কারবালা – ১২
শামে কারবালা - (পর্ব- ১২)
হানীর গ্রেফতারী (পর্ব – ১) —
হানী ইবনে উরওয়াহ্ কুফার একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। ইবনে যিয়াদের সাথে তাঁর পূর্বেকার কিছু সম্পর্কও ছিল। হযরত মুসলিম (র.) এর আগমনের আগে তিনি ইবনে যিয়াদের নিকট যেতেন এবং মেলামেশা রাখতেন। যখন থেকে হযরত মুসলিম (র.) তাঁর কাছে আসলেন, সেদিন থেকে তিনি অসুস্থতার অজুহাতে আসা যাওয়া এবং মেলামেশা ছেড়ে দিয়েছিলেন।
ওদিকে ইবনে যিয়াদ সার্বিক পরিস্থিতি ও অবস্থা সম্পর্কে অবগত হয়ে গিয়েছিল। একদিন তার নিকট মুহাম্মদ বিন আশআস (জুদার ভাই, যে ইমাম হাসান (র.)-কে বিষ প্রয়োগ করেছিল) এবং আসমা বিন খারেজা আসল। ইবনে যিয়াদ তাঁদের জিজ্ঞেস করল, “হানীর কী অবস্থা ?” তাঁরা বললেন, “অসুস্থ।” ইবনে যিয়াদ বললো, “আমি জেনেছি যে, সে দিব্যি সুস্থ, আর সারাদিন নিজবাড়ীর সামনে বসে থাকে। তোমরা যাও এবং তাকে বলো, আনুগত্য এবং সাক্ষাত-দুটোই জরুরী ; যেন পরিহার না করা হয়।”
তাঁরা গেলেন এবং গিয়ে বললেন, “ইবনে যিয়াদ খবর পেয়েছে যে, আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ এবং দিনমান দরজার সামনে বসে থাকেন। তার সাথে দেখা করতে যান না। তার কিছু বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই আপনি এখনই আমাদের সাথে চলুন ; ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে তার বাজে সন্দেহ দূরীভূত হোক।”
হানী ভেতরে গেলেন এবং হযরত মুসলিমকে পুরো ব্যাপার অবহিত করলেন। অতঃপর তৈরী হয়ে তাঁদের সাথে রওয়ানা হয়ে গেলেন। 'দারুল ইমারাত' (রাজ প্রাসাদ) এর অভ্যন্তরে পৌঁছে ইবনে যিয়াদকে সালাম দিলেন। কিন্তু ইবনে যিয়াদ সালামের উত্তর দিল না।
হানী এরূপ নিয়ম বহির্ভূত আচরণে বিস্মিত হলেন। মনে মনে খটকা ও আশংকা বোধ করলেন। কিছুক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলেন। নিরবতা ভেঙ্গে অবশেষে ইবনে যিয়াদ বলতে লাগল, “হানী, এটা কেমন কথা ? তুমি মুসলিম ইবনে আকীলকে তোমারই ঘরে লুকিয়ে রেখেছ ? আর প্রতিদিন তোমার ঘরে আমীরুল মুমিনীন 'ইয়াযীদ এর হুকুমতের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা করা হচ্ছে? অস্ত্রশস্ত্র কেনাও হচ্ছে, মানুষদের কাছ থেকে যুদ্ধের জন্য অঙ্গীকার নেয়া হচ্ছে?”
