কারবালা – ৬৮



কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৬৮)

📚শামে কারবালা


যেভাবে একের পর এক শহীদ হলেন – ১২

মাসুমে কারবালা হযরত আলী আসগর (রঃ)—


এক দিকে এক এক করে মুজাহিদ বৃন্দ রাসুলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) উনার প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু'র জন্য উৎসর্গ হয়ে গেলেন, আর ঐদিকে শত্রু সৈন্যদের মধ্যে হাজার হাজার সৈন্য তূণ-বাণ আর কামান উচিয়ে, তলোয়ার হাতিয়ারে সুসজ্জিত হয়ে এখনও রাসুল খান্দানের রক্তের পিপাসু হিয়ে বিদ্যমান। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) উনার পবিত্র কোল আরোহী, জান্নাতী ফুল, বতুলের কলজে চেরা ধন, সাইয়্যিদুনা ইমাম হুসাইনের মর্মান্তিক দুঃখ যাতনার বিষয়টি কল্পনা করুন। বিজন দেশে মুসাফিরীর এ হালতে তাঁর উপর কী দুর্দশাই না আপতিত হয়েছে! সহস্র ঘাতে চূর্ণ বিচূর্ণ হৃদয়, অগণিত হৃদয় বিদারক দৃশ্যাবলী, ক্ষুধা-তৃষ্ণার প্রচন্ড জ্বালা, সহযোগী ও প্রিয়জনদের বিয়োগ ব্যথা, প্রাণ উৎসর্গকারী, নিকটজন, ভাই, ভাতিজা, ভাগ্নে এবং প্রিয় পুত্রদের কাফন বিহীন দাফন, পবিত্রাত্মা লাশসমুহের মরুভূমির উত্তপ্ত রোদে পড়ে থাকা, পুতঃপবিত্র, সতী সাধ্বী অন্তপুর বাসিনীদের অসহায়ত্ব, স্বজনহারা, মর্মস্পর্শী একাকীত্বের ভাবনা তাঁর চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। শ্বাপদসঙ্কুল এ কারবালা আজ দুশমনে ছেয়ে গেছে। যাঁদের কাছে রেখে যাওয়া অনাশ্রিত আপনজনদের জন্যে এতটুকু দয়ামায়ার প্রত্যাশাও রইলনা! এমনি মর্মন্তদ সহস্ৰ ভাবনা। এটা সেই কঠিন দুঃখ-যাতনার পাহাড়, যা কিনা কোন মানব সন্তানের জীবনেই এভাবে একত্রিত হয়নি। না ইতোপূর্বে এমন দৃশ্য পৃথিবীর কেউ প্রত্যক্ষ করেছে। নিঃসন্দেহে প্রিয় নবীর দৌহিত্র, ফাতেমার হৃদয়নিধি সেদিন যে ধৈর্য্য সহিষ্ণুতার পরাকাষ্টা দেখিয়ে ছিলেন, তাঁর নজীর পৃথিবীতে নেই। এটা তাঁরই মর্তবা ও মর্যাদা এবং তাঁরই জন্য নির্ধারিত অবস্থান। আর বিশ্ব নিয়ন্তার পক্ষ থেকে তাঁর জন্য এক অনন্য অনুগ্রহই বটে। সত্য-ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁর অবিচল নিষ্ঠা, দৃঢ়চেতা ও অজেয় সংকল্পে সামান্যতম বিচ্যুতি কিংবা অনুযোগের একটি বর্ণমাত্রও মুখে আসেনি।


সকাল থেকে এ পর্যন্ত যত মুজাহিদীন (যোদ্ধা) যুদ্ধের ময়দানে গিয়েছিলেন, তাঁরা কতলও করেছিলেন, নিজেরাও শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু  ...? 

এ মূহুর্তে ছয় মাসের ছোট্ট একটি দুধের শিশু ক্ষুদে যোদ্ধা রণক্ষেত্রে শত্রু সৈন্যের সামনে এসে পৌঁছলেন, যে কিনা রাগের বশে কারো দিকে কখনো একটি আঙ্গুলও উঁচে দেখাননি। ক্রোধের দৃষ্টিতে কারো দিকে একবার তাকায়ওনি পর্যন্ত। তবে কেন এ শিশুর আগমন? নিজের পবিত্র খুন (রক্ত) দিয়ে ইতিহাসের পাতায় শুধু লিখে দিতে এসেছিলেন তাঁর নিষ্পাপ সত্তার প্রতি নির্যাতনের কাহিনী, সেই নরাধমদের পৈশাচিক নির্মমতার কলঙ্ক স্বাক্ষর। আর অনাগত প্রজন্মকে জানান দিতে এসেছিলেন যে, দেখো পাষণ্ড ইয়াযিদীরা আমার মত নিষ্পাপ কোমলমতি শিশুর প্রতি দেখায়নি এতটুকু মমত্ববোধ তিন দিনের পিপাসার্ত কণ্ঠনালীতে পানি দেওয়ার পরিবর্তে দিয়েছিল বিষাক্ত তীরবাণ।


