কারবালা – ৫৩
কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৫৩)
📚শামে কারবালা
যুদ্ধের সূচনা—
হুরের সরে আসার পর ইবনে সা'দ নিজ পতাকা নিয়ে এগিয়ে আসল এবং একটি তীর ইমামের দিকে নিক্ষেপ করে বলল, “স্বাক্ষী থেকো, সর্ব প্রথম তীর আমিই মেরেছি। এর সাথে সাথেই যুদ্ধের দামামা প্রচন্ডভাবে বেজে উঠে। অন্যরাও তীর ছুড়তে শুরু করে। যুদ্ধ এ ভাবে শুরু হয়ে গেল, আর উভয় পক্ষ থেকে সৈন্যরা বের হয়ে হয়ে আসতে লাগল এবং নিজেদের বীরত্ব দেখাতে লাগল।
যিয়াদ ইবনে আবু সুফিয়ানের আযাদকৃত গোলাম ইয়াসার এবং ইবনে যিয়াদের আযাদকৃত গোলাম সালেম উভয়জন কুফাবাসীর সবার আগে বের হয়ে ময়দানে এসে যুদ্ধের আহবান জানায়। তাদের সাথে মোকাবিলা করার জন্য হাবীব ইবনে মুজাহির এবং বরীর ইবনে হুদ্বাইর এগিয়ে আসেন, কিন্তু ইমাম তাঁদের থামিয়ে দিলেন। এটা দেখে উমাইয়া ইবনে আব্দুল্লাহ্ কালবী মোকাবিলা করার অনুমতি চাইলেন। ইমাম তাঁকে অনুমতি দেন। দু'জনের মোকাবেলায় তিনি একা এসে গেলেন। তারা জিজ্ঞেস করল, “তুমি কে?” আব্দুল্লাহ্ নিজের বংশ পরিচয়সহ নাম বললেন। তারা বললো, “আমরা তোমাকে তো চিনিই না।” যুহাইর ইবনে কাইন অথবা হাবীব ইবনে মুজাহির আমাদের সামনে আসুক।” ঐ সময় ইয়াসার আগে ও সালেম পিছনে ছিল। আব্দুল্লাহ বললেন, “নির্লজ্জের সন্তান, আমার সাথে লড়তে বুঝি তোর অপমানবোধ হচ্ছে?” এটা বলেই এক আক্রমনেই তাকে ধরাশায়ী করে দেন। সালেম তখন প্রচন্ডভাবে তাকে হামলা করল। আব্দুল্লাহ্ বাম হাতে তার তরবারী প্রতিহত করতে তাঁর একটি আঙ্গুল উড়ে গেল। কিন্তু তিনি ডান হাতে তাকে এমন পাল্টা আক্রমন চালান, তাতে সালেমও অক্কা পায়। এ সময় তিনি আবৃত্তি করছিলেন,
“যদি তোমরা আমাকে না চিনে থাক,
তবে শুনো,
আমি 'কালব' গোত্রের একজন সন্তান,
এ আমার বংশ পরিচয়, আমার পক্ষে যথেষ্ট যে,
উলাইম গোত্রে আমার ঘর।
আমি অমিততেজী এক যোদ্ধা তরবারী হাতে,
কঠিন ও বিপদঘন মূহুর্তে ও আমি কাপুরুষ কিংবা অক্ষম ব্যক্তি নই।
হে উম্মে ওহাব, আমি তোমার ঐ কথার জামিন রইলাম যে,
দুশমনদের উপর অত্যন্ত দাপট আর দুঃসাহসিকতার সাথে বর্শা ও তরবারী চালাব, আর তা হবে এমন আঘাত, যা আল্লাহতে বিশ্বাসীদের দ্বারাই সম্ভব।
