কারবালা – ৪৩
কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৪৩)
📚শামে কারবালা
📚শামে কারবালা
দুনিয়ার লোভে ইবনে সা'দ—
ইবনে সা'দ দুনিয়াবী প্রভাবপ্রতিপত্তির লোভে যদিও ইমামের সাথে মোকাবিলার এসে গিয়েছিল; কিন্তু মনের দিক থেকে সে চাইছিল না যে,এমন মহাপাপ তার দ্বারা হোক। এজন্য সে বারবার এটাই চাচ্ছিল যে, এমন একটা উপায় বেরিয়ে আসুক, যাতে সংঘর্ষ এড়ানো যায়। এ লক্ষেই তার এবং ইমামের মাঝে তিন/চার বৈঠক আরো হয়েছিল।
এটাও বিচিত্র নয় যে,যুদ্ধের আগুন নিভাতে গিয়ে সে নিজের পক্ষ থেকেই হয়তো কথা গুলো বাড়িয়ে দিয়েছিল। কেননা দু'টি পক্ষের মাঝে যখন চরম দ্বন্দ্ব হয়, এমনকি যুদ্ধের আশংকা হয়, তখন তাদের মধ্যে সন্ধি স্থাপনের ধারায় মিথ্যাচারও বৈধ। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) এর ফরমান আছে,
“তিনটি বিশেষ স্থান ব্যতিত মিথ্যা বলা হালাল নয়। ১. স্ত্রীকে পরিতুষ্ট করার উদ্দেশ্যে যখন স্বামী কথা বলে। ২. যুদ্ধের ময়দানে,৩. মানুষের মাঝে সন্ধি স্থাপনের সময়। যথারীতি ইবনে সা'দ ইবনে যিয়াদের কাছে লিখল, “আল্লাহ্ আগুনের লেলিহান শিখাকে নিভিয়ে দিলেন। সৃষ্টি করলেন ঐক্যের পরিবেশ। উম্মতের (কঠিনতর) বিষয়টি মিটিয়ে দিলেন এভাবে যে, হুসাইন আমাকে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছেন, (ক) তিনি যেখানে থেকে এসেছেন, সেখানে চলে যাবেন, (খ) আমাদের পছন্দমত সীমান্তবর্তী কোন এলাকায় তাঁকে পাঠিয়ে দেই, (গ) ইয়াযীদের কাছে নিজে গিয়ে সরাসরি তার হাতে নিজহাত অর্পন করবেন। পরে উভয়ের সমঝোতায় যে সিদ্ধান্ত হবে, তাতে তোমাদের সন্তুষ্টি এবং উম্মতের জন্যও কল্যাণকর হবে।" (✍🏼ত্বাবরী ২৩৫/৬, ✍🏼ইবনে আসীর ২২/৪)
ইবনে সা'দের এ চিঠি ইবনে যিয়াদের কাছে পৌঁছল। বর্ণিত তিনটি প্রস্তাবের কোন একটি মেনে নিতে তারও ইচ্ছে হল। ঐ সময়ে ইবনে যিয়াদের নিকট শীমার বিন যিল জওশন বসা ছিল। ঐ দূর্ভাগা দাঁড়িয়ে গেল। বলল, “তুমি কি হুসাইনের শর্ত মানছো? অথচ এ মূহুর্তে সে তোমার হাতের মুঠোয় রয়েছে। আল্লাহর শপথ, যদি সে তোমার আনুগত্য ছাড়াই এখান থেকে চলে যায়, তবে এটা তো তাঁরই বিজয় ও শক্তিমত্তা আর তোমাদের পরাজয় ও দূর্বলতার কারণ হবে। এ সুযোগ তাঁকে কখনো দিওনা। এতে তোমাদের সম্পূর্ণ অমর্যাদা হবে। বরং উচিৎ এটাই হবে যে, হুসাইন এবং তাঁর সকল সহচর তোমাদের নির্দেশের সর্বাত্মক অনুগত হবে। যদি তুমি তাদের এখন শাস্তি দাও, তবে দাও, তোমার অধিকার আছে, আর যদি ক্ষমা করো, তারও এক্তেয়ার রয়েছে। খোদার শপথ, আমি তো এটা জানতে পেরেছি যে, হুসাইন এবং ইবনে সা'দ নিজ নিজ সৈন্যদের নিয়ে রাতের পর রাত বসে বসে আলোচনায় মিলিত হচ্ছে।
