কারবালা – ৬৪



কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৬৪)

📚শামে কারবালা

****************

যেভাবে একের পর এক শহীদ হলেন – ৮

ইমাম হাসান মুজতবার সন্তানগণ—

ভাই চতুষ্ঠয় শাহাদাত বরণ করার পর ইমামে পাকের আপন ভাইপো আব্দুল্লাহ ইবনে হযরত ইমাম হাসান (রাদি.) অগ্রসর হলেন। আরজ করলেন,“শ্রদ্ধেয় চাচাজান, আমাকেও অনুমতি করুন, দ্বীনের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়তে চাই, আর এ জীবনটা সত্যের পথে উৎসর্গ করতে চাই। ইমামে পাক তাঁকে বুকে জড়িয়ে নিলেন এবং অনেক বুঝাতে চাইলেন; কিন্তু অনুমতি না দিয়ে কিছুতেই তাঁকে নিবৃত্ত করা গেল না। অমিততেজী এ সিংহশার্দূল যুদ্ধের ময়দানে আসলেন। শত্রুর সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করলেন,

“শ্রদ্ধাভাজন পিতাজী মোর উচ্চ মর্যাদার, 

হাসান নামে নয়ন জ্যোতি সেই যে জোরার, 

এই যে হুসাইন শাহান শাহ অমূল্য রতন, 

সত্য পথের দিশারী যে চাচাটি আমার। 

এবং তরবারী উদ্যত করলেন। এমন নৈপূণ্য প্রদর্শন করলেন যে, শত্রুদের মধ্যে হৈ চৈ পড়ে গেল। প্রমাণ করলেন তিনি হায়দারে কাররার এর পৌত্র। আমর বিন সা'দ বলল, “এ যুবকটিকে ঘেরাও করে শেষ করে দাও।” বুখতরী বিন আমর শামী পাঁচ শো আরোহী নিয়ে অগ্রসর হল এবং চারদিকে থেকে তাঁকে ঘিরে ফেলল। তিনি বীরত্বের সাথে মোকাবিলা করলেন। পরিশেষে অসংখ্য আঘাতে জর্জরিত হয়ে শাহাদাতের সুধা পান করলেন। (রাদি.)


সাইয়িদুনা কাসেম বিন হাসান—

হযরত আব্দুল্লাহ্’র শাহাদাতের পরে ইমামে পাকের চরণে নবীকুঞ্জের অপর পুষ্প হযরত কাসেম বিন হাসান (রাদি.) হাজির হলেন। ঊনিশ বছরের তরুণ। ইনি নওজোয়ান, যাঁর সাথে ইমামে পাকের কলিজার টুকরো হযরত সকীনার ভবিষ্যত জড়িত। ভগ্নহৃদয়ের এ সারথী, নবী-বংশের নয়ন-পুতুল, আকাংখার অবতার হয়ে আরজ করলেন, “চাচা হুজুর, আমিও সত্যের পথে আত্মাহুতি দিতে এবং আব্বাজানের কাছে যেতে অস্থির। আমাকেও অনুমতি দিতে মর্জি হোক।” ইমামে পাক এ চোখের মণিকে দেখলেন এবং বললেন, “কীসের জন্য আমি তোমাকে অনুমতি দেবো? তীরের আঘাতে চালুনী হবার জন্য? তরবারীর ধারে টুকরো হবার জন্য? তুমি যে আমার ভাই হাসান মুজতবার স্মৃতি চিহ্ন!” হযরত কাসেম আরজ করলেন, “চাচাজান, দোহাই আল্লাহর্! আমাকে ঐ দুশমনদের বিরুদ্ধে লড়াই করার অনুমতি দিন, আপনার চরণে উৎসর্গ হবার সৌভাগ্য থেকে আমাকে বঞ্চিত করবেন না।” ইমামে পাক অশ্রুসজল চোখে তাঁর মাথায় চুমো খেলেন এবং তাঁকে বুকে লাগালেন। অতঃপর তাঁকেও বিদায় দিলেন । হায় আল্লাহ্! কী অপূর্ব ত্যাগ! ইমামে পাক না নিজের যুবক ভাইপো'র যৌবন দেখলেন, না নিজ কন্যার ভবিষ্যৎ দেখলেন । দেখলেন শুধু এটাই যে, ইসলামের বাগান যেন শুষ্কতার শিকার না হয়। এ বাগানের সজীবতার জন্য নিজ বংশের জওয়ানদের রক্তও যদি দিতে হয়, তবে তাই দেবো।

