কারবালা – ৫৮
কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৫৮)
📚শামে কারবালা
যেভাবে একের পর এক শহীদ হলেন – ২
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া কুফাপক্ষীয়দের জন্য বিরক্তিকর ঠেকছিল। ওরা চাইছিল যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব এটা শেষ করে দিতে। আর সামান্য মুষ্টিমেয় কিছু লোকদের খতম করে দিতে। ইমামে পাকের সাথে ছিলেন কিছু আত্মোৎসর্গিত ব্যক্তি তাঁদের মধ্যে কেউ শহীদ হয়ে গেলে ক্ষুদ্রতা আরো প্রকটভাবে অনূভুত হতো। পক্ষান্তরে কুফাবাহিনীর সংখ্যা ছিল অনেক বেশী। বিশাল বাহিনীর দু'এক জন নিহত হলেও তেমন পার্থক্য দেখা যেতো না। এমন অবস্থা দৃষ্টে আবু সুমামা আমর ইবনে আব্দুল্লাহ্ আস সায়েদী ইমামে পাকের খেদমতে আরজ করলেন; “আমার জীবন আপনার জন্য উৎসর্গ হোক! এ লোকগুলো আপনার খুব কাছিকাছি আনাগোনা করছে। আমার সামনে আপনার উপর কোন আঘাত বা চোট আসুক সে দৃশ্য আমি সইতে পারবো না। এ জন্য আমার একান্ত ইচ্ছা যে, আমি আপনার সামনেই জীবন বিসর্জন দেবো। কিন্তু আমি এখনো নামায পড়িনি। মন চাইছে নামায আদায় করেই নিজ প্রভূর সান্নিধ্যে যাই।” মাথা উঁচিয়ে ইমামে পাক বললেন, “এমন সময়ে তুমি নামাযের কথা স্মরণ করেছো, আল্লাহ্ তোমায় নামাযী এবং তাঁর স্মরণকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন! হ্যাঁ; এখন তো নামাযের সময়। ওই লোকদের বলো আমাদের জন্য নামাযের অবকাশ দিতে।” এই প্রস্তাবে হোছাইন বিন নুমাইর চেঁচিয়ে বলল, “তোমাদের নামায তো কবুল হবে না। ” উত্তরে হাবীব ইবনে মোযাহির বললেন,“তবে রে গর্দভ! তুই মনে করছিস যে, রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) উনার প্রিয় পরিজনের নামায কবুল হবে না। আর তোরটা কবুল হবে?” এটা শুনে হোছাইন ক্রোধোম্মত্ত হয়ে হাবীবের উপর হামলা করে বসল, হাবীব বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে এসে তার ঘোড়ার মুখে তলোয়ারের এমন আঘাত হানলেন যে, ঘোড়া তার সামনে দুই পা শুন্যে তুলে দাঁড়িয়ে গেল। হোছাইন ছিটকে নিচে পড়ে গেলে। তবে তার সঙ্গীরা দৌড়ে এসে তাকে বাঁচিয়ে নিল। হাবীব তখন আত্মযশ গাইতে লাগলেন,
“মোযেহেরের বেটা আমি, হাবীব আমার নাম,
যুদ্ধে আগুন ছড়ানো এই বীর সিপাহীর কাম।
সংখ্যা তোদের হোক না বেশী কুচ পরোয়া নেই,
প্রতিজ্ঞাতে আমরা অটল, যুদ্ধে জীবন দেই।
সত্যে মোদের দীপ্ত, সদা ন্যায় নীতি, নির্ভয়,
আল্লাহ্ ছাড়া ভয় করি না, সে-ই তো মোদের জয়।
দারুণভাবে তরবারী চালিয়ে অনেকক্ষণ ধরে তিনি প্রচন্ড লড়াই করলেন। বনু তামীম গোত্রের বদীল ইবনে সুরাইম নামে এক ব্যক্তিকে নিহতও করলেন। কিন্তু লড়াই ছিলো বিশাল বাহিনীর বিপক্ষে। সম্পূর্ন একাকী কতক্ষনই বা লড়তে পারেন? তামীম গোত্রীয় একজন তাঁর উপর বর্শা দিয়ে জোরে ঘা লাগায়। যাতে তিনি পড়ে যান, উঠতে যাচ্ছিলেন হোছাইন বিন নুমাইর তাঁর মাথায় তরবারী দিয়ে আঘাত হানল, এতে তিনি আবারও পড়ে গেলেন। তামীমী সৈন্যটি এসে তাঁর শিরচ্ছেদ করে ফেলল। ইন্নালিল্লাহি... রাজিউন।
হাবীবের শাহাদাতে ইমামে পাকের একটি শক্তবাহু ভেঙ্গে গেল যেন। জীবনবাজী রাখা এ প্রিয় সহচরের চির বিদায়ে তিনি ভীষণ মুষড়ে পড়লেন। তিনি এরশাদ ফরমালেন, “আমি খোদা তা'লার কাছে নিজের ও নিজ সাথীদের প্রতিদান চাইব।”
হুর ইবনে ইয়াযীদ প্রিয় দিশারীকে বিষণ্ন দেখে আত্মযশঃ গাইতে গাইতে অগ্রসর হলেন,
শাহাদত অবধি আমি এ যুদ্ধ চালিয়ে যাব, দিন তো আজ এগুবার শুধু এগিয়েই যাব,
কাটবো তাদের এমন ভাবে আস্ত নাহি ছেড়েই যাব,
হটবো নাকো পিছে, তাদের কাউকে বুঝি রেহাই দেব?
প্রসিদ্ধ আত্মোৎসর্গিত সঙ্গী যুহাইর ইবনে কাইনও তাঁর সহযাত্রী হন। তার আবৃত্তি ছিল,
“আমি কাইনের পুত্র যুহাইর, হযরত হুসাইনের পক্ষ থেকে নিজ তরবারী দিয়ে ঐ দুশমনদের আমি প্রতিহত করবো”।
তারা দু'জনে অসীম বীরত্ব ও সাহসিকতার চমক দেখালেন, কিন্তু তারাও বা কতক্ষন লড়বেন! শেষমেষ কুফার সৈন্যদের বিরাট বাহিনী হুরের উপর প্রচন্ড হামলা করে তাঁকেও শহীদ করে দিলেন।
পরবর্তী পর্ব–
যেভাবে একের পর এক শহীদ হলেন – ৩

Comments
Post a Comment