কারবালা– ৯



শামে কারবালা - (পর্ব- ৯)
****************
ইবনে যিয়াদের কুফায় আগমন —
ইবনে যিয়াদ আপন পরিবার-পরিজন ছাড়াও পাঁচশ জন লোক নিজের সাথে নিয়ে বসরা ত্যাগ করে। তাদের মধ্য থেকে কতেক পথেই থেমে যায়। কিন্তু সে তাদের কোন পরোয়াই করল না। যথারীতি যাত্রা অব্যাহত রাখল । কাদেসিয়া পৌঁছে সে তার সৈন্য-সামন্ত সেখানেই রেখে দিল। অতঃপর প্রতারণার উদ্দেশ্যে হেজাযী (আরবী) পোষাক পরে উটে আরোহণ করল। বিশজন লোক সাথে নিয়ে হেজায থেকে যে পথ কুফায় গিয়েছে সে পথে মাগরিব ও এশা'র মধ্যবর্তী সময়ে রাতের অন্ধকারে কুফায় এসে পৌঁছল । 

তার এ ছদ্মবেশ ধারণের উদ্দেশ্য ছিল যে, তখন কুফাবাসীর মধ্যে তীব্র উত্তেজনা, ইয়াযীদের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন। কাজেই এমনভাবে সেথায় প্রবেশ করতে হবে যাতে লোকেরা চিনতে না পারে। বরং তারা যেন মনে করে ইমাম হোসাইন (র.)-ই শুভাগমন করেছেন। আর সে নিরাপদে, নির্বিঘ্নে কুফার অভ্যন্তরে পৌঁছে যাবে। এছাড়া জনতার আবেগ-উচ্ছাসেরও কিছু আন্দাজ করা যাবে। সাথে সাথে এটাও জেনে নেওয়া যাবে, কারা কারা অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

কুফাবাসী যারা অধীর প্রতীক্ষায় ইমামে পাকের পথ চেয়ে ছিলেন, তারা রাতের আঁধারে হেজাযের পথে হেজাযী পোষাকে তাকে আসতে দেখে বাস্তবিকই ধোঁকায় পড়ে যান। তারা ধরেই নিল যে, ইমামে পাকই তাশরীফ এনেছেন। সোল্লাসে তারা অভ্যর্থনার শ্লোগানে চারপাশ মুখরিত করে তুলল। সম্বর্ধনা ও অভিবাদনে অভিষিক্ত করল। ভক্তি গদগদ কণ্ঠে উচ্চারিত হল 
“মারহাবান বিকা ইয়া ইবনা রাসুলিল্লাহ্” 
“কাদিমতা খাইরা মাকদাম” 
(স্বাগতঃ হে রাসুলতনয়! আপনার পদার্পনে শুভেচ্ছা আমাদের!!) 
আগে পিছে উৎসাহী অভ্যর্থনাকারীতে পরিবেষ্টিত। শোরগোল শুনে আরো লোক বেরিয়ে আসে ঘর ছেড়ে। রীতিমত তা এক বিশেষ উত্তম জুলুসের রূপ নেয়। যেন একটি শোভাযাত্রার কাফেলা। 

দূরাচার ইবনে যিয়াদ প্রজ্জলিতচিত্তে বিষিত মনে চুপচাপ চলতে লাগল । সে ভালই বুঝতে পারল যে, এরা ইমামের জন্য অস্থির, উতলা হয়ে অপেক্ষা করছে। আর আন্দাজ করতে পারল যে, এদের অন্তর উনার প্রতি কতটাই অনুরক্ত। 

যখন সে 'দারুল ইমারাত' অর্থাৎ 'গভর্ণর হাউস'-এর নিকটে আসল, তখন হযরত নোমান ইবনে বশীর শোরগাল শুনে এবং প্রচন্ড ভিড় দেখে ভাবলেন স্বয়ং ইমাম শুভাগমন করেছেন। নোমান ইবনে বশীর দরজা বন্ধ করে দিলেন আর দালানের ছাদে গিয়ে চেঁচিয়ে বললেন “হে ইবনে রাসুলুল্লাহ্, আপনি ফিরে যান, খোদার কসম, আমি নিজ আমানত আপনার হাতেও অর্পন করবো না এবং আপনার সাথে লড়তেও চাইনা।” 

এটা শুনে ইবনে যিয়াদ আরো নিকটবর্তী হল এবং চাপাস্বরে বলল, “আরে দরজা খোল, নচেৎ ভাল হবে না।” 

