কারবালা – ১০
শামে কারবালা - (পর্ব- ১০)
****************
শুরাইক ইবনে আ’ওয়ার —
শুরাইক ইবনে আ'ওয়ার সালমী যিনি আহলে বাইতের অনুরক্তদের মধ্যে একজন অনুরাগী ছিলেন, আর বসরার সর্দারবৃন্দের অন্যতম ছিলেন, যিনি ইবনে যিয়াদের সাথেই বসরা থেকে এসেছিলেন। ঘটনাক্রমে তিনিও হানী ইবনে উরওয়ার মেহমান হয়েছিলেন। ইবনে যিয়াদ এবং অন্যান্য ওমারাদের কাছে তিনি অত্যন্ত সম্মানের পাত্র ছিলেন। এরই মধ্যে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ইবনে যিয়াদ সংবাদ দিলেন যে, 'আমি সন্ধ্যা নাগাদ আপনাকে দেখতে আসব।” শুরাইক হযরত মুসলিম (রাঃ)কে জিজ্ঞেস করলেন, ইবনে যিয়াদকে হত্যা করতে আমি যদি আপনাকে সুযোগ সৃষ্টি করে দেই, তবে আপনি তা করতে সম্মত ? তিনি বললেন “হ্যাঁ”। শুরাইক বললেন, “ঐ নরাধম আজ সন্ধ্যায় আমাকে দেখতে আসছে। আপনি উম্মুক্ত তলোয়ার হাতে নিয়ে লুকিয়ে অপেক্ষা করবেন। যখন আমি বলব “আমাকে পানি খাওয়াও” ঠিক সেই মূহুর্তেই অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে আপনি তাকে শেষ করে দেবেন। এরপর অনায়াসেই রাজপ্রাসাদ এবং কুফা করায়ত্ত হয়ে যাবে। আর অসুখ যদি সেরে উঠে, তবে বসরায় গিয়ে আপনার জন্য সেখানে সর্বাত্মক ব্যবস্থা আমিই করব।”
সন্ধ্যার দিকে ইবনে যিয়াদ নিজ দেহরক্ষী সাথে নিয়ে হানীর ঘরে আসলো। শুরাইক ইবনে আ’ওয়ারের রোগ শয্যার পাশে বসে কুশলাদি জানতে লাগলো। তার দেহরক্ষীও পাশে দাঁড়ানো ছিল। শুরাইক উচ্চৈস্বরে বলতে লাগলেন, “আমাকে পানি দাও, 'পানি খাওয়াও' তৃতীয়বারে বলল, "আফসোস তোমাদের জন্য, তোমরা আমাকে পানি থেকে দূরে রাখছ, 'পানি খাওয়াও' তাতে আমার জান যায়, যাক্।” এতদসত্ত্বেও হযরত মুসলিম বের হলেন না দেখে শুরাইক মর্মাহত হলেন এই ভেবে যে, কেমন সুবর্ণ সুযোগ হাত ছাড়া করেছেন ! দুঃখে আবৃত্তি করলে লাগলেন,
“বিলম্ব কী হে, সালমায় অভিবাদন জানাতে?
করাও সে পান, যায় যাবে জান তাতে।”
দেহরক্ষী কিছু আন্দাজ করে নেয় এবং ইশারায় ইবনে যিয়াদকে উঠে যেতে বলে। ইবনে যিয়াদ দাঁড়িয়ে যায়। শুরাইক বললেন, “আমীর, আমি আপনাকে কিছু ‘অসিয়ত' (অন্তিম উপদেশ) জানাতে চাই।” ইবনে যিয়াদ বলল, “আমি আবার আসব।” দেহরক্ষী তাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে বলল, “কসম খোদার, আপনাকে হত্যার চক্রান্ত করা হয়েছে।”
ইবনে যিয়াদ বলল, “এ কী করে হয়? আমিতো শুরাইককে খাতির করি, সম্মান দেই, তাছাড়া এটা হানী ইবনে উরওয়াহর ঘর, আমার বাবা অনেক উপকার তার করেছে।” দেহরক্ষী বলল, “তারপরও আমি যা বলছি, তা সম্পূর্ণ সত্যি আপনি (পরে) বুঝতে পারবেন।”
ইবনে যিয়াদ চলে যাওয়ার পর মুসলিম আড়াল থেকে বেরিয়ে আসলেন। শুরাইক বললেন, “আফসোস, তাকে হত্যা করতে আপনার কী বাধা ছিল? উত্তরে মুসলিম বললেন, “দু'টি কারণ, এক, যার আতিথ্যে আমি আছি, সেই গৃহস্বামী হানীর এটা পছন্দ নয় যে, তার ঘরে ইবনে যিয়াদ নিহত হয়। দুই- হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম-এর মহান বাণী অর্থাৎ কাউকে বোকা বানিয়ে হত্যা করা মুমিনের কাজ নয়।
ঐসব পবিত্র আত্মা লোকদের ন্যায়নিষ্ঠা ও ইনসাফ, শরীয়ত ও সুন্নাতের পূর্ণাঙ্গ- অনুসরণের বিষয়টি লক্ষণীয়। সুবহানাল্লাহ্ ! নিকৃষ্টতর শত্রুর সাথেও সুন্নাত পরিপন্থী আচরণ করা তাদের পক্ষে দুঃসাধ্য। নয়তো জানের শত্রুকে শেষ করে দেয়ার জন্য এটা মোক্ষম সুযোগ ছিল। তাছাড়া কোন বর্ণনায় এমনও এসেছে যে, তিনি বলেছেন, “আমি কাউকে বলতে শুনেছি (অর্থাৎ ঐ মুহুর্তে তাঁর কানে এসেছিল),
অর্থাৎ- হে মুসলিম, তুমি বের হয়ো না, যতক্ষণ না অদৃষ্টলিপি তার সীমায় পৌঁছে।
তিন দিন পর শোরাইক ওফাতপ্রাপ্ত হন। ইবনে যিয়াদ জানাযার নামায পড়ায়। পরবর্তীতে যখন সে জানতে পারল যে, শোরাইক তাকে হত্যা করার জন্য মুসলিমকে আহবান করেছিল যে, তখন সে বলল, “খোদার কসম, আমি আর কোন ইরাকীর নামাযে জানাযা পড়ব না। আল্লাহর শপথ! যদি আমার বাবা যিয়াদের কবর ওখানে না হতো, তবে অবশ্যই আমি শোরাইকের কবর খনন করে ফেলতাম।”
——————
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments
Post a Comment