“সত্যচারীর তরে যেন এই শাহাদত এক সবক,

জগৎ কুলে এমনি সে এক উজ্জ্বলতম মাইল ফলক।"


হযরত কাসেম ময়দানে এসে ইয়াযিদীদের লক্ষ্য করে বললেন, “হে দ্বীনের দুশমনেরা, নিজ নবীর গৃহ উজাড়কারীরা, আমি হাসান ইবনে আলীর বেটা, আমি নবীবংশের নয়নমণি, কুলপ্রদীপ, আমি বিবি যাহরার পুষ্প কাননের এক প্রস্ফুটিত ফুল, এসো আমাকেও তীরবাণে জর্জরিত করো, তরবারীর আঘাতে আমাকেও ঘায়েল করো, আর আমার জন্য জান্নাতের পথ প্রশস্ত করে দাও। তোমাদের মধ্যে কে আছে যে, একাকী আমার সাথে লড়তে পারে?”


ইবনে সা'দ আরযাক নামের এক সেনাপতিকে বলল,- 

”এ তরুণকে কতল করে আস।” 

আরযাক বলল, “বাহ্ চমৎকার, জনাব! আপনি আমার যথার্থই মূল্যায়ন করেছেন, আমি সেই বীরজওয়ান, যে কিনা একাই অযুত সৈন্যের মোকাবিলা করতে পারে। ঐ পুচকে ছোঁড়ার সাথে লড়তে যাওয়া তো আমার অবমাননা!” 

ইবনে সা'দ উত্তেজিত হয়ে বলল, 

“তুমি জান না এ জওয়ান কে? এ যে আলীর পৌত্র! তিন দিনের পিপাসার্ত, তবুও তাঁর সাহস ও বীরত্ব দেখতে চাও, তো একটু সামনে গিয়েই দেখো।” 

সে বলল, আমি তো যাব না, তবে সৈন্যের মধ্যে আমার চার ছেলে রয়েছে, তাদের মধ্য থেকে একজনকে পাঠাচ্ছি! তার মোকাবেলায় ঐ একজনই যথেষ্ট হবে।” 

কথামত সেই এক পুত্রকে পাঠাল। সে তাঁর (কাসেম) সাথে মোকাবেলায় আসল। তিনি এগিয়ে আসলেন। কয়েক মূহুর্তের মধ্যেই আরযাক পুত্রকে মাটিতে ছটফটরত অবস্থায় রেখে দিলেন এবং তার ব্যবহৃত খুবই উত্তম তরবারীটা কব্জায় নিয়ে নিলেন। 

আরযাকের আরেক পুত্র নিজ ভাইকে রক্ত ও ধূলোয় লুটোপুটি খেতে দেখে ক্রোধে উম্মাদ হয়ে ভায়ের প্রতিশোধ নিতে এগিয়ে আসল। হযরত কাসেম তাকেও ধরাশায়ী করে দিলেন। 

এবার আরযাকের তৃতীয় পুত্রও মূর্তি মান ক্রোধ হয়ে এগিয়ে আসল এবং সামনে এসে তাকে গালিগালাজ করতে শুরু করল। 

তিনি বললেন,“হে আল্লাহর দুশমন! তোমার গালির জবাব আমি গালি দিয়ে দেবোনা। এটা আমার পক্ষে শোভনীয় নয়। তবে প্রত্যুত্তরে আমি তোমাকে তোমার ভাইদের কাছে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিচ্ছি।” এটা বলেই তিনি আক্রমন চালালেন। আর তাকে দ্বি খন্ডিত করে রেখে দিলেন। আরযাক যখন নিজের তিন পুত্রেরই মন্দ পরিণাম দেখতে পেল, তখন রাগে ক্ষোভে অগ্নিশর্মা হয়ে গজাতে লাগল। নিজেই মোকাবেলা করতে এগিয়ে আসছিল, তার চতুর্থ ছেলে প্রলাপ বকতে বকতে এগিয়ে এসে বলল, “বাবা, একটু থাম। ঐ যুবকের সাথে লড়তে আমাকে সুযোগ দাও।” ক্ষুধার্ত বাঘের মত সে কাসেম (রা.) এর উপর উদ্যত হলো। তিনি তরবারী দ্বারা তার আক্রমন প্রতিহত করলেন, তারপর তীব্র আক্রমনে তার ডান হাত কেটে ফেললেন। ফলে তার হাত থেকে তরবারী পড়ে গেল। দ্বিতীয় আক্রমনেই তার দফারফা করে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলেন। 

