কারবালা – ৬০



কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৬০)

📚শামে কারবালা

****************

যেভাবে একের পর এক শহীদ হলেন – ৪

অতঃপর শিমার বহুসংখ্যক একটি সৈন্যদল নিয়ে যশঃগীতি পড়তে পড়তে অহংকারী ও দাম্ভিক উচ্চারণ মুখে নিয়ে ইমামে পাকের দিকে এগুতে থাকল। ইমামে পাকের সাথে যে কয়জন নিবেদিত প্রান সঙ্গী তখনও অবশিষ্ট ছিলেন, তাঁরা দেখলেন যে, এ বিশাল সৈন্যদলের মোকাবেলায় তাঁরা বেশীক্ষণ টিকে থাকতে পারবেন না। ফলে তাঁরা এ সিদ্ধান্ত নিলে যে, ইমামে পাকের উপর কোনো সঙ্গীন অবস্থা আসার আগে একে একে সকলেই তাঁর নিরাপত্তার স্বার্থে জীবনপাত করে দিবেন। সে অনুযায়ী একে একে পতঙ্গসম সব অনুরক্ত ইমামতের আলোকপিড হযরত হুসাইনের জন্য কুরবান হতে লাগলেন। সবার আগে আব্দুল্লাহ্ এবং আব্দুর রহমান ইবনে আযরা আলগিফারী তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে শত্রুর মোকাবেলায় লিপ্ত হলেন। এরপর জওয়ান সাইফ ইবনে হারেস ও মালেক ইবনে আব্দ আসলেন। এরা দু'জন পরস্পর চাচাত ভাই অথচ একই মায়ের উদর জাত। ময়দানের দিকে যাওয়ার সময় দু'জন অশ্রুপাত করছিলেন। তাঁদের কাঁদতে দেখে ইমামে পাক জিজ্ঞেস করলেন,” প্রিয় ভাইপো'রা, তোমরা কাঁদছো কেন? খোদার কসম এইতো কিছুক্ষণ পরেই তোমরা আনন্দচিত্ত হয়ে আমার চোখ জুড়াবে।” তারা আরজ করলেন, “আমরা আপনার জন্য কুরবান; নিজেদের জানের মায়ায় আমরা কাঁদছি না; বরং আপনারই কথা ভেবে আমাদের কান্না আসছে। কেননা আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, দুশমনেরা আপনাকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। অথচ তাদের প্রতিহত করার ক্ষমতা আমাদের নেই।” তিনি বললেন, “বাছারা, আল্লাহ্ তোমাদের মুত্তাকীদের মত উত্তম বিনিময় দান করুন, যেহেতু তোমরা আমার অবস্থা দৃষ্টে দুঃখিত হয়েছা এবং সমবেদনা প্রকাশ করছো। (আমীন)”


ইত্যবসরে হানযালা ইবনে আসআদ আশশিয়ামী ইমামে পাকের সামনে এসে দাঁড়িয়ে যান এবং চিৎকার করে করে বলতে লাগলেন, হে জনগোষ্ঠি, আমার আশংকা হচ্ছে যে, তোমাদের উপর খন্দকের দিনের মত এবং নূহ, আদ ও সামূদ সম্প্রদায়ের মত আর তাদের পরবর্তী দলগুলোর মত আযাব নাযিল হবে কিনা। আল্লাহ্ তা'লা বান্দাদের জন্য অবিচার পছন্দ করেন না । হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা, তোমাদের জন্য রোজ কিয়ামতে আমার ভয় হচ্ছে, যে দিন তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালাতে থাকবে, কেউ তোমাদের আল্লাহ্ পাকড়াও থেকে বাচাতে পারবে না, আল্লাহ্ যাকে গোমরাহ করবেন, তাকে হেদায়ত করার কেউ নেই। হে আমার কত্তমের মানুষেরা, হযরত হুসাইনকে কতল করো না, আবার পরিস্থিতি এমন না হয় যে, আল্লাহ্ তোমাদের উপর আযাব নাযিল করে তেমাদের ধংস করে দেবেন। অপবাদ রটনাকারী সবর্দা ব্যর্থই হয়ে থাকে।” ইমামে পাক বললেন, “আল্লাহ্ তা'লা তোমায় রহম করুন। এ লোকগুলো নিজের উপর আযাবকে তো ঐ সময়েই অপরিহার্য করে নিয়েছিল, যখন তারা সত্যের দিকে আমার আহবানকে প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছিল, আর এখন এরা আমাদের সবাইকে খতম করে দেওয়ার জন্য ময়দানেই এসে গিয়েছে। আর তারা তোমাদের পূণ্যবান ভাইদেরকে কতলই করে দিয়েছে। এখন এরা কিভাবে (সুপথে ফিরে আসবে? কাজেই এখন এদেরকে বুঝানো নিরর্থক।” হানযালা বললেন, “আমি আপনার জন্য উৎসর্গ, আপনি সত্যিই বলেছেন। এখন আমায় অনুমতি দিন, যাতে আমিও আমার ওই ভাইদের সাথে গিয়ে মিলতে পারি।” তিনি বললেন, “যাও ঐ অনন্ত জীবনে, যা দুনিয়া ও তার সব কিছুর চাইতে উত্তম। হানযালা বললেন, “আসসালামু আলাইকা ইয়া আবা আবদিল্লাহ্, আপনার ও আপনার আহলে বাইতের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে দরূদ ও সালাম, আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে বেহেশতে মিলিত করবেন। ” ইমামে পাক এ কথার উপর দু'বার 'আমিন' বললেন। হানযালা অগ্রসর হলেন, বীরের লড়াই লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে গেলেন। 