নিষ্পাপ শিশু আলী আসগরের আম্মাজান হযরত সাইয়িদা রুবাব ইমামে পাকের খেদমতে আরজ করলেন, “প্রাণ নাথ, অতি দুঃখে, অনাহারে আমার বুকের দুধ শুকিয়ে গেছে, এক ফোঁটা পানিও কোথাও নেই। আমার নাড়ির ধন দুধের বাছাটিকে একটু দেখুন, প্রচন্ড তৃষ্ণায় ওর অবস্থাটা কেমন হয়ে যাচ্ছে! তাঁর অস্থিরতা আর কান্না যে আমি আর সইতে পারছি না। আমার হৃদপিন্ডটাতো চৌচির হয়ে গেল। দোহাই আল্লাহর! একে নিয়ে যান। ওই পাষান দিল জালিমদের একটু দেখিয়ে আনুন। এর মর্মান্তিক অবস্থা দেখে অবশ্যই কারো না কারো রহম এসে যাবে। শিশুদের প্রতি যে সবারই দয়া হবে।" হযরত সাইয়িদা রুবাবের আবেদনে ইমামে পাক স্বীয় পুষ্প আলী আসগরকে (যা এখনও ফুটতেই পায়নি) কোলে তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এভাবে তাকে নিয়ে কলুষিত মন শত্রুদের নিকট পৌঁছে গেলেন। বললেন,

“রনাঙ্গনে আসেন হোসাইন কোলে সে আসগর, 

বুকের সে ধন পায় না যে দুধ, কাঁপছে সে থর থর! 

জল্লাদের এই সামনে আসেন মর্যাদার ওই বর, 

চাঁদের টুকরো আগলে যেন আসেন মান্যবর 

শোর পড়ে যায়, দেখো, সেথা রাজার মানিক ওই, 

সুরুজ বুকে চন্দ্র জাগে- এমন দৃশ্য কই? 

শুধান শাহে “আমর, শিমার আমায় দোষী কয়, 

এই যে শিশু কোথায় বা কার করল কিছু ক্ষয় ?

বংশে নবীর ছ' মাস আয়ুর দুধ পোষা, নির্বাক, 

সাত দিন তক পানি বিহীন তৃষ্ণাতে সে খাক। 

বয়েসটা খুব কম হলেও তৃষ্ণা তো কম নয়, 

জুলুম আমি সইব, বাছায় কী করে যে সয়? 

গল্ড দুটো পুষ্পে যেন কচলে দেয়া রূপ, 

সইছে না তাই অনুনয়ের ভাষা না রয় চুপ। 

একটু দেখো শুষ্ক কেমন ওষ্ঠ যুগল, হায়, 

উল্টে দু'চোখ মাসুম শিশু বেহুঁশ হয়ে যায়। 

শিশুর প্রতি শত্রুতা যে কাউকে মানায় না, 

একটু পানি দিলেও কি, যা হলকুমে যায় না।


"রে পাপিষ্ট জনগোষ্ঠী, আমি তোমাদের নবীজিরই দৌহিত্র। আর এই ছোট্ট শিশুটি আমারই বুকের মানিক। তোমাদের ভ্রান্ত ধারণামতে আমিই যদিবা দোষী; কিন্তু এ শিশুটিতো কোন অপরাধ করেনি। একেই না হয একটু পানি দাও। দেখো, প্রচন্ড তৃষ্ণায় তার কী দশা হয়েছে। হে দুশমনেরা, পানির পেয়ালা আমার হাতে দিওনা, সম্ভবতঃ ওখান থেকে একটু পানি আমিও পান করব বলে তোমাদের আশংকা হচ্ছে। পানির দুটি বিন্দু দিয়ে এ শিশুর শুষ্ক কণ্ঠটি একটু ভিজানো যাবে, আর কয়েক ফোঁটা পানির কারণে ফোরাতের বহমান দরিয়ায় কোন কমতি তো হবে না। নিষ্পাপ শিশুর প্রতি একজন কাফিরের ও মায়া হবে, অথচ তোমরা তো মুসলমান পরিচয় দিচ্ছ। তোমাদের কি জানা আছে এ শিশুটি কে?”