হানী বললেন, “কথাগুলো সম্পূর্ণ ভুল।” ইবনে যিয়াদ তখনই ঐ গুপ্তচর মুআক্কালকে তলব করল। মুআক্কাল উপস্থিত হলে জিজ্ঞেস করল, “একে চিনতে পারছ?” মুআক্কালকে দেখেই হানীর আক্কেল গুড়ুম! তখন তিনি বুঝতে পারলেন, এ পাপিষ্ট ভক্তি প্রেমের অন্তরালে শত্রুতা ও গোয়েন্দাগিরিই করে যাচ্ছিল।
এরূপ প্রত্যক্ষদর্শী স্বাক্ষীর উপস্থিতিতে আর কোন কথাই অস্বীকার করার উপায় ছিলনা। কাজেই তিনি সবকিছু স্বীকার করে সাফ সাফ বলে দিলেন, ‘আল্লাহর শপথ, আমি মুসলিমকে নিজ থেকে ডেকে আনিনি। তিনি আমাকে এটাও জানিয়ে রাখেননি যে, তিনি আমার কাছে আসছেন। অপ্রত্যাশিতভাবে যখন তিনি আমার দরজায় উপস্থিত হয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন, তখন চক্ষুলজ্জায় আমি রাসুল-খান্দানের একজন বুযুর্গ ব্যক্তিকে ঘর থেকে বের করে দিতে পারিনি।
এখন আমি তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, তুমি যা চাও জামিন রাখতে পার, আমি এখনই গিয়ে তাঁকে আমার ঘর থেকে বের করে দিচ্ছি, যাতে তিনি যেদিকে খুশী চলে যেতে পারেন। তারপরই আমি তোমার কাছে ফিরে আসছি। অন্তত এটুকু সময় আমাকে অবকাশ দাও।”
ইবনে যিয়াদ বলল, “খোদার কসম, তুমি এখান থেকে নড়তেই পারবেনা, যতক্ষণ না মুসলিমকে আমার কাছে হস্তান্তর করার অঙ্গীকার কর।”
হানী বলল “খোদার কসম, যে অতিথিকে আমি নিজেই আশ্রয় দিয়ে রেখেছি, তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে আমি কখখনো তোমার হাতে তুলে, দেবনা।'
ইবনে যিয়াদ বললো, “আমার হাতে তুলে দিতেই হবে।” হানী বললো, “খোদার শপথ, কখনোই নয়।” বাকবিতন্ডা যখন বেড়ে যেতে লাগল, তখন মুসলিম ইবনে আমর আল বাহেলী উঠে বল্ল, 'আমীরের কল্যাণ হোক, আমাকে হানীর সাথে কিছু বলার সুযোগ দেওয়া হোক, “ইবনে যিয়াদ অনুমতি দিলে বাহেলী হানীকে কিছু দূরে নিয়ে গিয়ে একপাশে দাঁড়াল, যাতে ইবনে যিয়াদ উভয়কে দেখতে পায়।
বাহেলী হানীকে অনেক বুঝায়ে বলল, “তুমি মুসলিমকে আমীরের হাতে তুলে দাও, অবাধ্য হয়ে নিজের এবং জাতির জন্য ধংস ডেকে এনো না। আমীর তাঁকে হত্যা ও করবেন না, তাঁকে কোন কষ্ট ও দেবেন না।” হানী বললেন, “তাতে তো আমার চরম অপমান আর মানহানি।” বাহেলী বলল, “ মানহানির কিছুই নেই।” হানী বললেন, “এখন আমার নিজের ও যথেষ্ট শক্তি, সাহস আছে এবং আমার সাহায্য সহযোগিতার জন্য অনেকেই তৈরী। আল্লাহর শপথ, যদি আমি একাও হতাম, আর আমার কোন সাহায্যকারীই না থাকতো তথাপি আমি নিজ আশ্রয়ে রাখা মেহমানকে দুশমনের হাতে তুলে দিতামনা।” বাহেলী তাঁকে বারবার পীড়াপীড়ি আর শপথ দিতেই ছিল, আর হানী বরাবরই তা প্রত্যাখ্যান করছিলেন।
ইবনে যিয়াদ তা দেখে অস্থির হয়ে পড়ল এবং বাহেলীকে বলতে লাগল, “তাকে আমার কাছে নিয়ে আস।” কথামত হানীকে তার কাছে নিয়ে আসা হল। সে ক্রোধান্বিত হয়ে হানীকে বলল, “মুসলিমকে আমার হাতে সঁপে দাও, নচেৎ আমি তোমার গর্দান নেব।”
হানী উত্তরে বললেন, “পরিণামে তোমার চার পাশে ও তো চকমকে তলোয়ার দেখতে পাবে।” একথা শুনে ইবনে যিয়াদ হানীর মুখে উপুর্যপরি দন্ডাঘাত করতে লাগল। ফলে তাঁর তার নাক মুখ ভেঙ্গে রক্ত গড়িয়ে কাপড় চোপড় পর্যন্ত রক্তাক্ত হয়ে গেল ।