ইবনে যিয়াদ বলল, “তুমি খুব ভাল পরামর্শ দিয়েছো, আমার চিঠি নিয়ে তুমি এখনই ইবনে সা'দের কাছে যাও।” এর পর ইবনে যিয়াদ ইবনে সা'দকে লিখল,
“আমি তোমাকে এ জন্য তো প্রেরণ করিনি যে, তুমি হুসাইনকে অবকাশ দিতে থাকবে, আর সুপারিশকারীর মত তাঁর জীবনের নিরাপত্তা চাইবে। যদি হুসাইন এবং তাঁর সাথীরা আমার নির্দেশের প্রতি গর্দান ঝুঁকায়, তবে তাঁদের আজ্ঞাবাহীর মতো আমার কাছেই পঠিয়ে দাও। যদি তারা এটা না করে তো, তাৎক্ষণিক তাঁদের উপর হামলা করে তাদের হত্যা করো, এর পর শিরচেছদ করে লাশ গুলোর উপরে ঘোড়া দৌড়িয়ে নিষ্পেষিত করে ফেলো। কেননা তারা ঐ আচরণেরই উপযুক্ত। তুমি যদি আমার নির্দেশ মোতাবেক কাজ কর, তবে তোমার প্রতিদান সেটাই মিলবে, যা একজন অনুগত ও বাধ্যগত লোকে পায়। আর যদি এ কাজ তুমি করতে না চাও, তবে আমার সৈন্য-সামন্ত শিমার-এর হাতে ন্যস্ত করে দিয়ে তুমি সরে পড়ো। আমি শিমারকে সব নির্দেশনা দিয়ে ফেলেছি। সে আমার নির্দেশ পালন করবে।” (✍🏻ত্বাবরী ২৩৬/৬, ✍🏼ইবনে আসীর ২৩/৪)
ইবনে যিয়াদ যখন এ চিঠি শিমারকে দিচ্ছিল, তখন ঐ সময় আবদুল্লাহ্ ইবনে আবুল মহল বিন খেরামও ইবনে যিয়াদের নিকট উপস্থিত ছিল। তার ফুফু উম্মুল বনীন বিনতে খেরাম প্রথম দিকে আলী (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু)'র পত্নী ছিলেন। তাঁর গর্ভে হযরত আব্বাস, হযরত আবদুল্লাহ, 'জা'ফর এবং উসমান জন্মগ্রহণ করেন। সে আবেদন জানাল, 'আল্লাহ্ আমীরের মঙ্গল করুন, আমার ভাগ্নেরা হুসাইনের সঙ্গে রয়েছে, আমীর যদি সঙ্গত বিবেচনা করেন, তো তাদের জন্য নিরাপত্তার হুকুম লিখে দেবেন।' ইবনে যিয়াদ তা মঞ্জুর করল। আবদুল্লাহ এ নিরাপত্তানামা স্বীয় ক্রীতদাস কাযমানকে দিয়ে ভাগ্নেদের নিকট পাঠিয়ে দিল। সেই গোলাম নিরাপত্তানামা নিয়ে গিয়ে তাঁদের ডাকল এবং বলল, “তোমাদের মামা তোমাদের জন্য এ নিরাপত্তানামা পাঠিয়েছেন।” আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বীর জওয়ানরা বলল, “মামাকে আমাদের সালাম জানিয়ে বলবে, তোমাদের নিরাপত্তা আমাদের কোন প্রয়োজন নেই। খোদাতা'য়ালার দেয়া নিরাপত্তা (আমাদের দরকার যা) ইবনে যিয়াদের দেয়া নিরাপত্তার চাইতে উত্তম। (✍🏻ত্বাবরী ২৩৬/৬, ✍🏼ইবনে আসীর ২৩/৪)