তার পেছনেই একজন লোক দাঁড়িয়েছিল। সে গলার স্বরেই তাকে চিনে ফেলল। তড়িঘড়ি কিছুটা পেছনে সরে জনতার উদ্দেশ্যে বলল, খোদার কসম, এতো ইবনে মারজানা ! (অর্থাৎ আগন্তক হোসাইন নন; ইবনে যিয়াদ)। নোমান ইবনে বশীর দরজা খুলে দিলেন। ইবনে যিয়াদ রাজ প্রাসাদের অভ্যন্তরে ঢুকেই দরজা আটকে দিল। তখন নিরুপায় জনতা দুঃখ ও হতাশা নিয়ে চারিদিকে চলে গেল। 

রাত অতিবাহিত করে ইবনে যিয়াদ সকালেই আবার লোক জড়ো করল। আর তাদের সামনে বক্তব্য রাখল
“আমীরুল মুমিনীন (নাউযুবিল্লাহ্) ইয়াযীদ আমাকে কুফার গভর্নর নিযুক্ত করেছেন। আমাকে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, যেন অত্যাচারিতের সাথে ইনসাফ করি, অনুগতদের প্রতি সদাচরণ করি, আর অবাধ্যদের কঠোর হস্তে দমন করি। আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তাঁর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো। অর্থাৎ যে আনুগত্য ও হুকুম তামিল করবে তার প্রতি মমত্ব দেখানো হবে, আর যে ব্যক্তি নির্দেশ অমান্য করবে, তার জন্য আমার চাবুক আর তলোয়ার উদ্যত। তোমাদের উচিৎ, নিজের ভালোটা দেখা আর নিজের (জীবনের) প্রতি মায়া করা।”

ভাষণদানের পর সে কুফার নামজাদা লোকদের গ্রেফতার করে ফেলে। আর তাদের সবাইকে বলল যে, 'এই মর্মে মুচলেকা দিয়ে যাও যে, তোমাদের নিজ নিজ গোত্রের লোকেরা কোন বিদ্রোহীকে নিজেদের কাছে আশ্রয় দেবে না, না কোন বিরোধী তৎপরতায় অংশ নেবে। যদি কেউ কোন বিদ্রোহীকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে রাখে, তবে তাকে ধরিয়ে দিতে হবে। তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ শর্তাবলী লিখিত দিয়ে যাবে, এবং তা মেনে চলবে, তারা মুক্তি পাবে, আর যারা তা করবে না, তাদের জানমাল দুটোই আমাদের জন্য হালাল। (অর্থাৎ উভয়টাই আমার ইচ্ছাধীন) তাকে হত্যা করে তারই দরজায় লাশ ঝুলিয়ে রাখা হবে। আর তার সম্পর্কিত কাউকেই আমি রেহাই দিব না।”

ইবনে যিয়াদের আগমনে, তার ভয়-ভীতি ও হুমকী প্রদর্শনে কুফাবাসী ভড়কে যায় এবং শংকিত হয়ে পড়ে। এছাড়া তাদের এতদিনের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন আসতে শুরু করে। অবস্থা দৃষ্টে হযরত মুসলিম মুখতার ইবনে উবাইদার ঘরে অবস্থান করাটা সমীচিন মনে করলেন না। রাতের বেলা সেখান থেকে বেরিয়ে কুফার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে আহলে বাইতের একজন ভক্তপ্রেমিক হানী ইবনে উরওয়াহ মুযহিজীর কাছে আসলেন। হানী কিন্তু এ মূহুর্তে তাঁর আগমনে অত্যন্ত নাখোশ হলো। বলল, 'যদি আপনি এখানে না আসতেন সেটাই ভাল হতো।' হযরত মুসলিম বললেন, “পরদেশে এক মুসাফির আমি, আমাকে একটু আশ্রয় দিন।” হানী বললো, 'যদি আমার ঘরে আপনি ঢুকেই না পড়তেন, তবে আমি এটাই বলতাম যে, আপনি চলে যান।” কিন্তু এখন সেটা আমার আত্মমর্যাদারও পরিপন্থী হবে যে আপনাকে ঘর থেকে বের করে দেই।” হানী তার অন্দর মহলের অভ্যন্তরে সুরক্ষিত এক কক্ষে তাঁকে লুকিয়ে রাখলেন।
****************
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments

Popular posts from this blog

শুধু মুখে কলেমা পড়লে জান্নাত যাওয়া যাবেনা

মসনবী শরীফ বই - মউলানা রুমী (রহঃ)