কারবালা – ২১
শামে কারবালা - (পর্ব- ২১)
কারবালার ইতিহাস
ইমাম মুসলিমের দুই পুত্ৰের কাহিনি– (পর্ব– ২)
ওদিকে ইবনে যিয়াদ জানতে পারল যে, হযরত মুসলিম (রাঃ) এর সাথে তাঁর দুটি ছেলে মুহাম্মদ এবং ইবরাহীমও এসেছিল। এও সে জেনে নিল যে তারা দু'জন কুফাতেই কারো ঘরে আত্মগোপন করে আছে। কাজেই সে দূরাচার ঘোষণা জারী করল যে, যে ব্যক্তি মুসলিমের দুই ছেলেকে আমার নিকট এনে দেবে সে পুরষ্কার পাবে। আর যে ব্যক্তি তাদের লুকিয়ে রাখবে অথবা এখান থেকে অন্যত্র চলে যেতে সাহায্য করবে, সে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে।
ইবনে যিয়াদের এই ঘোষণা পেয়ে ধন সম্পদের মোহগ্রস্থ কিছু সিপাহী ভাগ্য অন্বেষণে বেরিয়ে পড়ল। তারা সামান্য মেহনত করতঃ খুঁজতে গিয়েই ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) এর শিশু পুত্রদ্বয়কে পেয়ে গেল। সাথে সাথে গ্রেফতার করে ইবনে যিয়াদের পুলিশ অফিসারের হাতে সোপর্দ করে দিল। পুলিশ এদেরকে ইবনে যিয়াদের নিকট নিয়ে আসল। ইবনে যিয়াদ হুকুম দিল; এদের দুইজনকে আপাতত জেলে বন্দি করে রাখা হোক, তাদের সম্পর্কে আমি ইয়াযীদ এর কাছ থেকে সিদ্ধান্ত জেনে নেব। ইয়াযীদের নির্দেশ মোতাবেক তাদের ব্যবস্থা নেয়া হবে।
মাশকুর নামী জেলের এক সুপারিন্টেন্ডেন্ট পরহেজগার ও আহলে বাইতের অনুরক্ত ছিলেন। পিতৃহীন দুই অনাথ বালকের এহেন নির্যাতিত ও অসহায় অবস্থা দেখে তাঁর খুবই মায়া হল। তাঁর ঈমানী জযবা ( উদ্যম) আন্দোলিত হয়ে উঠল। মনে মনে তিনি প্রতিজ্ঞা করে বললেন, এতিম এই দুই বালককে বাচাতেই হবে, চাইতো নিজের জীবন বিপন্ন হোক। প্রতিজ্ঞানুযায়ী রাতের আঁধারে তিনি হযরত আকীলের বাগিচার সে দুই ফুলকে জেল থেকে বের করে আনলেন। নিজের ঘরে এনে খাওয়ালেন। অতঃপর শহরের বাইরে কাদেসিয়ার পথে এনে স্মারকচিহ্ন হিসেবে নিজের আংটিটা দিয়ে বললেন, “এই রাস্তাটি সোজা কাদেসিয়ায় গিয়েছে। তোমরা এই রাস্তা ধরেই চলে যাও। সেখানে পৌঁছে কোতোয়ালের (পুলিশ অফিসার) ঠিকানা জেনে নেবে। উনি আমার ভাই, তার সাথে দেখা করে এ আংটিটি দেখিয়ে নিজেদের সব কথা তাঁকে জানাবে। আর বলবে যে, আপনি আমাদের মদিনায় পৌঁছিয়ে দিন।' তিনি তোমাদের পূর্ণ নিরাপত্তায় মদিনায় পৌঁছে দেবেন।
বিপদ দেখে দুই ভাই রওয়ানা হয়ে গেল। কিন্তু ভাগ্য ও নিয়তির যে লিখন চুড়ান্ত হয়ে গেছে, তাকে বান্দার চেষ্টায় কখনো খন্ডন করা যায় না।
" অদৃষ্টের লিখন, না যায় খন্ডন”।