“অবোধ, অবুঝ এই শিশু কার, আছে সেই খেয়াল? 

ওই নজফের মুক্তো সে যে, ফাতেমারই লাল, 

কসম লাগে সেই বিধাতার, যিনি যুলজালাল, 

আরব দেশের শাহজাদারই জন্য এ সওয়াল। 

রাসূল কুলের সম্রাটের ওই জানের দোহাই দেই, 

দুই ফোঁটা জল দাও না ওগো শিশুর তেষ্টাতেই !”


আফসোস! শত আফসোস!! পাষাণ দিল দুরাচারদের বদনসীবে তা কোনরূপ প্রভাব বিস্তার করল না। তাদের সামান্য দয়াও দেখা গেল না। পানি দেয়ার পরিবর্তে এক মন্দ কপাল হতভাগ্য হারমালা ইবনে কাহেল আসাদী লক্ষ্যস্থির করে এমন জোরে এক তীর ছুঁড়ে মারলো, যা আলী আসগরের কণ্ঠনালী ভেদ করে ইমামে পাকের বাহু মোবারকে গিয়ে বিধল। ইমাম সে তীর টেনে বের করে নিলেন। খল খল বেগে তীরের সাথে বেরিয়ে আসল রক্তের ফোয়ারা। শিশুপুত্রের গরম গরম রক্ত হাতের আঁজলা পুরে নিয়ে আসমানের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে তিনি বললেন, “আল্লাহুম্মা ইন্নী উশহিদুকা আলা হা-উলাইল কাউমি।”

অর্থাত–

“হে আল্লাহ্, এই লোক গুলোর কর্মকান্ডে আমি আপনাকে স্বাক্ষী রাখছি। হে পরওয়ারদিগার, এই একটি সময়ে আমি যে পথে দ্রুত যাত্রা করছি, তার কঠিনতর মনযিলগুলো আপনার করুনাতেই হতে চলেছে সহজতর।


“দেখো আজ ইমাম হাতে দুধের শিশুর লাশ, 

চরণ দুটি টলবে না যাঁর, হোক্ না সর্ব নাশ।”


আলী আসগরের কচি দেহটি খিঁচুনীর মত একটু কম্পিত হয়ে মজলুম পিতার হাতে একবার নড়ে উঠেই নিথর হয়ে গেল। মজলুম পিতা শিশু শহীদের মুখে চুমো খেলেন। হাতে লেগে থাকা রক্তে দাঁড়ি মোবারক রঙিন করে নিয়ে বললেন, “যাও আমার চাঁদবদন, আমিও এ অবস্থায় তোমার রক্তে মাখা মাখি হয়ে নানাজীর কাছে এসে পড়ছি। আর তাঁকে দেখাতে আসছি যে, এ দুরাচার উম্মতেরা তোমার এবং আমার কী অবস্থা করেছে!


এদিকে তাঁবুর বিবিদের ধারণা ছিল অবোধ শিশুর করুণ দশা দেখে নির্দয় পাষাণচিত্তদের অবশ্যই দয়া হবে। এবং তাকে একটু পানি দেবেই। যখন তাঁরা তাঁদের আশার কলিকে ইমামে পাকের হাতে খুন-রঙিন পেল, তখন তাঁদের দুঃখে বুক ফেটে গেল।

এই কি বিচার, একটি ফোটা পানির বিনিময়, আসগরের ওই কণ্ঠে তাদের তীর চালাতেই হয়?


ইমামে পাক শিশু শহীদকে আলী আকবরের পাশে শুইয়ে দিলেন । যে মাত্র দুঃখিনী মা তাঁর কোলে অস্থির শিশুকে কারবালার মাটিতে পরম শান্তিতে শায়িত দেখলেন, তখন (যেন) বলে উঠলেন,

“বল্ দেখি আজ কিইবা হল, হায়রে মাটি কারবালার 

তোর কোলে নিশ্চুপ শুয়ে যে কীভাবে আসগর আমার?”


