কারবালা – ৪৮
কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৪৮)
📚শামে কারবালা
📚শামে কারবালা
শিমারের ধৃষ্টতা ও ইমামের শেষ নসিহত
ওদিকে ইয়াযীদীরা যখন পরিখাতে জ্বালিয়ে দেয়া আগুন দেখতে পেল, যা তাঁবু গুলোর পেছনে নিরাপত্তার জন্য জালানো হয়েছিল, তখন অভিশপ্ত শিমার ঘোড়া ছুটিয়ে এদিকে আসল আর চেঁচিয়ে বলতে লাগল। “হে হুসাইন, তোমরা কি কিয়ামত আসার আগে দুনিয়াতেই নিজেদের জন্য আগুনের ব্যবস্থা করে ফেলেছ? (নাউযুবিল্লাহ্ )।” তিনি (ইমাম) এরশাদ করলেন,“(শিমার) তুমিই সে আগুনে জ্বলার জন্য অধিকতর যোগ্য।” মুসলিম ইবনে আওসাজাহ্ আরয করলেন, “হে ইবনে রাসূলিল্লাহ্! আমি আপনার চরণে উৎসর্গ, অনুমতি করেন তো, একটি মাত্র তীর দিয়ে আমি তাঁর দফারফা করে দেই, এই চরম মূহুর্তে আমার তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না।” তিনি বললেন, “না যুদ্ধের সূচনা আমাদের পক্ষ থেকে না হওয়া চাই।” অতঃপর ইমামে পাক ইয়াযীদী সৈন্যদের কাছে গেলেন এবং উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন,
ইমামের শেষ নসিহত—
সমবেত জনতা, তাড়াহুড়ো করো না, আমার কথাগুলো শোনো, সুবচন ও সদুপদেশের যে দায়িত্ব আমার উপর রয়েছে, তা আদায় করতে দাও। এর পরে তোমাদের ইচ্ছা, যদি আমার ওজর গ্রহন করে নাও, আমার কথা সত্য বলে মনে করো এবং আমার সাথে ইনসাফ কর, তবে তা হবে তোমাদের সৌভাগ্য, আর আমার সাথে বিরোধিতার কোন বাহানা অবশিষ্ট থাকবেনা। আর যদি আমার ওজর কবুল না করো এবং ইনসাফ মত কাজ না কর তবে
“অতঃপর তোমরা এবং তোমাদের শরীকদল সবাই মিলে একটি কথায় ঐকমত্য পোষন কর, যাতে ঐকথাটি তোমাদের কারো কাছে গুপ্ত না থাকে। তারপর তোমরা আমার ব্যাপারে যা করতে চাও, করে নাও। আমাকে অবকাশ দিও না ।
নিঃসন্দেহে আমার সহায় হচ্ছেন আল্লাহ্, যিনি কিতাব নাযিল করেছেন, তিনিই পূণ্যবানের সহায় হয়ে থাকেন।”
এদিকে তাঁবুর মধ্যে মহিলারা যখন তাঁর কথা শুনলেন, তখন তাদের মধ্যে হাশর উপস্থিত, তাদের কান্নার আওয়াজ ক্রমশঃ বেড়ে যেতে লাগল, তখন ইমাম পাক ভাই হযরত আব্বাস এবং স্বীয় পুত্র আলী আকবরকে পাঠালেন, যাও, তাদের চুপ করাও, আমি আমাকে জানের দোহাই দেই, এখন তাদের তো বহু কান্না আসবে।” তাঁরা দু'জন গিয়ে তাঁবুর মহিলাদের শান্ত করালেন। যখন তাদের কান্নার আওয়াজ থেমে গেল, তখন ইমামে পাক আল্লাহর তা'য়ালার হামদ্ ও সানা, রাসূলে পাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এবং আম্বিয়ায়ে কেরাম ও ফেরেশতাদের উপর দরুদ ও সালাম পাঠ করলেন। এই হামদ্ ও না'তে এমন চমৎকারিত্ব ও অলংকার সমৃদ্ধ ভাষা প্রয়োগ করলেন, যা বর্ণনা করা দুঃসাধ্য। বর্ণনাকারী বললেন,
খোদার কসম, আমি এত প্রাঞ্জল আর শৈল্পিক বক্তব্য না এর পূর্বে কখনো করতে শুনেছি, না এর পরে কারো থেকে করতে শুনেছি।
অতঃপর প্রমাণ সম্পন্ন করতে তিনি বললেন,