হানী একজন সিপাহী থেকে তলোয়ার কেড়ে নিতে হাত বাড়াল, কিন্তু ঐ সিপাহী জোর প্রয়োগে তা ছাড়িয়ে নিল। ইবনে যিয়াদ বলল, “এখন তো তুমি নিজের রক্ত ও আমার জন্য বৈধ করে দিলে।” (অর্থাৎ এখন তুমি মৃত্যুদন্ডের উপযুক্ত হয়ে গিয়েছ) অতঃপর নির্দেশ দিল- “একে একটা কামরায় নিয়ে বন্দী করে রাখো আর পাহারা বসাও।”
ঘটনা দৃষ্টে আসমা ইবনে খারেজা উঠে দাঁড়াল এবং ইবনে যিয়াদের উদ্দেশ্য বল্ল, “দাগাবাজ, ছেড়ে দাও তাকে। তুমি আমাকে নির্দেশ দিয়েছ তাঁকে এনে দিতে। যখন আমি তাঁকে এনে হাজির করলাম, তুমি তাঁকে আঘাত করেছ এবং তাঁকে রক্তাক্ত করে ছেড়েছ। আবার তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করছ।”
ইবনে যিয়াদ বলল, তাকেও বন্দী কর এবং প্রহার কর। কথামত সিপাহীরা তাঁকেও অনেক মারধর করল এবং শেষমেষ বন্দী করে রাখল। মুহাম্মদ বিন আশআস বলল, “আমীর যাই করেন, আমরা তো তাতেই সন্তুষ্ট।”
শহরে গুজব রটে গেল যে, হানীকে হত্যা করা হয়েছে। এ গুজব ছড়িয়ে পড়লে হানীর গোত্রের সহস্র লোক 'প্রতিশোধ 'প্রতিশোধ'-এর শ্লোগান তুলে সমবেত হয়ে গেল, আর রাজপ্রাসাদ অবরোধ করে ফেলল।
ঐ গোত্রের সর্দার আমর ইবনে হাজ্জাজ উদাত্ত কণ্ঠে বলতে লাগল, “আমি হাজ্জাজের পুত্র আমর। আমার সাথে রয়েছে, মাযহাজ গোত্রের বীরযোদ্ধারা। আমরা কখনও আনুগত্যের বরখেলাফ করিনি এবং বিচ্ছিন্নতাও অবলম্বন করিনি। তারপরও আমাদের সর্দারকে কতল করা হয়েছে। আমরা এ হত্যাকান্ডের বদলা নেব।” সমবেত বীর জওয়ানরা আবারও 'প্রতিশোধ' ‘প্রতিশোধ' শ্লোগানের প্রতিধ্বনি তুলল।
ইবনে যিয়াদ এই বিরূপ পরিস্থিতি দেখে অত্যন্ত ভয় পেয়ে গেল। সে কাজী শুরাইহকে বলল, “আপনি হানীকে প্রথমে স্বচক্ষে দেখে নিন, তারপর হানীর স্বগোত্রীয়দের বলুন যে, সে জীবিতই আছে; তার কতল হওয়ার গুজব মিথ্যা।”
কাজী ছাহেব হানীকে দেখতে গেলেন। হানী নিজ গোত্রের লোকদের শোর হট্টগোল শুনতে ছিলেন। তিনি কাজী ছাহেবকে দেখে বললেন, “এ আওয়াজ আমার গোত্রের লোকদেরই। আপনি তাদেরকে আমার অবস্থা বর্ণনা করে শুধু এটুকু বলে দিন যে, যদি দশজন লোকও এ মূহুর্তে ভেতরে এসে যেতে পারে, তবে আমি মুক্ত হতে পারি। সে সময়ও তাঁর রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল।
কাজী ছাহেব বেরিয়ে আসলে ইবনে যিয়াদ তার বিশেষ এক গুপ্তচর হামিদ বিন বকর আমরীকে সাথে পাঠিয়ে দিয়ে বলল, আপনি লোকদের শুধু এটুকুই বলবেন যে, হানী জীবিত আছে।” কাজী ছাহেব বর্ণনা করেন, “খোদার কসম, যদি সেই গুপ্তচর আমার সাথে না থাকতো, তবে হানীর বার্তা আমি অবশ্যই তাঁর গোত্রের লোকদের নিকট পৌছে দিতাম।”
মোট কথা কাজী ছাহেব লোকদের সামনে এসে বললেন, 'হানী জীবিত আছে, তার নিহত হওয়ার যে সংবাদ তোমরা শুনেছ, সেটা ভুল। “কাজী ছাহেবের স্বাক্ষ্য শুনে লোকেরা বলল, 'যদি তাঁকে কতল না করা হয়, তবে আল্লাহর শোকর।"
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments
Post a Comment