কারবালা – ৬৩
কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৬৩)
📚শামে কারবালা
যেভাবে একের পর এক শহীদ হলেন – ৭
হযরত আকীল রাদি.'র পুত্রগণ—
হযরত জা'ফর ইবনে আকীল যখন নিজ ভাইপোকে ধুলো ও রক্তে লুটোপুটি খেতে দেখলেন, তখন অশ্রুভেজা নয়নে এগিয়ে আসলেন ও ইমামে পাককে সালাম করে অনুমতি চাইলেন। ইমাম পাক তাঁকেও বুকে টেনে নিলেন এবং অনুমতি দিলেন।
হযরত জা'ফর “রাজ্য” (যুদ্ধকালীন বীরত্ববঞ্জক কবিতা) পড়তে পড়তে যুদ্ধের ময়দানে আসলেন। আবুল মানাখির ঐ কবিতার তর্জমা করেছেন এভাবে,
“আকীলেরই নয়নমণি,আমি হোসাইন অন্ত-প্ৰাণ,
নেইকো ত্রুটি, কলুষতা, এমনি সে পাক দিল ও জান।
বাদশাহ্ তনয় বাদশাহ্ ও ফের হৃদয়নিধি মোর চাচার,
দুইভূবনের আলো নবীর চোখ জুড়ানো সত্তা যাঁর।
শেরে খোদার পুত্র হোসাইন এমনি গৃহে তাঁর লালন,
জিব্রাঈল আমীন গুটায় ডানা, বেহেশতেরই সেই কানন।”
তিনি (জাফর বিন আকীল) লড়তে শুরু করলেন। বীরত্বের প্রদর্শন এমনভাবে করলেন যে, অনেক ইয়াযিদীদের জাহান্নামে পাঠিয়ে ছাড়লেন । একপর্যায়ে দুশমনেরা চতুর্দিক থেকে ঘিরে, তীরের বৃষ্টি শুরু করলে আকীল পুত্র নিজ রক্তে রঙ্গিন হয়ে শেষ পর্যন্ত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমরা খাসআমীর তীর বিদ্ধ হয়ে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করলেন।
হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আকীল যখন নিজের ভাইয়ের এহেন করুণ পরিণতি দেখলেন, তখন স্থির থাকতে পারলেন না। সিংহের মত রণক্ষেত্রে লাফিয়ে পড়লেন। এমন বাহাদুরীর চমক দেখালেন যে, নরাধমদের রক্তে যুদ্ধের ময়দান রক্তস্নাত বইতে দেখলেন, তখন তাঁর চোখে পৃথিবী অন্ধকার মনে হলো, এদিকে প্রিয় ভাই ইমামে পাকের খেদমত করার আগ্রহ রক্তের মতো শিরায় দাপাদাপি করছিল। এগিয়ে এসে আরজ করলেন, “আপনার দু'টি প্রান-প্রিয় যোদ্ধা ভাই শাহাদাতের গর্বিত পোশাক গায়ে চড়িয়ে চলে গেলেন, তেমন একটি আমার জন্যও বরাদ্দ হোক, কেননা আমিও তো আপনার ভাই!” ইমামে পাক বললেন, “তুমিতো আমার মর্যাদার মুকুট, যাও ভাই, কাউসার থেকেই তোমার পিপাসা মিটিয়ে নাও। আমিও তোমার পাশে এসে পড়ছি।” হযরত ওসমান ইবনে আকিল ইমামে পাকের অনুমতি নিয়ে ময়দানে আসলেন এবং নিম্নোক্ত ভাবার্থের কবিতা আওড়ালেন,
“ওসমান এই আসলো রণে ডান হতে তার মুক্ত কৃপাণ,
পণ করেছি ভাইয়ের সনে রক্তে তোদের করবো যে স্নান,
হতচ্ছাড়া গোলাম যত হুসাইন পরে চালায় অসি,
ইনসাফ যেই বুকটি জুড়ে একটি নীতি যায়নি খসি।
শাহাদাতের প্রভাত হাঁকে, আসলো আমার ঊষার ঘড়ি,
ক্রমান্বয়ে ভরবে নেশায়, বিলায় যেটা বেহেশ্ত্-পরী।“
এরপর মরনপণ লড়াই করলেন। এমন প্রচন্ড হামলা চালালেন যে, ঘোড়সওয়ারদের ঘোড়ার পিঠে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়ল। পদাতিকরা তো পেছনে পড়ে রইলো। অবশেষে রণক্লান্ত সৈনিক আঘাতে জর্জরিত হয়ে খোলী ইবনে ইয়াযীদ আছবাহীর হাতে শাহাদাতের পেয়ালা পান করে চির শান্তির কাননে রওয়ানা হয়ে গেলেন। (রাদি.)
অতঃপর ইমাম পাকের চতুর্থ ভাই হযরত জাফর ইবনে আলী (রাদি.) খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করলেন, এখন উৎসর্গের জন্য আমিই তো হকদার।” ইমামে পাক তাঁর দিকে এক নজর দেখলেন। বললেন, “ভাইটি আমার, বীরত্বের দীপ্তি তো তোমার কপালে চমক দিচ্ছে। কিন্তু বিশাল বাহিনীর সাথে একাকী লড়তে গিয়ে কেউই তো ফিরে আসেনি। এজন্যে এটাই উত্তম হবে যে, মল্লযুদ্ধ ডেকে একেক জনের সাথে লড়ে যাওয়া।”
হযরত জাফর বললেন, “ ভাইয়া যে মনমগজে জীবন বাজি আর প্রান পণ করার ঔৎসুক্য, তাতে সংখ্যায় কম বেশী প্রশ্ন তো অবান্তর। এখন তো ফিরে আসার কথা নয়; বরং আপনার জন্য জীবন উৎসর্গ করে জান্নাতুল ফিরদাওসে আব্বা জানের নিকট পৌঁছারই আকুলতা। ইমামে পাক তাঁকে বুকে টেনে নিলেন এবং অনেকক্ষণ কান্না করলেন। হযরত আব্বাস ছাড়া ইনিই ছিলেন সর্বশেষ ভাই, যিনি বিদায় নিচ্ছেন। ইমামে পাক থেকে অনুমতি নিয়ে ময়দানে আসলেন। বীরত্বের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে অবশেষে বেহেশতের পথে পাড়ি জমালেন। (রাদি.)
পরবর্তী পর্ব–
যেভাবে একের পর এক শহীদ হলেন – ৮

Comments
Post a Comment