কারবালা - ১



শামে কারবালা - (পর্ব- ১)
————————
শাহাদাতের কারণ ও প্রেক্ষাপট 

যখন কোন ঘটনা অবশ্যম্ভাবী হয়, তখন তার সংঘটিত হওয়ার কার্যকারনও সৃষ্টি হয়ে যায়। ইমামে আ'লী মাকাম এর শাহাদতের কারণসমূহ প্রেক্ষাপটও এভাবে তৈরী হয়ে যায়। 

হিজরী ৬০ সনের রজব মাসে হযরত আমীর মুয়াবিয়া ইন্তেকাল হয়। ইয়াযীদের জন্য পূর্ব থেকেই তিনি বাইআত নিয়ে রাখেন। ফলে তাঁর মৃত্যু উত্তর ইয়াজীদ তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়।

 ক্ষমতায় আরোহনের পর ইয়াযীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল হযরত ইমাম হোসাইন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর এবং আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এর বাইয়াত অর্আথাত নুগত্য গ্রহণ করা। 

কেননা তাঁরা ইয়াযীদের 'যুবরাজ' হওয়াকে প্রথম থেকেই স্বীকার করেননি। এ ছাড়াও তাঁদের ব্যাপারে ইয়াযীদের আশংকা ছিল যে, তাঁদের কেউ আবার না 'খেলাফতের দাবী করে বসে। কিংবা এমনও হতে পারে যে, সমগ্র হেজায তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠে। 

অধিকন্তু ইমাম হোসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কে খলিফা বানানোর দাবীতে ইরাকে বিদ্রোহের দাবানল ছড়িয়ে পড়ার জোরালো সম্ভাবনা ছিল।

এসব আশংকার কারণে ইয়াযীদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নিজ ক্ষমতার মসনদ পাকাপোক্ত ও নিষ্কন্টক করে নেয়া একারণে সে উক্ত ব্যক্তিবর্গের আনুগত্য আদায় করা জরুরী বলে মনে করে। 

সুতরাং সে মদীনার গভর্ণর ওয়ালীদ ইবনে উকবাকে প্রথমে আমীর মুয়াবিয়ার মৃত্যুর সংবাদ জানায় এবং সাথে সাথে বর্ণিত বুযুর্গত্রয় থেকে বায়াত তথা অনুগত‍্যের সফত গ্রহণের জন্য অত্যন্ত কঠোর নির্দেশ প্রেরণ করে।

 সে নির্দেশনামায় ইয়াযীদের ভাষা ছিল,- হোসাইন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর ও ইবনে যোবাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) কে এমনভাবে পাকড়াও কর যেন বাইয়াত না হওয়া পর্যন্ত মুক্তি না পায় । (ইবনে আছীর-৪/৪)

এখনও পর্যন্ত মদীনাবাসীদের কাছে আমীর মুয়াবিয়ার মৃত্যুর  খবরও পৌঁছেনি। 

ইয়াযীদের এ হুকুম পেয়ে ওয়ালীদ অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন। কেননা এ নির্দেশ কার্যকর করা তার জন্য ছিল দুরূহ ব্যপার এবং এর পরিণাম সম্পর্কেও তিনি ভালই আন্দাজ করতে পারতেন। তিনি তাঁর নায়েব মারওয়ান বিন হাকামকে ডেকে ও এ ব্যাপারে পরামর্শ চাইলেন। 

মারওয়ান ছিল নির্দয় ও উগ্রস্বভাবের। সে জানাল, “আমার পরামর্শ হচ্ছে ঐ তিনজনকে এখনই ডাকুন এবং বাইয়াতের হুকুম দিন তাঁরা যদি বাইয়াতে স্বীকৃত হন তো ভালই, যদি অস্বীকার করেন তবে তিনজনকেই শিরচ্ছেদ করে দিন। যদি আপনি তা না করেন, তবে যখনই তাঁরা মুয়াবিয়ার মৃত্যুর খবর পাবেন তিন জনই এক এক অঞ্চলে গিয়ে খেলাফতের দাবীদার হয়ে দাঁড়াবেন। 

তখন তাঁদের দমিয়ে রাখতে হিশশিম খেতে হবে। তবে ইবনে উমরকে আমি জানি; উনার পক্ষ থেকে এ আশংকা কম। যেচে খেলাফত না দিলে উনি হাঙ্গামা করতে চাইবেন না।”