আবদুল্লাহর স্ত্রী উম্মে ওয়াহাব এর আবৃত্তি শুনে তাঁবু থেকে এক কাঠ নিয়ে বেরিয়ে এসে বলল “আমার মা-বাবা তোমার জন্য উৎসর্গ, আওলাদে রসুলের পক্ষ হয়ে তুমি লড়ে যাও।” আবদুল্লাহ তাকে মহিলার তাঁবুর দিকে ফিরিয়ে দিতে চাইলে সে যেতে অস্বীকৃতি জানাল। আর বলতে লাগল, “আমি তোমার সঙ্গ ছাড়ব না; তোমার সাথে এ জীবন বিসর্জন দেব।” ইমামে আলী মাকাম বলে উঠলেন, “তোমাদের উভয়ের জন্য আহলে বাইতের পক্ষ থেকে আল্লাহ তায়ালা উত্তম প্রতিদান দিন। বিবি তুমি তাঁবুতে ফিরে যাও, মেয়েদের জন্য প্রত্যক্ষ যুদ্ধ ফরজ নয়।"ইমামের আহ্বানে স্ত্রী তাঁবুতে ফিরে গেলেন।
আবদুল্লাহ্ ইবনে উমাইর কালবী ইনি বনু উলাইম গোত্রের একজন। অতি সম্প্রতি কুফায় এসেছিলেন। হামদান গোত্রের জা'দ এর কূপের নিকট একটি গৃহে অবস্থান করেছিলেন। নুমাইর বিন ফাসেত বংশোদ্ভূত তাঁর স্ত্রী উম্মে ওয়াহারও তখন তাঁর সাথে ছিলেন। আবদুল্লাহ নুখায়লা নামক জায়গায় অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত এক সৈন্যদল দেখে লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, “এ সৈন্যগুলো যাচ্ছে কোথায়?” কেউ উত্তরে বলল, “ফাতেমা বিনতে রাসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এর বেটা হুসাইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে।” আবদুল্লাহ বললেন, “খোদার কসম, আমি মনে মনে এ আকাংখা পোষণ করতাম, কখনো যদি মুশরিকদের বিরুদ্ধে জ্বিহাদ করতে পারতাম! যখন এ ঘটনা শুনলাম এবং কুফার সৈন্যদের দেখলাম তখন, আমার দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে গেল যে, যারা নিজ নবীজির দৌহিত্রকে খতম করার জন্য সৈন্য পাঠাতে পারে তাদের বিরুদ্ধে জ্বিহাদ করার পুরস্কার, প্রতিদানও আল্লাহর নিকট মুশরিকদের বিরুদ্ধে জ্বিহাদ করার বিনিময় থেকে কোন অংশে কম নয়।”
অতঃপর তিনি নিজ স্ত্রীর কাছে আসলেন এবং নিভৃতে ডেকে নিয়ে তাকে সার্বিক অবস্থাও নিজের অভিপ্রায়ের কথা খুলে বললেন। স্ত্রী বললেন, “তোমার অভিপ্রায় অতি উত্তম। আল্লাহ তোমার উত্তম আকাংখা ও পূণ্য ইচ্ছা পূর্ণ করুন। চলো আমাকেও সাথে নিয়ে চলো।” আবদুল্লাহ স্ত্রীকে সাথে নিয়ে রাতারাতিই ইমামের কাফেলায় উপনীত হন। তারই এ সৌভাগ্য হয়েছিল যে, তিনি ইমামের আগে নিবেদিতপ্রাণ সিপাহী হিসাবে বের হয়ে সালেম ও ইয়াসারকে মৃত্যুর ঘাটে পৌঁছিয়ে দেন।
সালেম ও ইয়াসারের কতলের পর ইয়াযীদ বাহিনীর ডানপার্শ্বস্থ সৈন্যদলের প্রধান আমর বিন হাজ্জাজ ব্যাটালিয়ান নিয়ে ইমামের দিকে অগ্রসর হল। ইমামের উৎসর্গিতপ্রাণ সহচরবৃন্দ পা ঠুকে বুক টান করে দাঁড়িয়ে গেলেন, তীর বৃষ্টির মাধ্যমে কুফাবাহিনী ঘোড়াগুলোকে পেছনে ফিরতে বাধ্য করলেন।
পরবর্তী পর্ব–
একটি কারামত

Comments
Post a Comment