এখন তো আরযাকের দূর্দশা দেখার মতই হয়ে উঠল। তার সমস্ত অহংকার ধূলোয় মিশে গেল। জীবনের সমগ্র অর্জনই যেন লুণ্ঠিত হয়ে গেল। নির্বংশ হয়ে যাওয়া পিতার চোখে সমগ্র দুনিয়াটাই অন্ধকারে পরিণত হল। তার স্বপ্নের সকালে যেন বিষাদের সাঁঝ নেমে এল। তার সেই আত্মম্ভরিতা, যা এখন পর্যন্ত কাসেমকে বাচ্চা মনে করে মোকাবেলায় যাওয়া থেকে তাকে বিরত রেখেছিল, মূহুর্তেই তা উবে গেল। ঐ দূরাচার পুত্রের বদলা নিতে রাগ ও ক্রোধের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে একঘায়ে এ যুবককে শেষ করে দিতে এগিয়ে আসলো; কিন্তু তার তো এটা জানা ছিল না যে, তার মোকাবিলায় আজ ঐ তরুণ, যার বাহুতে ঐশী শক্তি কাজ করছে। সে সামনে এসে হস্তীর মত গর্জন করতে লাগল, বাঘের মত হুঙ্কার ছাড়তে লাগল। তার তরবারী বিদ্যুতের মত শুন্যে চমক দিচ্ছিল। যখনই তার দৃষ্টি হযরত কাসেমের সে তলোয়ারের উপর পড়ল, যা তিনি তার ছেলের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন, তখন সে বলতে লাগল, “খোদার কসম, এ তলোয়ার আমি এক হাজার দিনার দিয়ে কিনেছিলাম। আরো এক হাজার দিনার দিয়ে তাতে বিষের প্রলেপ লাগিয়েছি। এটা আমি তোমার হাতে থাকতে দেবোনা। ওটার সাথেই তোমাকে শেষ করছি।” 