এ পরামর্শের পর ওয়ালীদ তিন ব্যক্তিবর্গকে ডেকে পাঠালেন। ঐ সময় হোসাইন এবং আবদুল্লাহ ইবনে যোবাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) উভয়ে মসজিদে নববী শরীফে ছিলেন। তখন সময়টাও এমন ছিল যে, তাঁদের কারো সাথে ওয়ালীদের এ সময় যোগাযোগ বা মেলামেশা হতো না। দূত এসে তাঁদের কাছে আমীরের বার্তা পৌছাল। সংবাদবাহককে তাঁরা বললেন, “ঠিক আছে, তুমি যাও, আমরা আসছি।" এর পর ইবনে যোবাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ইমামকে বললেন, “আপনার কী মনে হয়? আমীর যে সময় কারো সাথে দেখা করেন না, কাউকে সাক্ষাৎ দেন না, এমন একটি মূহুর্তে তিনি আমাদের কেন ডাকলেন?” ইমাম বললেন, “আমার মনে হয়, আমীর মুয়াবিয়া আর নেই। আর আমাদের এ উদ্দেশ্যেই ডাকছেন যে, তাঁর ইন্তেকালের সংবাদ সর্বমহলে প্রচারিত হওয়ার আগেই তিনি আমাদের কাছ থেকে ইয়াযীদের পক্ষে বাইয়াত নিয়ে নেবেন” তিনি জানালেন আমারও তাই মনে হচ্ছে। এখন আপনার অভিপ্রায় কী? তিনি জানালেন, “আমি জনা কয়েক যুবককে সাথে নিয়ে যাচ্ছি, কেননা আমার অস্বীকৃতির পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভবত নাজুক পরিস্থিতির অবতারণা হতে পারে।”

যাই হোক, প্রয়োজনীয় আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করতঃ ইমাম হোসাইন ওয়ালীদের কাছে পৌঁছলেন। জওয়ানদের ঘরের বাইরে নিয়োজিত রাখলেন এবং তাদের নির্দেশ দিলেন, “যদি আমি তোমাদের ডাকি অথবা যদি তোমরা আমার উচ্চস্বর শুনতে পাও, তবে তাৎক্ষণিকভাবে চলে আসবে। আর এছাড়া যতক্ষণ আমি বাইরে না আসি ততক্ষণ এখান থেকে একচুল নড়বে না।” এর পর তিনি ভেতরে গেলেন।

ওয়ালীদ তাঁকে আমীরে মুয়াবিয়ার মৃত্যুর সংবাদ জানালেন এবং ইয়াযীদের নির্দেশও জানিয়ে দিলেন। তিনি সমবেদনা জানানোর পর বললেন, “দেখুন, আমার মত একজন ব্যক্তি এভাবে চুপে চুপে বাইয়াত করতে পারে না। আর এরূপ গোপনে বাইআতে সম্মত হওয়া আমার উচিৎত্ত নয়। যদি আপনি বাইরে এসে প্রকাশ্যে সর্বস্তরের লোকদের এবং তাদের সাথে আমাকেও বাইআতের আহ্বান জানান, তবে কথা হতে পারে।" 
ওয়ালীদ শান্তিপ্রিয় ও সমঝোতার পক্ষপাতি ছিলেন। তিনি বললেন, “বেশ, আপনি তশরীফ নিয়ে যান।” তিনি উঠে চলে আসছিলেন। মরওয়ান এ ঘটনাতে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়ে ওয়ালীদকে বললেন, “আপনি যদি এ মূহুর্তে তাঁর কাছ থেকে বাইয়াত গ্রহণ না করে ছেড়ে দেন, তবে পরে তাঁকে বাগে আনতে পারবেন না। না জানি হয়তো বহু লোকের এতে প্রাণ হানি হতে পারে। তাঁকে গ্রেফতার করুন। বাইআতে স্বীকৃত হলেতো উত্তম, নচেৎ তাঁকে কতল করুন।” 

একথা শুনামাত্র ইমাম দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং বললেন “হে ইবনে যারকা, তুমিই আমাকে কতল করবে, না ইনি করবেন? খোদার কসম তুমি মিথ্যুক এবং ইতর।” এটা বলেই তিনি বেরিয়ে আসলেন।

মারওয়ান ওয়ালীদকে বলল, “আপনিতো আমার কথা রাখলেন না, খোদার শপথ, এখন আপনি তাঁকে কাবু করতে পারবেন না, তাঁকে হত্যা করার এটা মোক্ষম সুযোগ ছিল।” 
ওয়ালীদ বললেন, “আফসোস, তোমার দুর্ভাগ্য দেখে করুণা হয়। তুমি আমাকে এমন পরামর্শ দিচ্ছ, যাতে আমার দ্বীন ধর্মের চরম সর্বনাশ হয়? আমি কি শুধু ইয়াযীদের বাইআত প্রত্যাখ্যান করার কারণেই নবীজির প্রিয় দৌহিত্রকে কতল করবো? পৃথিবী পরিমান মাল সম্পদও যদি আমাকে দেওয়া হয়, তথাপিও আমি তাঁর পবিত্র রক্তে নিজ হাত রঞ্জিত করতে পারিনা। 

খোদার কসম, কিয়ামতের দিন হোসাইন-খুনে যেই অভিযুক্ত হবে, আল্লাহর সামনে অবশ্যই সে নেকীহারা হবে।” মারওয়ান বললো 'আপনি ঠিকই বলেছেন।” তবে এটা সে বাহ্যতঃ মৌখিক ভাবেই বলেছিল। নয়তো ওয়ালীদের কথা সে মন থেকে অপছন্দই করেছিল। (ইবনে আছীর, তাবরী)
———————
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments

Popular posts from this blog

শুধু মুখে কলেমা পড়লে জান্নাত যাওয়া যাবেনা

মসনবী শরীফ বই - মউলানা রুমী (রহঃ)