কারবালা – ৩
শামে কারবালা - (পর্ব- ৩)
মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়ার পরামর্শ—
হযরত মুহাম্মদ বিন হানাফিয়া তাঁকে (ইমাম পাককে) বললেন, “ভাই, আমি আপনার চেয়ে কাউকে বেশী প্রিয় এবং সমাদৃত মনে করি না। আর খোদার সমগ্র সৃষ্টিতে কাউকে তার যোগ্যও ভাবি না যে, তার সাথে আপনার চেয়েও বেশী সদাচারণ করব।
এজন্য আমার পরামর্শ হচ্ছে, যতদূর পারা যায়, ইয়াযীদের বাইআত এবং বিশেষ কোন শহরে অবস্থান করার ইচ্ছা থেকে আপনি মুক্ত থাকুন। নিভৃত কোন পল্লী বা নির্জন মরুতে আপনি অবস্থান করুন এবং মানুষের কাছ আপনার দূত পাঠিয়ে আপনার প্রতি বাইআতের দাওয়াত দিন।
যদি তারা বাইআত করে, তো আপনি আল্লাহর শোকর করবেন। আর যদি তারা অন্য কোন ব্যক্তির প্রতি বাইআতের প্রশ্নে ঐকমত্যে পৌঁছে যায়, তাহলে তাতে আপনার গুণাগুণ, বুযুর্গী বা মর্যাদার মধ্যে আল্লাহ্ তা'য়ালা কোন ঘাটতি বা তারতম্য আনবেন না।
আমার ভয় হচ্ছে যে, এই অবস্থায় যদি আপনি কোন নির্দিষ্ট শহরে বা বিশেষ কোন জনগোষ্টির কাছে যান, তবে, তাদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়ে যাবে। একদল আপনার পক্ষ হবে, অন্যদল তার বিপরীত। ফলে উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়বে। আর সবার আগে আপনিই তাদের অস্ত্রের নিশানায় পরিণত হবেন।
উদ্ভুত এই পরিস্থিতিতে একজন সম্মানিত, সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত এবং বংশ আভিজাত্যে যিনি সমগ্র উম্মতের চেয়েও উত্তম, তাঁর পবিত্র রক্তই সবচেয়ে সস্তা হয়ে যাবে। তাঁরই পরিবার পরিজনকে লাঞ্চিত করা হবে।”
এতদশ্রবণে ইমাম পাক বললেন, “তবে ভাই আমি কোথায় যেতে পারি?” মুহাম্মদ বিন হানাফিয়া বললেন, “আপাতত; মক্কা। যদি সেখানে আপনার মনস্থির হয়, তবে কোন না কোন উপায় বেরিয়ে আসবে। যদি মন প্রশান্ত না হয়, তবে ভিন্ন কোন মরুস্থান বা পাহাড়ী এলাকায় চলে যাবেন। একস্থান থেকে অন্যস্থান পরিবর্তন করতে থাকবেন এবং মানুষের অবস্থার পরিবর্তন লক্ষ্য করতে থাকবেন। পরিণামে আপনি অবশ্যই কোন সিদ্ধান্ত পেয়ে যাবেন। কেননা ঘটনা যখন পর্যবেক্ষণ করা যায়, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক বেশী নির্ভূল হয়।”
ইমাম (র.) বললেন, “ভাই, আপনি পরম হিতকামনা ও সহমর্মিতাই জানালেন। আমার মনে হয়, আপনার মতামতই ইনশাল্লাহ্ সঠিক ও যথাযথ বলে সাব্যস্থ হবে।”
এই বলে তিনি ইয়াযীদ বিন মুফার্রাগের নিম্মোক্ত কবিতা প্রবাদমূলক আবৃত্তি করতে করতে মসজিদে প্রবেশ করলেন,
যেদিন যুলুম নিপীড়নে আমার টুটি চেপে দেয়া হবে,মৃত্যু এসে রইবে প্রতীক্ষায়,
(সেদিন) যদি আমি দেই রনাঙ্গণে ভঙ্গ।
তবে ছুটাব না উট প্রভাত প্রভায়,
না কেউ ইয়াযিদ' বলে ডাকবে আমায়।
(ইবনে আছীর :- ৬/৪, ত্বাবরী : ১৯০/৬)
একটি সংশয়—
'খেলাফতে মুয়াবিয়া ওয়া ইয়াযীদ' গ্রন্থের প্রণেতা লিখেছে, “মুহাম্মদ বিন হানাফিয়া ইমাম হোসাইন (র.) এর নিষ্ক্রমনকে হুকুমত ও খেলাফত অন্বেষার এমন একটি রাজনৈতিক ইস্যু মনে করতেন, যা যুগপ্রেক্ষাপটে এবং শরয়ী আহ্কামের ভিত্তিতে বৈধ বা সমীচিন ছিল না।”-
(খেলাফতে মুয়াবিয়া ওয়া ইয়াযীদ পৃঃ -৭৯)
এ সম্পর্কে বক্তব্য হল, যদি মুহাম্মদ বিন হানাফিয়ার দৃষ্টিতে ইমামের পদক্ষেপ সময়ের চাহিদা ও শরয়ী আহকামের আলোকে নাজায়েয এবং অনুচিৎ হতো, তবে আবার তিনি ইমামকে এটা কেন বললেন যে, “ইয়াযীদ থেকে দূরে থাকুন এবং নিজের জন্য বাইআতের দাওয়াত দিন”?
