কারবালা – ২৫
শামে কারবালা - (পর্ব- ২৫)
কারবালার ইতিহাস
ইমামে আলী-মাকাম'র যাত্রা (পর্ব– ১)
পূর্বে বর্ণিত হয়েছিল যে, কুফাবাসীর চিঠিপত্র এবং প্রতিনিধি বৃন্দের আগমনের পরেই ইমামে আলী মাকাম হযরত মুসলিম ইবনে আকীল কে অবস্থা পর্যবেক্ষনের জন্য কুফা পাঠিয়েছিলেন। তিনি কুফাবাসীর সীমাহীন ভক্তি মহব্বত দেখে ইমামে আলী মাকামের খেদমতে লিখে দিলেন যে, সহস্র লোক ইতোমধ্যেই আমার হাতে বাইআত নিয়ে ফেলেছে, আর এখানকার অধিবাসীরা আপনার শুভাগমনের জন্য অধীর প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে আছেন। অতএব আপনি অবিলম্বেই চলে আসুন।
ইমামে আলী মাকাম এ সংবাদ পাওয়ার পর কুফা যাওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর হলেন। এদিকে কুফায় যে পট-পরিবর্তন সূচিত হয়েছে সে ব্যাপারে তিনি অবহিত হননি। মক্কাবাসীরা যখন তার প্রস্তুতির কথা জানতে পারলেন,তখন তাঁরা তাঁর কুফায় যাওয়া পছন্দ করলেন না। কেননা তাঁরা কুফাবাসীর বিশ্বাসঘাতকতা ও অকৃতজ্ঞতার কথা ভালভাবেই জানতেন। তাঁদের এটাও জানা ছিল যে, কুফীরা হযরত আলী ও হাসান (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-র সাথে কী আচরণ করেছিল। কাজেই তাঁরা ইমামাকে কঠোর ভাবে বাঁধা দিলেন।
সর্বপ্রথম তাঁর সমীপে উমর বিন আবদুর রহমান মাখযুমী হাজির হয়ে আরজ করলেন, “আমি জানতে পেরেছি যে, আপনি নাকি কুফায় যাচ্ছেন। এ জন্যে আপনার খেদমতে শুধু হিত কামনার উদ্দেশ্যেই হাজির হয়েছি। যদি অনুমতি পাই তো, কিছু আরজ করব”। তিনি বললেন “হ্যাঁ, বলুন”। আপনারা তো সত্যিই সমব্যথী এবং আকৃত্রিম সুহৃদ।” তাঁরা আরজ করলেন, “আপনি এমন একটি শহরে যেতে মানাস্থ করেছেন, যেখানে ঐ হুকুমতের আমীর ওমরা এবং কর্মচারীরা রয়েছে, যার কবজায় রয়েছে রাজকোষ। আর আপনি এটাও অবগত যে, সাধারণ প্রজারা হচ্ছে দিরহাম ও দীনার (টাকা)-এর গোলাম। এজন্যই আমার সংশায় হচ্ছে যে, যারা আপনাকে আহবান করেছে এবং আপনাকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারাই মাল ও দৌলতের লালসায় উল্টো আপনার বিরুদ্ধে লড়তে আসবে। কাজেই আপনি কুফায় যাবেন না।” ইমামে আলী মাকাম তাদের সমবেদনামূলক পরামর্শের জন্য কৃতজ্ঞতা জানালেন এবং তাঁদের জন্য দোআ করলেন।
✍🏼ইবনে আছীর,১৫/৪, আরাবী ২১৫/৬
এরপার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) এসে বল্লেন, “ভাই, মানুষ বলাবলি করছে, আপনি নাকি কুফা রওয়ানা হচ্ছেন? কথাটা কি সাত্য? “তিনি উত্তর দিলেন, “জী হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ, আমি দু'এক দিনের মধ্যেই রওয়ানা হব।” ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন, “আপনাকে আল্লাহর দোহাই দিচ্ছি এমনটি করবেন না। অবশ্য কুফাবাসীরা যদি বর্তমান শাসকের নিয়োজিত গভর্ণরকে কতল এবং শত্রুদের সেখান থেকে বিতাড়িত করতেন এবং পরিস্থিতির উপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকতো তবে আপনার যাতায়াতের সিদ্ধান্ত সঠিক হতো, কিন্তু তারা আপনাকে এমন অবস্থায় আহবান করেছে, পূর্বের আমীর তাদের মাঝে বহাল, হুকুমতও প্রতিষ্ঠিত, সরকারী কর্মাচারীরা যথারীতি ট্যাক্সও আদায় করছে। কাজেই আপনি নিশ্চিত জেনে রাখুন, তারা আপনাকে শুধু যুদ্ধ বিগ্রহের জন্যই ডেকে নিচ্ছে। