কারবালা - ১৬ (হানীর গ্রেফতারী (পর্ব- ৫)
শামে কারবালা - (পর্ব- ১৬)
****************
কারবালার ইতিহাস
হানীর গ্রেফতারী (পর্ব- ৫)
মুহাম্মদ ইবনে আশআস যখন তাঁর বীরত্ব এবং নিজ সাথীদের ভীরুতা আর দুর্বলতার আন্দাজ করল তখন সে আবারও প্রতারণার জাল বিস্তার করল।
আগ বাড়িয়ে সে বলতে লাগল, “আপনি একাকী কতক্ষণ লড়বেন? অহেতুক নিজকে ধংসের মুখে ঠেলবেন না । আপনার জন্য নিরাপত্তা নিয়েই আমরা এসেছি। আমরা আপনার সাথে যুদ্ধ করতে আসিনি। আমাদের মধ্যে পরস্পর তরবারী চালনা হোক– সেটা আমাদের কারো কাম নয়। তবে উদ্দেশ্য শুধু এতটুকু যে, আপনি ইবনে যিয়াদের কাছে চলুন, পরস্পর আলোচনার মাধ্যমে সবকিছুর মিটমাট হয়ে যাক।”
কিন্তু তিনি নিম্নবর্ণিত শেয়ের আবৃত্তি করতে করতে বরাবর সামনে অগ্রসর হতে লাগলেন,
“মুক্ত, স্বাধীন যোদ্ধা ছাড়া কাটবোনা- মোর এই শপথ,
মৃত্যু আসে অনেক জ্বালায়' যদিই বা রয় সেই নিয়ত।
সব লোকেরই সামনে আসে দুঃখ, জ্বালা একটি দিন,
ঠান্ডা, মিঠে, উষ্ণ, তেঁতো চাখতে হবে সেই সে দিন ।
সূর্যের আলোর সত্যটাও দেয় ফিরিয়ে লোক যখন
মিথ্যা এবং ধোঁকার ভয়ে থাকবো না তো-নই সে জন ।”
ইবনে আশআস নিশ্চয়তা দিয়ে বলল, “কেউ আপনার সাথে মিথ্যা ও বলবে না কিংবা ধোঁকা ও প্রতারণার আশ্রয় নেবে না। আপনার সাথে কেউ না মারামারি করবে, না কেউ আপনাকে হত্যা করবে। এরা সবাই আপনার ভ্রাতৃ-স্বজন। হযরত মুসলিম লড়াই করতে করতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে পড়েছিলেন। শক্তিও প্রায় নিঃশেষিত, এজন্যে ঐ ঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
তিনি বললেন, “যুদ্ধ আমারও অভিপ্রায় নয়। আমার সাথে যখন চল্লিশহাজার যোদ্ধা ছিল, গভর্নর হাউস অবরুদ্ধ করে ফেলেছিলাম, তখনও আমি যুদ্ধে জড়াইনি। অপেক্ষায় ছিলাম আলাপ আলোচনার মাধ্যমে কোন সমঝোতায় উপনীত হলে রক্তপাত হবে না।”
ইবনে আশআস আরো কাছে এসে বলল, “আপনাকেতো নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে।” তিনি বললেন, 'আমার জন্য নিরাপত্তা ?' ইবনে আশআস এর সাথে সমস্বরে সবাই বলল, “হ্যাঁ, আপনার জন্য নিরাপত্তা আছে।” কিন্তু, আমর বিন ওবায়দুল্লাহ সলমী একথায় একমত হতে পারলনা।
যাহোক এভাবে তাঁকে এক খচ্চরের পিঠে চড়ানো হল এবং তাঁর কাছ থেকে তরবারী কেড়ে নেয়া হল। তরবারী কেড়ে নেয়াতে তিনি নিজ নিরাপত্তার ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়লেন। চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। বললেন, “এটা প্রথম ধোঁকা।”
ইবনে আশআছ আবারও আশ্বাস এবং নিশ্চয়তা জানাল “আপনি নিরাপদ, আপনার কোনই ক্ষতি হবে না।” তিনি বললেন,“এখন আর কিসের নিরাপত্তা? এখন শুধু আশার কুহক। তোমরা আমার তরবারি ছিনিয়ে নিয়েছ, এখন আমি হাত-পা বিহীন অসহায়।” এ বলে তিনি অশ্রু বিসর্জন করতে লাগলেন এবং পড়তে লাগলেন “ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজেউন।”
তাঁকে কাঁদতে দেখে আমর বিন ওবায়দুল্লাহ্ শ্লেষের সঙ্গে বলল, “কাঁদছেন কেন? হুকুমত ও খেলাফতের দাবীদার হয়ে যে ব্যক্তি বিপক্ষের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তিনি বললেন, বিপদে ভীত হয়ে কান্না করাতো তার উচিৎ নয়।”
উত্তরে (মুসলিম বললেন) আমি নিজের জন্য কাঁদছিনা, বরং আমার পরিবার পরিজন, হুসাইন (র.) এবং তাঁর পরিবারের জন্য কাঁদছি । যিনি তোমাদের আমন্ত্রণেই ছুটে আসছেন এখানে, এ ভাবনাতেই আমার কান্না আসছে। ভাবছি, তাঁর উপর কী ভয়ানক বিপদ আসছে !”
কবির ভাষায়—
“বলেন মুসলিম,
“রোদন নয় তো, আমার কান্না সে তার জন্য,
হুসাইন ইবনে আলী আসছেন, লিপির আহ্বান পেয়েই হন্য।
আমার যাত্রা ধরায় অন্তিম, কাবায় ছাড়ছেন সে তাঁর যাত্রা,
আমার কান্না সে এই ভাবনা অনড় ভাগ্য, কি এক মাত্রা !
প্রলয়-সদৃশ সে দৃশ্যই আজ কাঁদায় এমনি বারংবার যে,
আমার জন্যই প্রমাদ গুনবে পবিত্র এক পরিবার সে।”
তিনি মুহাম্মদ বিন আশআাসকে বললেন,' আমি দেখতে পাচ্ছি যে, অনতি বিলম্বেই তোমরা নিজের দেয়া নিরাপত্তার কথা রক্ষা করতে অপারগ হয়ে যাবে। অন্তত আমার সাথে এটুকু সদ্ব্যবহার কর যে কোন উপায়ে ইমামে আলী মকাম ইমাম হুসাইন (র.) এর নিকট আমার এ অবস্থার বিবরণ দিয়ে একটি বার্তা প্রেরণ করে দাও যে, কুফাবাসী ভক্তরা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, প্রতারণা করেছে।
এরাতো সেই কুফাবাসী, যাদের ষড়যন্ত্রের জাল থেকে মুক্তিলাভের জন্য আপনার বুযুর্গ পিতা মৃত্যু অথবা হত্যা কামনা করতেন। এরা মিথ্যুক, তাদের কাছে কখনোই আসবেন না; বরং নিজ পরিবার-পরিজনসহ সহসা ফিরে যান।'
ইবনে আশআস বলল, “খোদার কসম, আমি অবশ্যই এটা করব।” অবশ্য সে তার ওয়াদা পূরণ করেছিল। (যা পরবর্তী বর্ণনায় আসবে)
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments
Post a Comment