”সমবেত জনতা, আমার বংশীয় কৌলিন্য চেয়ে দেখো, আমি কে? নিজেদের বিষয়ে লক্ষ্য করো, নিজেদের এ সিদ্ধান্তকে ধিক্কার দাও।চিন্তা করো, আমাকে হত্যা করা কিংবা লাঞ্ছিত করা তোমাদের জন্য আদৌ বৈধ কিনা, আমি কি তোমাদেরই নবীজির দৌহিত্র নই? এবং তাঁর ওয়াসী (উত্তরসূরী) ও চাচাতো ভাই (হযরত আলী)-এর পুত্র নই? যিনি আল্লাহর প্রতি উত্তম ঈমান আনয়নকারী এবং রাসূলের প্রকৃষ্ট আস্থা পোষণকারী ছিলেন। শহীদকুলশিরমনি বীরকেশরী হযরত হামযা (রাদিঃ) কি আমার পিতার পিতৃব্য নন? শহীদপ্রবর হযরত জাফর তাইয়ার যুল জানাহাইন কি আমার চাচা নন? এ মশহুর হাদীস কি তোমাদের কাছে পৌঁছেনি যে, রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) তিনি- আমিও আমার ভাই সম্পর্কে এরশাদ করেছেন, তোমরা দু'জন বেহেশতের নওজোয়ানদের সরদার এবং আহলে সুন্নাতের চক্ষু সমূহের শীতলতা?” যদি তোমরা আমার কথায় বিশ্বাস রাখতে, তাহলে (জানতে) নি:সন্দেহে আমি যা তোমাদের বলছি, হক্ব ও সত্য বলছি। কেননা যখন থেকে আমি এটা জেনেছি, মিথ্যুকের উপর খোদার গযব নাযিল হয়, খোদার কসম, সেইদিন থেকে আমি জ্ঞাতসারে কখনো মিথ্যা বলিনি। আমার কথা যদি সত্য বলে না মানো, বরং আমাকে মিথ্যুক মনে করে থাকো, তবে তোমাদের মধ্যে এখনও পর্যন্ত এমন লোক বিদ্যমান আছে, যাঁদের কাছে জিজ্ঞেস করে সত্যাসত্য জেনে নিতে পারো (অথবা সাহাবায়ে রাসূলদের মধ্যে) জাবের বিন আবদুল্লাহ আনসারী, আবু সাঈদ খুদরী, সাহল বিন সা'দ, যায়েদ বিন আরকাম রয়েছেন, তাঁদের কাছে জিজ্ঞেস করো, সত্যতার স্বীকৃতি দেবেন যে, তাঁরা রাসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এর যবান মোবারক থেকে এ হাদীস শুনেছেন। এখন আমাকে বলো, “এ কথা গুলোর মধ্যে কোন একটি কথাই কি এমন নেই, যা আমার রক্তপাত ও লাঞ্ছনা থেকে তোমাদের রুখতে পারে?”
এমন সময়ে শিমার ইমামের প্রতি এক অশোভন উক্তি করে বসলে হাবীব বিন মুযাহির তার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়ে বললেন, “আল্লাহ তোমার অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন, তাই তুমি বুঝতে পারছনা ইমামে পাক কী বলছেন।” শিমার এবং হাবীবের বাক-বিতণ্ডার পর ইমামে পাক আবারও বক্তব্য রাখলেন
“হে সমবেত জনতা, যদি তোমাদের কারো কারো এ কথার মধ্যে সংশয় থাকে, (জান্নাতের নওজোয়ানদের আমি সর্দার) তবে এতেও কি কোন সন্দেহ আছে যে, আমি তোমাদের নবীজিরই দৌহিত্র? খোদার কসম, ভূপৃষ্টের পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত কোথাও এ সময়ে আমি ছাড়া আর কেউ নবীজির দৌহিত্র নেই। বলো, তোমরা আমার রক্তের পিপাসু কেন হলে? আমি কি কাউকে হত্যা করেছি, কিংবা কারো সম্পদ হানি করেছি ? নাকি কাউকে আমি আহত করেছি যে, তোমরা তার প্রতিশোধ নিতে চাও?” (এ প্রশ্নগুলোর কোন উত্তরই তাদের কাছে ছিলনা।) সবাই নিরুত্তর রইল। এরপর ইমাম পাক তাদের জনা কয়েকের নাম ধরে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, “হে শাবস বিন রিঈ, হে হেজায বিন আবজর, হে কায়েস বিন আশআস, হে যায়েদ বিন হারেস, তোমরা কি চিঠি লিখে আমাকে তোমাদের কাছে ডাকো নি?” তারা (এবার সরাসরি অস্বীকার করে) বলল, “আমরা কোন চিঠিপত্র লিখিনি”। তিনি বললেন, “তোমরা অবশ্যই লিখেছিলে” এরপর আবার বললেন, “তোমরা যখন আমাকে অপছন্দই করছো, তবে আমার পথ ছাড়, আমি নিরাপদ কোথাও চলে যাই।"(✍🏼ইবনে আসীর ২৫/৪, ✍🏻তাবরী-২৪৩/৬)
পরবর্তী পর্ব -
যুহাইর ইবনে কাইন এর বক্তব্য

Comments
Post a Comment