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, এই আহবানকারীরা আপনার সাথে প্রতারণা করবে, আপনার প্রতি মিথ্যারোপ করবে, অসহায় অবস্থায় আপনাকে পরিত্যাগ করবে এবং ক্ষমতসীনাদের সাথে মিলে আপনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে। এভাবে ক্রমে আরা চরম শত্রুতায় লিপ্ত হবে।” তখন ইমাম পাকের মুখে উচ্চারিত হলো, “ফাইন্নী আস্তাখীরুল্লাহা ওয়া আনযুরু মা ইয়াকুনু” অর্থাৎ আমি আল্লাহর নিকট কল্যাণের প্রত্যাশা করবো, আর দেখবো, কী হতে যাচ্ছে”।
✍🏼ইবনে আসীর ১৫/৪, ত্ববারী ২১৬/৬)
তাঁদের পর হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে যুবাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) এগিয়ে আসলেন, জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার সিদ্ধান্ত কি?” ইমাম উত্তর করলেন, “আমি কুফা যেতে চাচ্ছি, কারণ কুফার মান্যগণ্য ব্যক্তিগণ এবং আমার শুভাকাংখীরা আমাকে আহবান করেছেন। আল্লাহর কাছে আমি ভালোটা চাই।” ইবনে যুবাইর বলেন, 'আপনার শুভার্থীদের মতো সেখানে আমারও কোন দল থাকতো, তবে আমিও নিশ্চয় যেতাম।” আবার ইবনে যুবাইরের খেয়াল হলো যে, আমার কথায় ইমামের মধ্যে আমারই সম্পর্কে কোন সন্দেহ কিংবা কোন খারাপ ধারণা না আবার সৃষ্টি হয়ে যায়, তাই আবার বললেন, “আপনি যদি হেজাযে থেকেই খেলাফত হাসিলের চেষ্টা করেন তো, আমরা সবাই আপনার নিকট বাইআত (আনুগত্য প্রকাশ) করবো। আর আপনাকে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা দেবো এবং সবরকম সহযোগিতা ও আন্তরিকতা দেবো।”
ইমাম বললেন, আমি আমার বুযুর্গ আব্বাজান থেকে শুনেছি যে, মক্কা মুকাররামায় এক অসুরের উদ্ভব হবে, যে মক্কা শরীফের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করে দেবে। আমি চাইনা যে, ঐ অসুর আমিই হয়ে যাব।” মোট কথা ইবনে যুবাইর অনেক পীড়াপীড়ি করলেন, যাতে তিনি হেরমে মক্কাতেই থেকে যান এবং তাঁর সমস্ত কাজ ইবনে যুবাইর সমাধা করে দেবেন। ইমামে আলী মাকাম বললেন, “আমার কাছে হেরেমের বাহিরে কতল হওয়া হেরমের ভেতর কতল হওয়া থেকে অধিকতর পছন্দনীয়”।
মোট কথা তিনিও কোনমতেই হেরমে থাকতে উদ্যোগী হলেন না।
✍🏻ইবনে আসীর ১৫/৪,ত্ববরী ২১৬/৬)
ঐদিন সন্ধ্যায় কিংবা পরদিন সকালে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) আসলেন এবং বললেন, “ভাই, আমি ধৈয্যধারণ করতেই চাই, কিন্তু পারছিনে। কারণ, আপনার এ যাত্রাতে আমি আশংকাগ্রস্থ। ইরাকের লোকেরা এক অকৃতজ্ঞ জাতি। আপনি তাদের কাছে কখনোই যাবেন না; বরং আপনি এ শহরেই অবস্থান করুন। আপনি হেযাযবাসীর কর্ণধার। ইরাক বাসীরা যদি তাদের মহব্বতের দাবীতে সৎ হয়ে থাকে এবং বাস্তবিকই আপনাকে প্রত্যাশা করে, তবে আপনি তাদের লিখে দিন যে, প্রথমে তারা গভর্ণর এবং দুশমনদের শহর থেকে বের করে দিক; এরপর আপনি যান। কিন্তু আপনি যদি নিবৃত্ত না হন এবং এখান থেকে চলে যাওয়া নিতান্তই জরুরী বোধ করেন, তবে আপনি ইয়েমেন চলে যান। আর তা হচ্ছে দীর্ঘ এবং প্রশস্ত একটি অঞ্চল। কিল্লাহ্ (দূর্গ) এবং পাহাড় ঘেরা। সেখানে আপনার আব্বাজানের অনুরক্তরাও আছেন। স্বতন্ত্র অবস্থানে থেকে মানুষের কাছে নিজ পয়গাম পৌঁছে দেবেন। আশা করা যায় যে, এ প্রক্রিয়ায় আপনি নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে নিজ উদ্দেশ্যে সফলতা অর্জন করতে পারবেন।"