হয়তো নিষ্পাপ আলী আসগর তৃষ্ণার তীব্রতায় নয়; বরং শহীদ হবার উদগ্র বাসনায় এমনি অস্থির হয়েছিল। অপর দিকে ঐ বদনসীব লোকগুলো নিষ্পাপ শিশু আলী আসগরকে কতল করা সম্ভবতঃ নিজেদের কীর্তি মনে করেছে, কিন্তু ছয় মাস বয়েসী এ বেহেশতী ফুল নিজের জীবন দিয়ে জানিয়ে গেলেন যে, ইয়াযীদের সৈন্যদের মধ্যে যোগ দিয়ে এ কম বখ্তরা মানবতাকে বিসর্জন দিয়েছিল। তারা জুলুম নিপীড়নের চুড়ান্ত করেছিল।


দুশমনে দেয় অবোধ শিশুর কণ্ঠে তীরের স্বাদ, হে খোদা ফরিয়াদ! 

নির্মমতায় রক্ত বহায় শিশুর, তাদের শুরু, হে খোদা ফরিয়াদ! 

সুহৃদ কুলের কী করে বুক ভাঙবে নাকো হায়, কেমনে সওয়া যায়, দেয়না পানি, অস্থিরতায় বেহাল, প্রায় উম্মাদ, হে খোদা ফরিয়াদ! 

শিশুর প্রতি রহম করে প্রতিটি ইনসান, জানে এই জাহান, আফসোস! ঐ দুর্মতিদের দয়ার কথা বাদ, হে খোদা ফরিয়াদ! 

নবীর ঘরের অবোধ শিশু তৃষ্ণাতে তড়পায়, পানিই যে না পায় ! শত্রু এদের কৃপাণ হাতে বিলায় খুনের স্বাদ, হে খোদা ফরিয়াদ। 

পুত্রহারার শোক কি কভু ভুলতে পারে কেউ, জাগে ব্যথার ঢেউ, কোমর ভাঙে, দুঃখে হৃদয় করে আর্তনাদ, হে খোদা ফরিয়াদ! 

দুঃখে ফাটে কজে এমন, পাইনা উপশম, শুনবে কে মাতম? বিক্ষত এ হৃদয় আরো আঘাতে বরবাদ, হে খোদা ফরিয়াদ! 

বদ নসীবে শুধায় যদি বশেই না আনি, দেবইনা পানি, মন্দেরা আজ বিনাশ করে নবীজির আবাদ, হে খোদা ফরিয়াদ!

সত্যলোকে হোসাইনের এ দান যে অবিমল!


ওলীকুল শিরমণি, হযরত খাজা নিজাম উদ্দীন মাহবুরে ইলাহী (রহ.) বলেন, শায়খুল ইসলাম ওয়াল মসলিমীন বুরহানুশ শারই ওয়াদ্দীন হযরত বাবা ফরীদ উদ্দীন মসউদ গঞ্জে শকর (রাদি.) এরশাদ করেছেন, সেদিন আমীরুল মুমিনীন হযরত হুসাইন (রাদি.) শাহাদত বরণ করেন, রাতে এক বুযুর্গ ব্যক্তি হযরত ফাতিমা যাহরা (রাদি.)কে এক স্বপ্নে দেখলেন যে, তিনি আম্বিয়ায়ে কেরাম (আলাইহিমুস সালাম) এর বিবিদের সঙ্গে শুভাগমন করলেন। আঁচল মোবারক কোমরে বেঁধে কারবালার মাঠে যেখানে আমীরুল মুমিনীন হযরত হুসাইন (রাদি.) শাহাদত লাভ করেছিলেন, সে জায়গাটি ঝাড়ু দিতে লাগলেন। আর নিজ জামার আস্তিন মোবারক দিয়ে পরিস্কার করতে লাগলেন। জিজ্ঞেস করা হল, “ওগো হাশর সম্রাজ্ঞী! হাশর দিবসে সুপারিশ কারিনী, এটা কোন জায়গা, যা আপনি নিজ আস্তিন মোবারক দিয়ে পরিষ্কার করছেন?” তিনি বললেন, “এটা যে সেই জায়গা, যেখানে আমার মুসাফির পুত্র হুসাইন শাহাদত লাভের জন্য শির কাটাবে। 

📚রাহাতুল কুলুব; ৫৯


মুস্তফারই দৌহিত্রের শাহাদাতের এই যে, রাত যাত্রা ও মুর্তজারই কিয়ামতের এই যে রাত।



পরবর্তী পর্ব

তাজেদারে কারবালা সাইয়িদুনা

ইমাম হুসাইন (রাদি.)

Comments

Popular posts from this blog

শুধু মুখে কলেমা পড়লে জান্নাত যাওয়া যাবেনা

মসনবী শরীফ বই - মউলানা রুমী (রহঃ)