষায় করলে যে আহবান।
বাইআত এবং ওয়াদা দিয়ে ডাকলে যাঁরে হায় ,
একাই তিনি, আশ পাশে ওই বন্ধুরা কোথায়?
লাজ শরমের বালাই গেল, কুফারে তোর আজ,
কৃতজ্ঞতার আকাল হলো, বিশ্বাসে নেই কাজ।
ঝুলছে তালা এই কুফাতে সকল দরজায়,
সবগুলো ঘর বন্ধ হলো কীসের সে শঙ্কায় !
লুকিয়ে গেল যারাই তাঁকে জানায় আমন্ত্রণ,
ডেকে সবাই মুখ লুকালো কুফার জনগণ।
একটি রাতে এতই সে প্রেম, উধাও হল সব,
পরীক্ষাতে চুপ হল সেই ভালবাসার রব।”
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments
Post a Comment