তিনি (কাসেম) বললেন, “তোমার তিন ছেলেই তো এটার স্বাদ গ্রহণ করে নিয়েছে, তুমি আকাংখা সামলে রাখো, এখন তোমাকেও তার স্বাদ বুঝিয়ে দিচ্ছি।" অতঃপর তিনি যুদ্ধের কুটকৌশল অবলম্বন করে বললেন, “আরযক, আমি তো তোমাকে যুদ্ধনিপুণ বীর বাহাদুর বলে ভেবেছিলাম; কিন্তু তুমি দেখছি একেবারেই আনাড়ী। তোমার তো ঘোড়ার জিন পরানোর কায়দাও জানা নেই।” আরযক একটু ঝুকে ঘোড়ার পড়ানো জিন দেখতে লাগল। এই ফাঁকে তিনি যুৎসই একটি আক্রমন চালিয়ে তাকে দ্বিখণ্ডিত করে দিলেন। অতঃপর এক লাফ দিয়ে নিজের ঘোড়া থেকে আরযকের ঘোড়ার উপর সওয়ার হয়ে গেলেন, আর দ্রুত উভয় ঘোড়াকে চালিয়ে তাঁবুর দিকে চলে আসলেন। ইমামে পাকের খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করলেন, “বড়ই পিয়াস, চাচাজান, একটি পেয়ালা পানি যদি মিলতো, তবে এই মূহুর্তেই এদের সবাইকে আমি নিঃশেষ করে দিতাম।” ইমামে পাক ফরমালেন, “বেটা, খুব সহসাই তুমি কাওসার পরিবেশনকারীর হাত থেকে কাওসারের পেয়ালা নেবে। দেখো, ঐ পেয়ালা পান করার পর তোমাকে পিপাসা আর কখনো কষ্ট দেবে না। দেখো, তোমার পিতাজী তোমার পথ চেয়ে আছেন। যাও, তাঁদের কাছে যাওয়ার সময় এসে গেছে। তাঁদেরকে আমার সালাম জানিও।” হযরত কাসেম আবারও ময়দানে আসলেন। ইবনে সা'দ বলল, “এ নওজোয়ান আমার খাসা জোয়ানদের হত্যা করেছে, একে এখন আর সুযোগ দিওনা। এদের চারিদিক থেকে ঘিরে ফেল, আর খতম করে দাও।” তার নির্দেশমত দুশমনেরা তাঁকে চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করে ফেলল। এরপর একযোগে আক্রমন চালাল। তুমুল লড়াই শুরু হয়ে গেল। তিনি এ অবস্থায়ও অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে লড়তে লাগলেন। কারবালার এক খন্ড ধুলোর মেঘ হযরত হাসান (রাদি.)'র চাঁদকে গ্রাস করলো। তীরের বৃষ্টিতে তিনি জর্জরিত হতে লাগলেন। এক হতভাগ্য শীশ ইবনে সা'দ, মতান্তরে সা'দ বিন আমর বিন নুফাইল ইয়াযদী তাঁর মাথায় তরবারীর আঘাত হানে। তিনি বলে উঠলেন, “ইয়া আম্মাহ্, আদরিকনী” অর্থাৎ “চাচাজান, আমাকে ধরুন, সামলে নিন।” বলতে বলতে লুটে পড়লেন। ইমামে পাক তাঁর আওয়াজ শুনতে পেয়ে দৌড়ে তাঁর কাছে চলে আসলেন। দেখলেন, তাঁর কমনীয় দেহ মোবারক আঘাতে জর্জরিত। মাথাটি কোলে নিয়ে বললেন, “কাসেম তাদের ধ্বংস অনিবার্য, যারা তোমাকে কতল করেছে কিয়ামতের দিন তোমার প্রপিতামহের কাছে তারা কী জবাব দেবে, যখন তিনি তাদেরকে তোমার খুনের বিষয় জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। ইমামে পাকের কোলেই তাঁর রূহ মোবারক উড্ডয়ন করে। (ইন্নালিল্লাইহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন) ইমামে পাক তাঁর লাশ মোবারক এমনভাবে উঠিয়ে নিলেন, যাতে কাসেমের সিনা মোবারক ইমামের সিনার সাথে মিলানো ছিল। দুটি পা মাটির সাথে আছড়ে যাচ্ছিল। ইমামে পাক লাশ মোবারক শহীদানের লাশের পাশে রেখে দিলেন।


হায় রে! শেষে তুমিও বুঝি সাজলে শোভা জান্নাতের, 

হায়গো কাসেম, প্রিয় বাছা মোর ভায়ের। 

আবার কী হে অন্তরে মোর দাগ লাগালে বিচ্ছেদের।

হায়গো কাসেম! দুলাল প্রিয় মোর ভায়ের।

যদি তুমি আসতে নাগো মোর সাথে, 

যেতে নাগো যমদূতের ওই সাক্ষাতে,

ক্ষুধা ও তৃষায় জীবন নাহি দিতে ফের, 

হায়গো কাসেম হৃদয় নিধি মোর ভায়ের বলো, 

আমি কার বিরহ পাশ কাটাই, 

কার আগে হায় কোন্ স্বজনের লাশ উঠাই? 

কাকে বুঝাই দুঃখ, ব্যথা বলো না এ অন্তরের, 

হায়গো কাসেম ! প্রিয় বাছা মোর ভায়ের।”


হযরত কাসেম (রাদি.)'র শাহাদাতের পর তাঁর ভাই হযরত উমর এবং হযরত আবুবকর বিন হযরত ইমাম হাসান (রাদি.) ও দূরাচার ইয়াযিদ বাহিনীর আক্রমনে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করল।


Comments

Popular posts from this blog

শুধু মুখে কলেমা পড়লে জান্নাত যাওয়া যাবেনা

মসনবী শরীফ বই - মউলানা রুমী (রহঃ)