এরপর সাইফ ও মালেক দু'জনই 'আসসালামু আলাইকা ইয়া ইবনা রাসুলিল্লাহ্' বলে এগিয়ে গেলেন। ইমাম বললেন, 'ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ্' তারাও উভয়ে লড়াই করতে করতে জীবন উৎসর্গ করে দিলেন। 

এরপর আবেস ইবনে আবী শাবীব শাকেরী তাঁর আযাদকৃত গোলাম শওযবকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কী ইচ্ছা? উত্তরে শওযব বললেন, “ইচ্ছে তো এটাই যে, ফাতেমা বিনতে রাসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এর সন্তানের পক্ষে তাঁর দুশমনদের সাথে যুদ্ধ করতে করতে প্রাণ দিয়ে দিই।” আবেস বললেন, “তোমাদের কাছে আমি এটাই আশা করছিলাম, এসো, আবু আবদিল্লাহ্ হুসাইনকে সালাম জানিয়ে অনুমতি চেয়ে নাও। আজকের দিনটি হচ্ছে ঐ দিন, যাতে আমাদের দ্বারা যতটুকু সম্ভব সওয়াব লুটে নেওয়া যায়। আজকের পর এমন পূণ্য কাজের সুযোগ আর মিলবে না। শওযব ইমামে পাককে সালাম করলেন এবং এগিয়ে গিয়ে লড়াই শুরু করলেন। এক পর্যায়ে তিনিও শহীদ হয়ে গেলেন। 

এরপর আবেস সালাম করে ইমামের কাছে আরজ করলেন, “ইয়া আবা আবদিল্লাহ্! খোদার কসম, এ বিশ্বভ্রহ্মান্ডে আমার কাছে আপনার চেয়ে প্রিয় আর কেউ নেই। কিন্তু হায়! আমি আমার জান দিয়ে হলেও আপনাকে এ দুশমনদের হাত থেকে যদি বাচাতে পারতাম!” এই বলে তিনি খাপ থেকে তলোয়ার টেনে নিলেন এবং দুশমনের দিকে অগ্রসর হলেন। ইনি বীরত্ব ও শৌর্যে বীর্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন। রবী' ইবনে তমীম তাঁকে চিনতে পেরেও নিজ সঙ্গীদের বলল, “এ লোকটি রণাঙ্গনের সিংহশার্দুল! খরবদার তোমাদের কেউ একা তার সাথে কখনো লড়তে যেওনা।” আবেস হুংকার দিয়ে উঠলেন, “আছ কি কেউ? যে আমার সাথে লড়তে আসবে? “শত্রুদের কারো সাহস হচ্ছিলনা। ইবনে সা'দ বলল, “সকলে সম্মিলিত ভাবে পাথর ছুঁড়তে থাক।" নির্দেশমাত্র চারদিক থেকে তাঁর উপর পাথর আসতে লাগল। তিনি তাদের এ কাপুরুষতা দেখে নিজের বর্মও শিরস্ত্রান খুলে ফেলে দিলেন এবং সর্বশক্তি নিয়ে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তারা ভীত হয়ে পালাতে লাগল। আর তিনি আক্রমন করতে করতে তাদের সারির অভ্যন্তরেই ঢুকে পড়লেন, শত্রুদের ছত্রভঙ্গ অবস্থা সৃষ্টি করলেন।


আবেস যদিও অত্যন্ত বীর বাহাদুর ছিলেন, কিন্তু সহস্র সৈন্যের মোকাবেলায় একাই একাকী কতক্ষণবা লড়তে পারবেন। শেষ দিকে শত্রুরা তাকে ক্রমশঃ ঘেরাও করে ফেলল। বেষ্টনী দিয়ে চারদিক থেকে একযোগে হামলা করে অবশেষে তাঁকে শহীদ করে দিল।


পরবর্তী পর্ব–

যেভাবে একের পর এক শহীদ হলেন – ৫

Comments

Popular posts from this blog

শুধু মুখে কলেমা পড়লে জান্নাত যাওয়া যাবেনা

মসনবী শরীফ বই - মউলানা রুমী (রহঃ)