কারবালা – ২৩
শামে কারবালা - (পর্ব- ২৩)
কারবালার ইতিহাস
ইমাম মুসলিমের দুই পুত্ৰের কাহিনি– ৪
মধ্যরাত। বড়ভাই মুহাম্মদ বিন মুসলিম স্বপ্ন দেখে বিচলিত ভাবে জেগে উঠল। ছোট ভাই ইবরাহীমকে জাগিয়ে তুলে বলল, “ভাইটি আমার! এটা ঘুমোবার সময় নয়। উঠে তৈরী হয়ে নাও, আমাদের সময় একদম ফুরিয়ে এসেছে। এখনই আমি স্বপ্নে দেখলাম। দৃশ্যটা এরকম- আমাদের আব্বাজান, রাসুলাল্লাহ্ সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম, হযরত আলী, হযরত ফাতেমা যাহরা এবং হযরত হাসান মুজতাবা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এর সাথে বেহেস্তে পায়চারী করছেন। হঠাৎ রাসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) আমরা দু'জনকে দেখে আব্বাজানকে বললেন, মুসলিম, তুমি চলে এলে আর বাচ্চা দুটিকে জালিমদের মাঝে রেখেই এলে? আমাদের দিকে তাকিয়ে আব্বাজান বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) আমার ছেলেরা তো আসছেই।
স্বপ্নের বিবরণ শুনেই ছোট ভাই বড়জনের মুখে মুখ লাগিয়ে বলে উঠল !”হায়রে মুসীবত! হায়রে আব্বা!”: আর কান্না শুরু করে দিল। বড় ভাইয়ের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল। গভীর বেদনায় আর্তনাদ ও চিৎকার দিয়ে কাঁদতে লাগল। তাদের চিৎকার ক্রন্দনের আওয়াজে দূর্মতি হারেসের ঘুম ভেঙ্গে গেল। বিবিকে জিজ্ঞেস করল, “এটা কাদের কান্নার আওয়াজ? আমার ঘরে এরা কারা যারা এভাবে কাঁদছে?” স্ত্রী বেচারী ভয় পেয়ে গেল। কোন উত্তর দিতে পারলনা। ঐ জালিম নিজেই উঠে বাতি জালাল। যে কামরা থেকে কান্নার শব্দ আসছিল, সেদিকেই এগিয়ে গেল। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখল, দুটি বাচ্চা গলাগলি করে 'আব্বা' 'আব্বা' করে অস্থির হয়ে কাঁদছে। জিজ্ঞেস করল, “তোমরা কারা?” যেহেতু তারা বুঝেই নিয়েছিল যে, এটা একজন ভক্তের ঘর, বিপদে পরম আশ্রয় এবং গৃহবাসীরা আমাদের পরম হিতৈষী। কাজেই না ভেবেই সাফ বলে দিল, “আমরা মুসলিম ইবনে আকীলের সন্তান।” হারেস বলল, “অদ্ভুত! আমিতো সারা দিন তোমাদের খুঁজতে খুঁজতে হয়রান। এমনকি আমার ঘোড়াটারও দম ফুরিয়ে গেল। আর তোমরা আমারই ঘরে" একথা শুনে এবং জালিমের হাবভাব দেখে তারা ভয়ে এতটুকু হয়ে গেল, পেরেশানীর প্রতিচ্ছবি যেন। মহিলা যখন স্বামীর এমন পাষণ্ডতা আর নির্মমতা দেখলেন, তখন তার পায়ে মাথা রেখে কাকুতি মিনতিসহ কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “পরদেশী এই অসহায় এতিমদের প্রতি একটু দয়া করুন।
“এতিম শিশু, একটু খানি দাও আশ্রয়,
সম্মানিত এঁদের প্রতি হও সদয়।
দুইটি শিশু বিরহী, খুব যন্ত্রণায়,
বিজন দেশে অনাথ তারা, নেই সহায় ।
তাদের মারার চিন্তাটা দাও দুর করে,
অভিশাপের ভয় করো হে অন্তরে।
দূরাচার বলতে লাগল, “খবরদার, প্রাণের মায়া থাকে তো একদম চুপ! নিরুপায় মহিলা চুপ করে থাকেন। হারেস দরজায় তালা লাগিয়ে দিল যাতে স্ত্রী-তাদের অন্যত্র সরিয়ে নিতে না পারে। ভোর হতেই পাষণ্ড তলোয়ার হাতে নিল। শিশু দু'টিকে নিয়ে বের হল। স্ত্রী দৃশ্য দেখে স্থির থাকতে পারলেন না। খালি পায়ে পেছনে পেছনে দৌড়াতে লাগলেন আর অনুনয় বিনয় করে বলতে লাগলেন, “স্বামী, আল্লাহকে ভয় করুন, এতিম শিশুর প্রতি দয়া করুন ।
“আঁধার চিরে প্রভাত আলো ফুটল চারিদিক,
চললো জালিম হেঁচড়ে তাদের বেহুঁশ দিকবিদিক।
পূণ্যবতী কলজে চেরা চেঁচিয়ে দৌঁড়ায়,
মেরো না, হে জালিম, এরা এতীম অসহায়।
কাফনপরা মা ফাতিমার কান্না শোনা যায়,
বাঁচতে দাও এই পুষ্প দুটি নবীর বাগিচায়”।
স্ত্রীর বুকফাটা কান্না জালিম হারেসের মনে দাগ কাটতে পারলনা। বরং তাঁকেও মারতে দৌড়ল। বেচারী নিরুপায় হয়ে থেমে গেল। দুরাচার হারেসের একটা গৃহভৃত্য ছিল, যে তার স্ত্রীর দুধ পান করেছিল। সে যখন ঘটনা বুঝতে পারল, তখন পিছু দৌড়াতে লাগল। যখন হারেসের নিকট পৌঁছল, তখন হারেস তাকে বলল,, “ছেলে দুটিকে কেউ আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার আশংকা আছে। তাহলে বিরাট পুরস্কার থেকে আমি বঞ্চিত হয়ে যাব। কাজেই এই নাও তরবারী, এদেরকে এখনই খতম করে দাও।” গোলাম বলল, “আমি নিষ্পাপ দুটি শিশুকে কী করে হত্যা করব?” হারেস কঠোর হয়ে বলল, “যা বলছি তা-ই কর।” সে অস্বীকার করল।
“এদিক কিংবা ওদিক বলা বান্দার নেই হক
মুনিব যখন আছে দাসে করে কি বকবক?”