ইমামে আলী মাকাম বললেন, “আল্লাহর শপথ, আমি নিশ্চিত যে, আপনি আমার একজন দরদী ও হিতাকাংখী। কিন্তু এখন তো আমি যাবার জন্য বদ্ধ পরিকর”।
ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন, “আচ্ছা যেতেই যদি হয়, তবে মেয়েদের এবং বাচ্চাদের সঙ্গে নিবেন না। আমার ভয় হচ্ছে হযরত ওসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)'র মত স্ত্রী-পুত্রদের সামনেই না আপনাকে কতল করে দেয়া হয়।” অতঃপর বললেন, “আপনি ইবনে যুবাইর এর জন্য ময়দান খালি করে দিয়ে তাঁর চক্ষু শীতল করছেন।” আপনি থাকতে কেউ তাঁর দিকে ভ্রুক্ষেপ করার অবকাশ পেতনা। এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর শপথ, যদি আমি এটা বুঝতাম যে, আমি আপনার সাথে সাথে হাতাহাতিতে লিপ্ত হই, এমনকি আমার আপনার তামাশা দেখতে লোক জড়ো হয়ে যায়, আর এতে আপনি আমার কথা রক্ষা করতেন, তবে আমি সেটাও করে ছাড়তাম।” যেহেতু নিয়তি আর অদৃষ্টের বিধিমালা চুড়ান্তই (কার্যকর) হয়ে গেছে, আল্লাহর যা ইচ্ছা সেটাই বাস্তবায়ন হবে। কাজেই হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর প্রচেষ্টাও ব্যর্থ প্রমাণিত হল, শেষতক তিনিও উঠে চলে গেলেন।
অতঃপর হযরত আবু বকর ইবনে হারেস উপস্থিত হলেন এবং আরজ করলেন,“আপনার সম্মানিত আব্বাজান খেলাফতের মসনদে ছিলেন, মুসলমানদের প্রায় তাঁর প্রতিই আকৃষ্ট ছিল এবং তাঁর নির্দেশের প্রতি ছিল অবনত মস্তকও। এত প্রভাব-প্রতিপত্তি সত্ত্বেও যখন তিনি মুয়াবিয়ার মোকাবেলায় অবতীর্ণ হলেন, তখন জাগতিক লোভলালসায় মানুষ গুলো তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করল, শুধু যে সঙ্গ পরিত্যাগ করল তাই নয়, বরং তাঁর ঘোর বিরোধী হয়ে পড়ল। আল্লাহর ইচ্ছারই বাস্তবায়ন ঘটলো। তাঁর পরে আপনার ভায়ের সাথে ইরাকীরা যা করল, তাও আপনি জানেন। এতসব অভিজ্ঞতার পরে আপনি নিজ পিতা এবং নিজের ভায়ের দুশমনদের কাছে এ আশা নিয়ে যাচ্ছেন যে, তারা আপনার সাথে থাকবে। নিশ্চিত জেনে রাখুন, ইরাকীরা দুনিয়ার লোভে এবং সম্পদের মোহে পড়ে আপনার সঙ্গ ত্যাগ করবে। এসব দুনিয়ার কুত্তারা খুব তাড়াতাড়ি আপনার শত্রুদের সাথে হাত মেলাবে। আপনার ভালবাসা ও সাহায্যের দাবীদাররাই আপনারা দুশমন সাব্যস্থ হবে।”
✍🏼মুরাওওয়াজুয যাহর-কৃত মাসাউদী পৃ.১৩৪/৫
আবু বকর ইবনে হারেসের জোরালো বক্তব্য ও তাঁর দৃঢ় প্রত্যায় ও সিদ্ধান্তের কোন নড়া-চড়া আনতে পারলোনা। আর তিনি বালালোনা, “হ্যাঁ, আল্লাহর ইচ্ছাই পূর্ন হয়ে থাকবে।” মোটকথা তাঁর আরও কিছু শুভাকাংখীরা বাধা দিয়েছিলেন; কিন্তু তারা ও বিফল হলেন। এভাবে তাঁর দৃঢ় ইচ্ছার মধ্যে কোন পরিবর্তন আসলোনা। এমনি ভাবে ৬০ হিজরীর যিলহজ্ব মাসে আহলে বাইতে নবুয়তের কাফেলা মক্কা মুকাররামা হতে রওয়ানা হলেন এবং যখন মুহাম্মদ (বিন হানাফিয়া) এর নিকট তাঁর ভাই হুসাইনের কারবালা রওয়ানা হওয়ার সংবাদ পৌছল, তখন তিনি এতটাই কেঁদেছেন যে, তাঁর সামনে রাখা অজুর পাত্রটা চোখের পানিতে ভরে যায়।
✍🏻নুরুল আবছার পৃ-১১৫
———————
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা
---

Comments
Post a Comment