কারবালা – ৬
শামে কারবালা - (পর্ব- ৬)
————————
কুফাবাসীর চিঠি ও প্রতিনিধি—
কুফা হযরত আলী (রাঃ) এর অনুরক্ত ও ভক্তদের প্রাণকেন্দ্র ছিল। কারণ তিনি নিজ খেলাফতকালে মদিনা মুনাওয়ারা থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত করে কুফায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কাজেই তার সকল ভক্ত প্রেমিক সেখানেই বসতি গেড়েছিলেন। মুয়াবিয়ার শাসনামলেও ইমাম আলী মাকাম হোসাইন (রাঃ) কে কুফায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছিল। এখন যেমাত্র কুফাবাসী মুয়াবিয়া (রাঃ) এর ইন্তে কাল এবং হোসাইন, আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর ও আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রাঃ) ব্যক্তিত্রয়ের ইয়াযীদের হাতে বাইআত গ্রহণের অস্বীকৃতির সংবাদ জানতে পারল, তখন কুফার সকল অনুরক্ত সুলাইমান ইবনে ছারদ আল খোযায়ীর ঘরে একত্রিত হয়ে যায়। মুহাম্মদ ইবনে বিশর হামদানী বর্ণনা করেন,
"সকল শিয়া সুলাইমান বিন ছারদ এর ঘরে সমবেত হয়ে গেল এবং আমীর মুয়াবিয়ার মৃত্যুর কথা আলোচনা করে সবাই আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জানাল। অতঃপর সুলাইমান সবার উদ্দেশ্যে বলল, “ মুয়াবিয়ার অবসান হয়েছে, আর ইমাম হোসাইন ইয়াযীদের বাইআত প্রত্যাখ্যান করে মক্কায় চলে গিয়েছেন। আর তোমরাতো তাঁরও তাঁর আব্বাজানের শিয়া (ভক্ত)। তোমরা ভালভাবে জেনে নাও, যদি তোমরা তাঁর দুশমনের বিরুদ্ধে জেহাদ করতে সক্ষম হও, তবে তাঁর কাছে লিখে দাও। যদি নিজেদের দূর্বলতা ও সাহসের অভাব বোধ কর, তবে তাঁকে ধোঁকা দিও না।" সবাই সমস্বরে বলল, “না আমরা তাঁকে ধোঁকা দিব না; আমরা তাঁর শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়ব এবং তাঁর জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করব।” সুলাইমান বললেন, “তবে লিখ! তখন তারা তাঁর উদ্দেশ্যে চিঠি লিখে।” (ত্বাবরী - ৬/১৯৭)
শিয়া মাযহাবের উল্লেখযোগ্য কিতাব “জালাউল উয়ূন” (কৃত মোল্লা বাকের মজলিসী ইস্পাহানী)-এ রয়েছে,
“কুফাবাসীদের কাছে যখন এ সংবাদ পৌঁছে, তখন কুফার সকল শিয়া সুলাইমান বিন ছারদ খোজায়ীর ঘরে সমবেত হল, 'হামদ ও সানা' ও (আল্লাহর প্রশংসা) আদায় করল। অতঃপর মুয়াবিয়ার তিরোধান ও ইয়াযীদের বাইআত প্রসংগে কথাবার্তা হয়। সুলাইমান বললেন, 'যখন মুয়াবিয়া মারা গেছে, (মাআযাল্লাহ) ইমাম হোসাইন ইয়াযীদের বাইআতকে প্রত্যাখ্যাত করে মক্কায় চলে গেছেন। আর তোমরা তাঁর এবং বুযুর্গ পিতার ভক্ত প্রেমিক, যদি মনে কর, তোমরা তাঁর সাহায্য করতে পারবে এবং জানমাল দিয়ে তাঁর সহযোগিতায় প্রচেষ্টা চালাতে পারবে, একটা চিঠি লিখে
