কারবালা – ৭
শামে কারবালা - (পর্ব- ৭)
————————
মুসলিম ইবনে আকীলকে কুফা প্রেরণ—
ইমাম আলী মকাম যখন আহলে কুফার (কুফাবাসীর) চিঠি ও দূতপ্রেরণ থেকে তাদের দ্বীনি জযবা ও মুহাব্বত, জানমাল উৎসর্গ করার ইচ্ছা এবং কুফায় তাঁর আগমনকে স্বাগত জানাবার প্রবল বাসনা অনুভব করলেন, তখন সিদ্ধান্ত নিলেন যে, প্রথমতঃ তাঁর চাচাত ভাই হযরত মুসলিম ইবনে আকীলকে অবস্থা পর্যবেক্ষনের জন্য পাঠানো উচিৎ। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি তাঁকে (মুসলিম ইবনে আকীলকে) একটি চিঠি দিলেন, যা তিনি কুফাবাসীর বরাবরে লিখেছিলেন। আর বললেন “আপনি কুফায় গিয়ে সঠিক উপায়ে নিজেই সরেজমিনে অবস্থা ও পরিস্থিতির যথাযথ পর্যবেক্ষন করবেন এবং আমাকে অবহিত করবেন। পরিস্থিতি অনুকূলে হলে আমিও চলে আসব আর যদি পরিস্থিতি বিরূপ হয় তবে আপনি ফিরে আসবেন।”
সরুল আফাযেল হযরত মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ নঈমউদ্দীন ছাহেব মুরাদাবাদী (রাঃ) বর্ণনা করেন, “যদিও ইমাম (রঃ) এর শাহাদাতের ভবিষ্যৎবাণী সুপ্রসিদ্ধ ছিল এবং কুফাবাসীর বিশ্বাসঘাতকতার কথা ছিল পূর্ব অভিজ্ঞতালব্ধ; কিন্তু ইয়াযীদ যখন বাদশাহ্ হয়ে বসল এবং তার হুকুমত ও রাজত্ব দ্বীন-ধর্মের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দেখা দিল, এ কারণেই তার বাইআত নাজায়েয (অবৈধ) ছিল, আর সে (ইয়াযীদ) বিভিন্ন রকম কলাকৌশল ও নানান বাহানায় এটাই চাইতেছিল যে, লোকেরা তার আনুগত্য স্বীকার করুক, এরূপ পরিস্তিতিতে কুফাবাসীদের ইয়াযীদের বাইআত থেকে নিবৃত্ত করে ইমাম পাকের বাইআত গ্রহণ করানো দ্বীন ও মিল্লাতের অস্তিত্ব রক্ষার্থে ইমামের উপর ফরজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যাতে তাদের একান্ত ফরিয়াদ ও আবেদন প্রত্যাখ্যাত না হয়। যখন কোন সম্প্রদায় ‘জালিম' (অত্যাচারী) ও 'ফাসিক' (দূরাচার) এর বাইআত ( বশ্যতাগ্রহণ) করতে সম্মত না হয় এবং যোগ্যতাসম্পন্ন সঠিক পাত্রে বাইআত নিতে দরখাস্ত করে এ অবস্থায় যদি তিনি ঐ দাবী মঞ্জুর না করেন, তবে তার অর্থই দাঁড়ায় যে, তিনি ঐ সম্প্রদায়কে ঐ অত্যাচারীরই হাতে ন্যস্ত করতে চান। ইমাম (রাঃ) যদি ঐসময় কুফাবাসীর আমন্ত্রণ অগ্রাহ্য করতেন, তবে আল্লাহর দরবারে কুফাবাসীর ঐ দাবীর প্রসংগে ইমামের পক্ষ থেকে কী জবাব হত? অর্থাৎ “আমরাতো সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি; কিন্তু ইমাম বাইআত করানোর জন্য রাজী হননি এবং এ কারণেই ইয়াযীদের জুলুম নিপীড়নে নিরুপায় হয়ে আমাদেরকে তার হাতে বাইআত হতে হয়। যদি ইমাম হোসাইন (রঃ) হাত বাড়াতেন, তবে আমরা তাঁর জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিলাম।" ব্যাপারটি এমন নাজুক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছিল যে, তাদের ডাকে সাড়া না দিয়ে ইমামের গত্যন্তর ছিল না। যদিও শীর্ষস্থানীয় সাহাবীদের মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস, হযরত ইবনে ওমর, হযরত জাবের এবং হযরত আবু ওয়াকিদ লাইসী (রাদিঃ) প্রমূখ ইমামের এ সিদ্ধান্তের সাথে একমত ছিলেন না এবং কুফাবাসীর ওয়াদা অঙ্গীকার সম্পর্কে তাদের আস্থা ছিলনা। ইমামের মুহাব্বত, তাঁর শহীদ হওয়ার কথার প্রসিদ্ধি তাঁদের মনে আশংকার জন্ম দিচ্ছিল। কেননা এটা বিশ্বাস করারও কোন কারণ ছিল না যে, শাহাদাতের এটাই সময় এবং এ সফরেই ঐ মূহুর্ত সামনে এসে দাঁড়াবে। কিন্তু আশংকা বরাবর ছিল।
ইমাম হোসাইন (রাঃ) এর সামনে বিষয়টি এরূপ উপস্থিত হয়েছিল যে, তাদের ঐ দাবীকে অগ্রাহ্য করার মত শরয়ী ওজর কী হতে পারে? একদিকে এমন সম্মানিত ছাহাবায়ে কেরামের পীড়াড়ীড়িকে গুরুত্ব দেয়া, অপরদিকে কুফাবাসীর আবেদন ফেরানোর মত শরীয়ত সম্মত কোন অপারগতা খুঁজে না পাওয়া ইমামের জন্য জটিল বিষয় ছিল। এমন জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য একমাত্র উপায় যেটা তিনি পেলেন, সেটা হল হযরত মুসলিমকে প্রথমে পাঠানো, যদি কুফাবাসী অঙ্গীকার ভঙ্গ কিংবা বিশ্বাসঘাতকতা প্রকাশ করে, তবে তো শরয়ী ওজর পাওয়া গেল, যাতে সেখানে যাওয়া থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। তবে ছাহাবায়ে কেরামকে কোন না কোন সান্তনা দেওয়া যাবে।
(সাওয়ানেহে কারবালা পৃঃ ৫২)
“প্রতিনিধি স্বরূপ তাঁকে বেছে নিলেন আজ ইমাম,
পাঠিয়ে দিলেন কুফাবাসীর নামে লিখে চিঠি ও খাম।
তোমাদেরই দাবীর মুখে পাঠিয়ে তাঁকে এই দিলাম,
সাহায্য' আর 'রক্ষা' করে পূরণ করো মনোস্কাম।
চিঠি নিয়ে মুসলিম আজ ছাড়েন সে পাক মক্কাধাম,
কুফার পথে চলেন তিনি, মুখে নিয়ে খোদার নাম।”
“করেনা তাহারা আহলে বাইতে পাকের অনুসরণ,
ইশক্ ও প্রেমের দাবী করে তবু মানে না অনুগমন।”
———————
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments
Post a Comment