কারবালা – ১৫ (হানীর গ্রেফতারী (পর্ব- ৪)
হানীর গ্রেফতারী (পর্ব- ৪)
📚শামে কারবালা
(কারবালার ইতিহাস - ১৫)
ওদিকে ইবনে যিয়াদ যখন জানতে পারল যে, সকল কুফাবাসী ইমাম মুসলিমের সঙ্গ ছেড়ে দিয়েছে, এখন আর কেউ তাঁর সঙ্গে নেই, তখন সে ঘোষণা দিল, “মুসলিমকে যে-ই আশ্রয় দেবে, তার নিস্তার নেই। আর যে তাঁকে গ্রেফতার করে আনবে অথবা গ্রেফতার করিয়ে দেবে তাকে পুরষ্কার দেয়া হবে।”
এই ঘোষণার পর পুলিশ প্রধান (আই,জি) হুসাইন বিন নুমাইরকে নির্দেশ দিল, শহরের বহিঃ যোগাযোগ বন্ধ করে অলি গলিতে লোক নিয়োগ করে দাও, আর ঘরে ঘরে তল্লাশি চালাও, খবরদার ! এই ব্যক্তি (মুসলিম) যেন কোন রাস্তা দিয়ে কোন উপায়েই বেরিয়ে যেতে না পারে। যদি এ লোক কোনভাবে বেরিয়ে যায় আর তুমি তাকে গ্রেফতার করে না আনতে পার, তবে মনে রেখ, তোমারও ভাল হবে না।”
আর এদিকে ত্বাওআ' তার যে সন্তানের জন্য অপেক্ষা করছিল সে ফিরে আসল। সে তাঁর মাকে বিশেষ একটি কামরায় বারবার আসা যাওয়া করতে লক্ষ্য করলে তাঁর কারণ জানতে চাইল। মহিলা প্রথমদিকে ব্যাপারটি চুপিয়েছিল, যখন ছেলেটি খুব বেশী পীড়াপীড়ি করতে লাগল, তখন গোপন রাখার অঙ্গীকার নিয়ে ব্যাপারটি তাকে খুলে জানাল।
ছেলেটি ছিল নেশাসক্ত ও বখাটে ধরণের। ইবনে যিয়াদের ঐ ঘোষণা জেনে এই নরাধম ছেলেটি মনে মনে খুব খুশীই হচ্ছিল। পুরষ্কারের লোভ তার মনে এমনভাবে মাথাচাড়া দিল যে রাত পোহানোই মুশকিল হল।
প্রভাত হতেই সে ঘর থেকে বের হয়ে পড়ল, আর গিয়ে সোজা আব্দুর রহমান ইবনে মুহাম্মদ বিন আশআসের নিকট উপস্থিত হল। ইবনে আশআস ইবনে যিয়াদের নিকট গভর্নর হাউসের রাজপ্রসাদে থাকত। আব্দুর রহমান গিয়ে তার পিতাকে একদিকে ডেকে নিয়ে সবকিছু সবিস্তারে বলল। ইবনে আশআস তা ইবনে যিয়াদকে জানাল। এভাবেই ইবনে যিয়াদ মুসলিম ইবনে আকীলের সন্ধান পেয়ে যায়।
ইবনে যিয়াদ তখনই মুহাম্মদ ইবনে আশআসকে জরুরী নির্দেশ দিয়ে বলল, “এখনই যাও, মুসলিমকে গ্রেফতার করে আমার কাছে উপস্থিত কর।” আর বনু কায়েস গোত্রের সত্তর কিংবা আশিজন লোক দিয়ে আমর বিন ওবায়দুল্লাহ বিন আব্বাস সলমীকে ও তার সাথে পাঠিয়ে দিল।
তারা সবাই ঐ মহিলার বাড়ীতে উপস্থিত হয়ে তা ঘেরাও করে ফেলল। মুসলিম বিন আকীলকে গ্রেফতার করার উদ্দেশ্যে কিছু লোক তরবারি নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। তিনি তাদের প্রতিহত করে বের করে দিলেন। তারা পুনরায় ঢুকে আরো ভয়ঙ্কর হামলা চালায়। তিনিও অসীম বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে তাদের দমন করে আবারও ঘর থেকে বের করে দিলেন। এভাবে তিনি তাদের সাথে শক্ত মোকাবিলা করে যাচ্ছিলেন। পরিণামে বহুলোক হতাহত হল।
এই ফাঁকে বকীর ইবনে হামরান আহমরী নামে এক পাষন্ড তাঁর চেহারা লক্ষ্য করে এমনভাবে হামলা করে বসল যে তাতে তাঁর উপরে নীচে উভয় ওষ্টদ্বয় কাটা পড়ে এবং সামনের দুটি দাঁত ও ভেঙ্গে যায়।
হযরত মুসলিম তাঁর মাথায় আঘাত করলে তা ফেটে যায়। দ্বিতীয় একটি আঘাত তার কাধে এমনভাবে আঘাত করলেন যে তলোয়ার তার বুক পর্যন্ত এসে যায়।
যখন লোকগুলো তাঁর বীরত্ব ও বাহাদুরীর প্রমাণ পেল তখন তাঁর রক্তপাগল তরবারী এবং হায়দরী আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য সবাই বাইরে পালিয়ে গেল। আর কিছু লোক ঘরের ছাদে উঠে উপর থেকে তাঁর উপর ইট-পাটকেল, পাথর এবং কাঠে আগুন লাগিয়ে তা ছুঁড়ে মারতে লাগল ।
যখন তিনি তাদের এ কাপুরুষোচিত নিয়মে লড়তে দেখলেন, তখন তলোয়ার নিয়ে ঘরের বাইরে গলিতে চলে আসলেন, আর বাইরে গিয়ে তাদের সাথে বীরদর্পে লড়তে লাগলেন ।
কবির ভাষায়—
“বীর পুরুষের জেহাদ- জোশে অবাক হেরে রণাঙ্গন,
তেজ দেখি-তাই বীর হাশেমীর খোদার হাতে সমর্পন।
বাড়ায় যখন খপ্পরে হাত ইবনে আলীর ভাই সে বীর,
দস্যু দলে টিকবে কত সামনে এলে এই অসি'র ।
সব কাপুরুষ যুদ্ধ ছেড়ে প্রাণ বাঁচাতে তাই পালায়,
হামরানের ওই পুত্র বিকির পেছন হতে কোপ চালায়
হঠাৎ কোপে বীরতনয়ের চেহারা হল খুন-রঙিন ।
চোয়াল কাটে দু'দাঁত ভাঙ্গে, পৃথিবীটা হয় অচিন
অসির তেগে টুকরো হয়ে হাওয়ার ওড়ে শত্রুগণ
সত্যপ্রিয়-স্পৃহা কী, সেদিন হেরে এ দুশমন ।”
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments
Post a Comment