বরং সেক্ষেত্রে তিনি তো স্পষ্টতঃ বলতে পারতেন যে, আপনার এই পদক্ষেপ শরীয়ত মতে কোন অবস্থাতেই জায়েয নয়; আর একজন সত্যাশ্রয়ী ও ন্যায়নিষ্ঠ খলিফা থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে আপনার এ সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র দ্রোহিতার শামিল।” তাঁকে নিষ্ক্রমনে বাঁধা না দেয়া এবং করণীয় সম্পর্কে অবহিত করা, যেমন- পল্লীতে ও পাহাড়ী এলাকায় অবস্থান নিন, মানুষের কাছে প্রতিনিধি পাঠান, তাদের প্রতি আপনার পক্ষে বাইআতের আহবান জানান ইত্যাদি একথারই সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, তাঁর দৃষ্টিতে ইমাম পাকের এই পদক্ষেপ শরীয়ত মতে নাজায়েয ছিল না; বরং ইমাম (র.) যে পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া অবলম্বন করেছিলেন তাঁর কাছে সে প্রক্রিয়াটাই শুধু যুক্তিসিদ্ধতার বিপরীত এবং নিষ্ফল মনে হয়েছিল। বাকী তাঁর নিজের বাইআত সংক্রান্ত ব্যাপারটি ছিল অন্যান্য সাহাবীদের মত ফিত্না ফ্যাসাদ এড়ানোর লক্ষ্যে। নচেৎ খলিফার কার্যক্রমের সৌন্দয্য কিংবা তাকে সঠিক বিবেচনার ভিত্তিতে নয়।
প্রমাণিত হল যে, মুহাম্মদ বিন হানাফিয়াও অপরাপর কতিপয় সাহাবীর মত ইয়াযীদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হওয়াকে নিজের কাছে অবৈধ বা খারাপ মনে করতেন না; বরং বাহ্যিক নানা কারণ ও পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে [জুলুম নির্যাতন থেকে বাঁচতে] তা প্রতিক্রিয়াহীন ও দূরদর্শিতাহীন বলে ভেবেছিলেন।
সুতরাং 'খেলাফতে মুয়াবিয়া ওয়া ইয়াযীদ' এর লেখকের মন্তব্য “ইমামের পদক্ষেপকে মুহাম্মদ বিন হানাফিয়া শরীয়ত মতে নাজায়েয মনে করতেন”- এটা সম্পূর্ণ ভুল এবং ইতিহাসের প্রতি সবৈব মিথ্যাচার।
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, হযরত মুহাম্মদ বিন হানাফিয়ার পরামর্শ দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার ভিত্তিতেই ছিল। জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার অধিকারী মাত্রই এরূপ যুক্তিসিদ্ধতা ও পরিণামদর্শিতার ভিত্তিতে কাজ করে থাকেন এবং অপরকেও এতে উৎসাহিত করেন। এছাড়া সময় বিশেষে কৌশল অবলম্বন করা খারাপ কিছু নয়।
———————
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments
Post a Comment