কারবালা – ৪৯



কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৪৯)
📚শামে কারবালা

যুহাইর ইবনে কাইন এর বক্তব্য—
এরপর কায়েস বিন আশআস বলল, আপনি চাচাত ভাই ইবনে যিয়াদের নির্দেশ মাথা পেতে নিন। তবে আপনার সাথে কোন অশোভন আচরণ করা হবে না।” ইমাম বললেন, 
“অবশ্য তুমিও তো মুহাম্মদ ইবনে আশআসের ভাই। তোমরা কি এটাই চাচ্ছ যে, বনু হাশিম মুসলিম ইবনে আকীলের রক্ত ছাড়াও আরো রক্তের বদলা চাইবে? খোদার কসম, হীন প্রকৃতি কোন লোকের মত না আমি ইবনে যিয়াদের হাতে কখখনো হাত দেবো, না কোন ক্রীতদাসের মত আমি আনুগত্যের অঙ্গীকার করবো।”
“হে আল্লাহর বান্দারা আমি আমার ও তোমাদের প্রতিপালকের কাছে আশ্রয় চাই তোমরা না আবার আমাকে পাথর নিক্ষেপ করো। হিসাবের দিবসকে যে বিশ্বাস করেনা এমন অহংকারীর (অনিষ্ট) থেকে আমি আমার ও তোমাদের রবের কাছে আশ্রয় চাই।”
“তিনি যখন জিজ্ঞাসিবেন রোজ হাশরে সামনে মোর, 
প্রশ্নে খোদার তোমাদের এ পাপের হবে কী উত্তর?”
এটুকু বলে তিনি সওয়ারী (বাহনের পশু)-কে বসালেন এবং সেখান থেকে অবতরণ করলেন। কুফাবাসীরা তাঁর দিকে এগিয়ে আসলো। 
তাদের গতি দেখে যুহাইর ইবনে কাইন সশস্ত্র ঘোড়সওয়ার হয়ে এগিয়ে আসলেন এবং দুশমনদের সামনে তেজোদ্দীপ্ত কণ্ঠে বলতে লাগলেন,
“হে কুফা বাসী, আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করো, এক মুসলমানের উপর এটা কর্তব্য, যেন সে অপর মুসলিম ভাইকে সদুপদেশ দেয়। এখনও পর্যন্ত আমরা ভাই ভাই এবং এক দ্বীন ও অভিন্ন মিল্লাতে প্রতিষ্ঠিত । যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের ও তোমাদের মধ্যে তলোয়ার না চলে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের নসীহত করার অধিকার আমাদের আছে। যখন তলোয়ার চালাচালি হয়ে যাবে, তখন এ সম্বন্ধ টুটে যাবে। তখন আমরা একটি দল, আর তোমরা অপর একটি দল। শোনো, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা আমাদের ও তোমাদেরকে তাঁর প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) এর আওলাদের ব্যাপারে এক মহাপরীক্ষায় অবতীর্ণ করেছেন। তিনি দেখছেন, আমরাও তোমরা তাঁদের সাথে কী আচরণ করছি। আমরা তোমাদেরকে আওলাদে রাসূলের সাহায্য সহযোগিতা করতে এবং অবাধ্যের সন্তান অবাধ্য ইবনে যিয়াদ ও ইয়াযীদের সঙ্গ ছাড়তে আহবান জানাচ্ছি। কেননা তাদের উভয়ের কাছ থেকে অন্যায় ছাড়া তোমাদের আর কিছু হাসিল হবেনা। এরা তোমাদের চোখে তপ্ত শলাকা ঢুকিয়ে দেবে, হাত-পা কেটে লুলো-খোঁড়া বানিয়ে রাখবে,তোমাদের লাশ খেজুরের ঢালে লটকিয়ে রাখবে। হাজর বিন আদী সহচরদের এবং হানী ইবনে উরওয়ার মত তোমাদের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যা করবে।”
