কারবালা – ৫৬



কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৫৬)

📚শামে কারবালা


রণক্ষেত্রে হুর ইবনে ইয়াযীদ—

এরপর ইমামে পাক এর পক্ষে হুর ইবনে ইয়াযীদ বের হলেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইয়াযীদ ইবনে সুফিয়ান। হুর প্রথম আঘাতেই তাকে চির নিদ্রায় শায়িত করে দিলেন। হুরের পরে দ্বন্দ্বের জন্য নাফে' বিন হেলাল এগিয়ে আসলেন। তাঁর মোকাবিলায় মুযাহিম ইবনে হারীস বের হল। নাফে' তাকেও মৃত্যু যন্ত্রনায় কাতরানোর মধ্যে ফেলে রাখলেন। এ পর্যন্ত লড়াই এভাবে চলছিল যে, দুপক্ষ থেকে এক একজন করে রণাঙ্গনে আসছিল। কিন্তু কুফাবাহিনীর পক্ষ থেকে যে-ই আসছিল সে প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে পারছিল না। ব্যাপারটি লক্ষ্য করে আমর বিন হাজ্জাজ চেঁচিয়ে বলতে লাগল,

“রে আহম্মক কুফাবাহিনী, তোমাদের কি জানা নেই যে, তোমরা কাদের সাথে লড়ছো? এরা যে, মৃত্যুকে জীবনের চেয়ে বেশী প্রিয় জানে। কাজেই এক এক করে তাদের মোকাবেলা করতে কক্ষনো যেও না। এরা মুষ্টিমেয় ক'জন লোক, তোমরা তো তাদের শুধু পাথর মেরে মেরেও খতম করে দিতে পারো। কুফা বাহিনী শোন, আনুগত্য ও ঐক্য অপরিহার্য্য রাখো, আর ঐ ব্যক্তি (হুসাইন)কে হত্যা করতে কোনরূপ দ্বিধা সংশয় করবে না, যে ব্যক্তি ইমাম (!) ইয়াযীদের বিরোধিতা করেছে এবং দ্বীনকে পরিত্যাগ করেছে (!)” এটা শুনে ইমাম পাক বললেন, “হে আমর বিন হাজ্জাজ! তোমরা যেসব আচরণ করে চলেছ, মৃত্যুর পরেই তোমরা জানতে পারবে, দ্বীনকে কে পরিত্যাগ করেছে, আর কে জাহান্নামের ইন্ধন হচ্ছে। আমর বিন হাজ্জাজের অভিমত আমর বিন সা'দের ও পছন্দ হল। একজন করে মোকাবিলা করার বিষয়ে সে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল। আমর বিন হাজ্জাজ তার অধীনস্থ ইয়াযীদ বাহিনীর ডান দিকের ব্যাটালিয়ন (গ্রুপ বাহিনী) নিয়ে ইমাম পাকের বাম দিকে সর্বাত্মক হামলা শুরু করে দিল। অনেকক্ষণ ধরে সংঘর্ষ চলতে থাকল। এ সংঘর্ষে ইমামের সহযোগীদের মধ্যে হযরত মুসলিম ইবনে আওসাজাহ্ আসাদী শহীদ হন। তাঁকে আব্দুল্লাহ দ্বাবাবী ও আব্দুর রহমান বজলী শহীদ করে। ইমামে পাক তাঁদের লাশ মোবারকের নিকটে গমন করলেন। তখনও তাঁদের মধ্যে কিছু প্রানস্পন্দন অবশিষ্ট ছিল। তিনি বললেন, “মুসলিম, খোদা তা'লা তোমাদের প্রতি রহম করুন।” এরপর তেলাওয়াত করলেন,

“আর এদের মধ্যে কেউ কেউ নিজ কর্তব্য সম্পন্ন করলেন, আর কেউবা রইলেন অপেক্ষায়, এঁরা (নিজ সংকল্প) একটুও বদলাননি”


হাবীব ইবনে মুজাহির কাছে এসে বললেন, মুসলিম, তোমার এ স্বর্গ যাত্রাকে অভিনন্দন।” মুসলিম অতি অস্ফুটে বললেন, “খোদা তা'লা তোমাদের কল্যাণ ও নেক উদ্দেশ্যকে মোবারক করুন।” হাবীব বললেন, “আমি জানি, খুব সহসা আমিও তোমাদের কাছেই চলে আসব, না হয়, অবশ্যই তোমাকে বলতাম যে, কোন অসিয়ত (অন্তিম অনুরোধ) থাকে তো বলো, আর সে অসিয়ত আমি অবশ্যই পূরণ করতাম, ” মুসলিম তখন ইমামে পাকের দিকে ইশারা করে বললেন, “শুধু একটিই অসিয়ত করছি যে, ইমামের জন্য প্রাণ বিসর্জন করো।” হাবীব দৃঢ় কন্ঠে বললেন, “আল্লাহর কসম, আমি এটাই করবো।” অতঃপর হযরত মুসলিম বিন আওসাজার রূহ মোবারক তাঁর প্রাণপ্রিয় ব্যক্তিত্বের সামনে অনন্তে উড়াল দিল । (রাদিঃ)


এরপর শিমার যিল জওশন তার নেতৃত্বাধীন ইয়াযীদ বাহিনীর বাম ব্যাটলিয়ন নিয়ে হামলা করল। এ হামলার সাথে সাথে ইয়াযীদ বাহিনী চতুর্দিক থেকে ইমামের সহচরদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সংঘর্ষ তীব্রতর হয়ে উঠল। ইমামের সাথে মাত্র বত্রিশ জন আরোহী ছিলেন, কিন্তু তাঁরা নজীরবিহীন সাহসিকতা ও বীরত্ব প্রদর্শন করলেন। যে দিকেই তাঁরা ফিরতেন কুফা বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দিতে লাগলেন । ইয়াযীদ বাহিনীর মধ্যে শোরগোল, হৈচৈ পড়ে গেল। অশ্বারোহীদের নাস্তানাবুদ বানিয়ে দিলেন, অশ্বারোহীদের প্রধান আজরা ইবনে কায়েস নিজ সৈন্যদের চতুর্দিকে পিছপা হতে দেখে আব্দুর রহমান ইবনে হোসাইনকে ইবনে সা'দের কাছে এবলে পাঠালো যে, তুমি তাকিয়ে রয়েছ, সামান্য সংখ্যক আরোহীরা আমার অশ্বারোহী ব্যাটালিয়নকে পরাস্ত করে দিচ্ছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, আমার বাহিনী দিকবিদিক পালিয়ে বেড়াচ্ছে। প্ৰাণ বাঁচানোর চিন্তায় পড়েছে। জলদী কিছু পদাতিক সৈন্য ও তীরন্দাজকে আমার সাহায্যে পাঠানো হোক। ইবনে সা'দ আজরা'র আবেদনের প্রেক্ষিতে শাবছ ইবনে রিবঈকে সেখানে যেতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু শাবছ তা না করে পালিয়ে যায়। এর পর ইবনে সা'দ হোসাইন ইবনে নুমাইর তামীমীকে ডাকল এবং তার সাথে সকল বর্মধারী আরোহী ও পাঁচশ তীরন্দাজকে পাঠিয়ে দিল।


পরবর্তী পর্ব–

যেভাবে একের পর এক শহীদ হলেন 

Comments

Popular posts from this blog

শুধু মুখে কলেমা পড়লে জান্নাত যাওয়া যাবেনা

মসনবী শরীফ বই - মউলানা রুমী (রহঃ)