বলল, “তাদের হত্যা করার দুঃসাহস আমার নেই। রাসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) এর পবিত্র আত্মার কাছে বড়ই লজ্জাবোধ হচ্ছে। তাঁরই খান্দানের দুটি নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করে কাল কিয়ামতের দিন কোন মুখ নিয়ে আমি তার সামনে দাঁড়াব?” হারেস ক্রোধোম্মত্ত হয়ে বলল, “যদি তুই তাদের কতল করতে না চাস তো আমিই তোকে কতল করছি।” সে বলল, “আমাকে হত্যা করার আগে আমি তোমার খেল খতম করে দেব।” হারেস ছিল যুদ্ধ বিদ্যায় পারঙ্গম রণকুশলী। আচানক আগবাড়িয়ে সে গোলামটির মাথার চুল ঝাপটে ধরল। গোলাম ও তার দাড়ি টেনে ধরল। গড়াগড়ি করে উভয়ে বিশ্রী রকম দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হল। শেষ দিকে জালিম তার গোলামকে গুরুতর জখম করে ধরাশায়ী করে দিল। ইত্যবসরে তার স্ত্রী ও পুত্র দুইজনই এসে হাজির। তার পুত্র তাকে বলল, “বাবা, এ গোলাম তো আমার দুধভাই। তাকে এভাবে মারতে তোমার এতটুকু লজ্জা হল না?” পাপিষ্ট তার পুত্রের কথায় কান দিল না। রাগের মাথায় গোলামের উপর এমন এক আঘাত করে বসল যাতে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করে তার আত্মা বেহেস্তে উড়াল দিল। তখন বেটা তার বাপকে বলল, “বাবা, তোমার চেয়ে পাষাণদিল আর দুরাচার আর কাউকে তো আমি দেখিনি।” “হারেস বলল, ” মুখ বন্ধ কর বেটা, এই নে তলোয়ার, আর এ বাচ্চা দুটিকে খতম কর।” ছেলে বলল, “খোদার কসম, এ কাজ আমি কখনো করবনা। আর তোমাকে ও তা করতে দেবনা।” হারেসের বিবি আবার ও অনুনয় করল। “এই নির্দোষ বাচ্চা দুটির খুনের দায় নিজের মাথায় নেবেন না। যদি তাদের ছেড়েই না দেবেন, তবে এতটুকু তো মানুন, তাদের খুনে নিজ হাত রঞ্জিত করবেন না। নেহায়েত যদি নাই ছেড়ে দেন অন্তত ইবনে যিয়াদের কাছে তাদেরকে জ্যান্ত নিয়ে যান। উদ্দেশ্য তো সেভাবেও পূরণ হতে পারে।” সে বলল, “আমার আশংকা হচ্ছে যে, যখনই কুফাবাসী এদের দেখবে, তখন হৈ হট্টগোল করে তাদেরকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবে। তখন তো আমার পরিশ্রম বৃথা।” পরিশেষে ঐ পাষণ্ড খোলা তরবারী উদ্যত করে রাসুল কাননের পুষ্প দুটিকে নিধন করতে তাদের দিকে এগিয়ে আসল।
“সামনে যখন দেখলো তারা জালিম দুরাচার,
দুই এতিমের মাথায় খোলা, চকচকে তরবার।
ভয় পেয়ে খুব হটতে থাকে, বলতে থাকে আর,
“নির্দোষে তো দয়া কর, এতিম যে লাচার।
ছোট্ট শিশু নির্যাতিত, নাই যে কেউ সহায়”,
জালিম বলে, 'চুপ করো, মোর কাজ কি সে দয়ায়।”
সে মূহুর্তে বিবি দৌড়ে এসে মাঝখানে দাঁড়িয়ে যান। বলতে থাকেন, “হে যালিম -আল্লাহকে ভয় কর, আখিরাতের আযাবকে ভয় কর।” ঐ জালিম স্ত্রীকেও আঘাত করে বসল। মারাত্মক জখম হয়ে পূণ্যবতী স্ত্রী ঢলে পড়লেন আর ছটফট করতে থাকেন। রক্তাক্ত দেহে মাকে ধুলায় লুটোপুটি খেতে দেখে ছেলেটি ছুটে আসে। বাপের হাত চেপে ধরে সে বলে উঠল, “বাবা, হুঁশে ফিরে আস, তোমার কী হয়ে গেল?” ঐ পাষণ্ড তার ছেলেকেও এক আঘাতে মৃত্যুর বিছানায় চিরতরে শুইয়ে দিল। মা যখন দেখলেন, তার চোখের সামনেই প্রিয়তম পুত্র নিজ পিতার তলোয়ারেই নিহত হয়ে গেল, তখন মায়ের মন সে দৃশ্য সহ্য করতে পারল না। প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে হৃদ ক্রিয়া বন্ধ হয়ে সে পূণ্যাত্মা রমনীও বেহেশতের যাত্রী হয়ে গেলেন।
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments
Post a Comment