এ বক্তব্য শোনার পর কুফা বাসীরা যুহাইর ইবনে কাইনকে গালমন্দ করল এবং ইবনে যিয়াদের প্রশংসা ও তার জন্য দু'আ করে বলতে লাগলো,
“খোদার কসম, আমরা এখান থেকে এক পা পিছু হটবোনা, যতক্ষণ না তোমাদের অগ্রনায়ক (হোসাইন) ও তার সঙ্গীদের কতল করি; অথবা তাদেরকে কয়েদী বানিয়ে ইবনে যিয়াদের হাতে সোপর্দ না করি । যুহাইর বললেন, ”হে খোদার বান্দারা, 
হযরত ফাতেমার (রাদিঃ) সন্তান ইবনে সামিয়ার তুলনায় মুহাব্বত ও সাহায্য সহযোগিতা পাওয়ার অধিকতর হকদার। তোমরা যদি তাঁদের সাহায্য সহযোগিতা করতে না পার, আল্লাহর ওয়াস্তে অন্তত: তাদের হত্যা করতে চেয়ো না।” তাঁদের বিষয়টি তাঁদের ও তাঁদের পিতব্যজাত ইয়াযিদের মাঝে ছেড়ে দাও। আমাকে নিজ প্রাণের শপথ দিয়ে বলছি, ইয়াযীদ তোমাদের আনুগত্য দেখে হুসাইনকে কতল করা ছাড়াও সন্তুষ্ট হবে। (অর্থাৎ এটা আমি দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় থেকেই বলছি)
এ কথা শুনে শিমার যুহাইরের উদ্দেশ্যে এক তীর ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “ব্যস, এবার চুপ রও, খোদা তোমার মুখ বন্ধ করে দিন, তুমি এতক্ষণ যাবৎ বক বক করে আমাদের মগজ চেটেছো।” 
যুহাইর উত্তরে বললেন, “এ্যাই বাওয়ালের পুত, আমি তোমার সাথে কথা বলছিনা, তুমিতো একটা আস্ত জানোয়ার, আল্লাহর শপথ তুমিতো কুরআনের দুটি বোঝারও ক্ষমতা রাখোনা,
কাজেই হাশর দিনের লাঞ্ছনা ও যন্ত্রনাকর শাস্তির সুসংবাদ তোমাকে আলিঙ্গন জানাচ্ছে।” শিমার বলল, “খোদা তোমার ও তোমার সঙ্গীর এই মূহূর্তেই মৃত্যু ঘটাবেন।” যুহাইর বললেন, "তুমি কি আমাকে মৃত্যুর ভয় দেখাচ্ছো? খোদার কসম! হুসাইনের পক্ষে জীবন দেয়া তোমাদের সাথে থেকে চিরদিন বেঁচে থাকার চাইতে অনেক পছন্দনীয়”। অতঃপর উচ্চস্বরে ইয়াযীদের সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বললেন, "সমবেত জনতা, এসব পাষণ্ড, অত্যাচারীদের ধোঁকায় পড়ে নিজদের দ্বীনধর্ম বরবাদ করে দিওনা! খোদার কসম, যারা হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এর সন্তান- সন্তুতি ও পরিবার -পরিজনের রক্ত ঝরাবে, আর সহযোগিতাকারীদের এবং তাঁদের মর্যাদার পক্ষে লড়াইকারীদের হত্যা করবে, তারা সেই প্রিয় নবীর সুপারিশ থেকে বঞ্ছিত থাকবে। 
“হুসাইন ইবনে আলীর জীবন চলিষ্ণু রূপ কুরআনের, 
এই ভবেতে নিশান নবীর, তাঁর সে স্বরূপ সন্ধানের।”
ইমামে আলী মকাম যুহাইরকে ডেকে ফিরিয়ে নিলেন।

পরবর্তী পর্ব - 
শিক্ষনীয় বিষয় :

Comments

Popular posts from this blog

শুধু মুখে কলেমা পড়লে জান্নাত যাওয়া যাবেনা

মসনবী শরীফ বই - মউলানা রুমী (রহঃ)