তাঁকে এখানে আমন্ত্রণ জানাও। আর যদি তাঁর সাহায্যের ব্যাপারে অলসতা ও দূর্বলতা অনুভব কর, জেনে রাখ, শুভাকাংখীর দায়িত্ব ও আনুগত্য যদি সম্পাদন করতে না পার, তবে তাঁকে ধ্বংসের মাঝে ঠেলে দিওনা।” শিয়ারা বলল,“যখন তিনি নূরানী পদার্পনে এ শহরকে ধন্য করবেন, আমরা সবাই “পরিশুদ্ধ চিত্তে তাঁর খেদমতে উপস্থিত হয়ে বাইআত গ্রহণ করব, এবং তাঁর “সাহায্যে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে শত্রুর আক্রমণ থেকে তাঁকে হেফাজত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাব।” জালাউল উয়ূন (অনূদিত) ২: ১৩৮ (শিয় জেনারেল বুক এজেন্সি, শিয়া মহল্লা, লাহোর কর্তৃক প্রকাশিত।)
প্রমাণিত হল- ইমামকে কুফায় আহবানকারী সকলে শিয়াই ছিল। বস্তুত চিঠিপত্র ও প্রস্তাবকের লাইন পড়ে গেল। এমনকি মোল্লা বাকের মজলিসীর বর্ণনা মতে শিয়াদের পক্ষ থেকে বার হাজার চিঠি ইমামের কাছে পৌঁছে। বিষয় বস্তুর সারাংশ হচ্ছে, “আপনি অবিলম্বেই কুফায় তাশরীফ আনুন, (আগমন করুন) খেলাফতের মসনদ আপনার জন্যই খালি রয়ে গেছে। শিয়া মুমিনদের ধন-দৌলত এবং তাদের গর্দানসমূহ আপনার জন্য প্রস্তুত। এখানকার সকলেই আপনার অপেক্ষায় এবং আপনার দর্শন লাভে আগ্রহী। আপনি ছাড়া আমাদের আর কোন ইমাম ও পথনির্দেশক নাই । আপনার সাহায্যের জন্য এখানে সৈন্য সামন্ত তৈরী এবং উপস্থিত। নো'মান ইবনে বশীর কুফার গভর্ণর রাজপ্রাসাদে অবস্থান করছেন। আমরা জুমা কিংবা ঈদের জামাতেও যাই না, যখন আপনি শুভাগমন করবেন, তখন আমরা তাদেরকে কুফা থেকে বের করে দেব।” জালাউল উয়ূন, ১৩৯/২ শেষ চিঠি আসার পর ইমাম আলী মাকাম তাদের প্রতি উত্তর লিখেন :
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম-
এচিঠি হোসাইন ইবনে আলীর কুফাবাসী ভক্ত মুমিনদের প্রতি লিখিত।
অনেক দূত এবং চিঠিপত্র আসার পর যে চিঠি আপনারা হানী ও সায়ীদ এর হাতে প্রেরণ করেছেন, তা আমি পেয়েছি। আপনাদের সবগুলো চিঠিই আমার কাছে এসে পৌঁছেছে। সব চিঠিরই বিষয়বস্তু সম্পর্কে আমি জানলাম। আপনারা প্রায় সব চিঠিতে আমাকে লিখেছেন আমাদের কোন ইমাম নেই, আপনি অতি সত্তর আমাদের মাঝে তাশরীফ আনুন। আপনার বদৌলতে আল্লাহ্ আমাদের সঠিক পথ দেখাবেন। এখানে স্মর্তব্য যে, আমি কার্যত আপনাদের কাছে আমারই চাচাতো ভাই নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিত্ব জনাব মুসলিম ইবনে আকীলকে পাঠাচ্ছি। মুসলিম যদি আমাকে জানান যে আপনারা যা কিছু লিখেছেন, তা সর্বজন শ্রদ্ধেয়, চিন্তাশীল, জ্ঞানী-গুনি এবং এলাকার গন্যমান্য বুযুর্গর্জনের পরামর্শক্রমেই লিখেছেন, তখন খুব শীঘ্রই আমি আপনাদের কাছে চলে আসব ইনশাআল্লাহ্। আমি মূল্যবান এ জীবনের শপথ করেই বলছি, সত্যিকার ইমামের বৈশিষ্ট্য হল, তিনি মানুষকে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী নির্দেশনা দেন, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন, পবিত্র শরীয়তের বাইরে একটি কদমও দেন না, আর মানুষকে সঠিক দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখেন। “সালাম” (জালাউল উয়ূন- ১৪০/২)
————————
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments
Post a Comment