দুই ভাই সারাটি রাত ধরে চলতে থাকল; কিন্তু কোথায় কাদেসিয়া? সকালের আলো ফুটলে তারা দেখল, কাদেসিয়ার রাস্তার সেই প্রান্তসীমা, যেখান থেকে তাদের চলা শুরু হয়েছিল। অদূরেই একটি গাছ তাদের নজরে পড়ল, যাতে সিন্ধুকের ন্যায় খোল রয়েছে। তার কাছে একটি কুয়াও ছিল। গাছটির আড়ালে এসে তারা আশ্রয় নিল। প্রচন্ড ভয় তাদের পেয়ে বসেছিল। কেউ না আবার ধরে তাদের ইবনে যিয়াদের কাছে নিয়ে যায়-এ আতঙ্কে বুক দূরু দূরু। এর মধ্যে কুয়া থেকে পানি নেয়ার জন্য কোন বাড়ীর এক দাসী এসে হাজির হল। দুটি বালককে এই ভাবে বসে থাকতে দেখে সে কাছে আসল। তাদের রূপ-সৌন্দয্য ও চেহারায় রাজকীয় আভিজাত্য দেখে জিজ্ঞেস করল, “তোমরা কেগো রাজপুত্তুর? আর লুকিয়ে এখানে বসে আছো কেন?” করুণস্বরে বালকদ্বয় বলল, “কী বলে মা আমাদের পরিচয় দেব? আমরা দুটি পিতৃহীন, এতিম শিশু, আমাদের কেউ নেই, বড়ই নির্যাতিত, পথহারা দুটি অবোধ মুসাফির!” মেয়েটি আবার শুধালো, তোমরা কাদের বাছাধন, কী তোমাদের বাবার নাম?' বাপের নাম জিজ্ঞেস করতেই ছোট্ট হৃদয় ব্যকুল হয়ে চোখ জোড়া অশ্রুসজল হয়ে উঠল। দাসী বলল, “আমার মনে হচ্ছে তোমরা মুসলিম ইবনে আকিলের ছেলে দুটিই”। বাবার নাম শুনতেই দুই এতিম ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। দাসী বলল, আপনারা দুঃখ পাবেন না, শাহজাদা! আমি এমন একজন মহিলার দাসী হই, যিনি নবীর খান্দানের সাথে সত্যই ভক্তি-মুহব্বত রাখেন। আপনারা মোটেই চিন্তা করবেন না। আসুন, আমার সাথে চলুন, আপনাদের আমি তাঁর কাছেই নিয়ে যাব। “দু’শাহজাদা দাসীর কথায় রাজী হল। দাসী তাদের নিয়ে নিজ মালেকার ঘরে উপস্থিত হল। আর সকল ঘটনা সবিস্তারে জানাল। ভদ্রমহিলা খুব খুশী হলেন। আনন্দের পুরষ্কার হিসেবে তিনি ঐ দাসীকে আযাদ (মুক্ত) করে দিলেন। অত্যন্ত মুহব্বত সহকারে দুই শাহজাদাকে অভ্যর্থনা জানালেন। কচি দু'জোড়া পায়ে ভক্তিতে চুমো খেলেন। দু'টি এতিম বালকের দুঃখের কাহিনী শুনতে শুনতে অশ্রুপাত করলেন। এরপরে তাঁদের দু'জনকে সান্তনা, সহানুভূতি জানিয়ে বললেন, “কোন চিন্তা নেই।' দাসীকে বললেন, এঘটনা যেন গৃহস্বামী হারেসকে ফাঁস না করে।
“হারেসের ঘর আলো করে আজ ইউসুফের রূপ আসে,
মুসাফির ওই মেহমান হেরি মৃত্যুর দূত হাসে।
হারেসের বিবি চুমে নেয় দুই জোড়া সেই কচি পা
মেরামত করে ছিন্ন পোষাক পরণেতে ছিল যা।
উনুনে চড়ায় পানির হাড়ি সে দু’চরন ধুবে তাই,
শয্যা পাতে, বাছা দুটি আজ একটু ঘুমানো চাই।
নদীর কিনারা, একটি প্রভাত, আতিথ্য ধুম ধামে,
জল্লাদ হেরে কুরবানী আর কন্ঠে ও তেগ নামে”।
———-
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments
Post a Comment