ইবনে যিয়াদের লিখিত চিঠি শিমার এসে ইবনে সা'দকে দিল। চিঠি পড়ে ইবনে সা'দ বিচলিত হয়ে পড়ল। শিমারের উদ্দেশ্যে বলল, 'আল্লাহ্ তোমার ধ্বংস করুন, তুমি এটা কী নিয়ে এসেছো? খোদার কসম, আমার মনে হয় আমার লিখিত প্রস্তাব মানতে তুমিই ইবনে যিয়াদকে বারণ করেছো। আফসোস, তুমিই বিষয়টি গোলমেলে করে দিলে। যার সমঝোতা আমি আশা করেছিলাম। খোদার কসম, হুসাইন কখনো ইবনে যিয়াদের বশ্যতা স্বীকার করবেনা। তাঁর পাঁজরের ভেতরে রয়েছে এক স্বাধীন আত্মা।” শিমার সব কিছু শোনার পর বলল, “আচ্ছা এখন বলো, তোমার কী ইচ্ছে? আমীরের নির্দেশ মেনে তার শত্রুদের কতল করতে রাজী আছ কি না? যদি না মেনে থাক, তবে সৈন্যসামন্ত আমাকে হস্তান্তর করে দাও।”
ইবনে সা'দের পুনরায় সুযোগ মিলেছিল যে, সৈন্য সামন্ত শিমারের নিকট বুঝিয়ে দিয়ে সে ঐ অনাচারের নায়ক হওয়া থেকে বেঁচে যেতে পারত। কিন্তু তার তো রায়ের হুকুমত প্রত্যাশিত ছিল। ঐ নরাধম খাতুনে জান্নাতের বাগানের ফুলগুলোকে রক্তে ধুলায় গড়াগড়ি করতেই প্রস্তুত হয়ে যায়। আর বলে “আমি আমীরের নির্দেশ পালন করবো।
“চক্ষু যদি বন্ধ থাকে দিনকে বলো রাত তবে,
বন্ধ চোখে সূর্যের আলোর কীই বা অপরাধ হবে?”
শিমার ইমামের কাফেলার সামনে আসল। বলল, “আমার বোনের ছেলেরা কোথায়?” এটা শুনে হযরত আব্বাস ইবনে আলী এবং তাঁর ভায়েরা এগিয়ে এসে বলল, “ব্যাপার কী?” শিমার বলল, “হে আমার বোনের ছেলেরা, তোমাদের জন্য নিরাপত্তা।” এবারে দৃপ্ত ব্যক্তিত্ব জোয়ানেরা আগের চেয়েও অনেক কঠোর উত্তর দিল, “তোমার উপর এবং তোমার দেয়া নিরাপত্তার উপর আল্লাহর লা'নত। তুমি আমাদের নিরাপত্তা দিচ্ছ, অথচ রাসুলের সন্তানের জন্য তোমার নিরাপত্তা নেই! ধিক! (✍🏼ত্বাবরী, ✍🏻ইবনে আসীর)
হযরত মুহাম্মদ ইবনে উমর ইবনে হাসান (রাদিঃ) বললেন,
আমরা কারবালায় দুই নদী তীরে ইমাম হোসাইন (রাদিঃ) এর সঙ্গে ছিলাম, শিমার যিল জওশনকে দেখে ইমাম বললেন, আল্লাহ্ ও রাসুল সত্যই বলেছেন। রাসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছিলেন, আমি চিত্রবর্ণ এক কুকুরকে দেখতে পাচ্ছি, যে, আমার আহলে বাইআতের রক্তে মুখ দিচ্ছে। শিমার শ্বেতীরোগ বিশিষ্ট ছিল।
✍🏼ইবনে আসাকীর, 📚সিররুশ শাহাদাতাইন-২৮ পৃঃ
পরবর্তী পর্ব–
একটি রাতের অবকাশ

Comments
Post a Comment