কারবালা – ৭২
কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৭২)
📚শামে কারবালা
তাজেদারে কারবালা সাইয়িদুনা
ইমাম হুসাইন (রদিয়াল্লাহু আনহু)– ৪
শাহাদাতের পরের কিছু ঘঠনা–
শামসীর হাতে দুশমন খাড়া, কেউবা রয়েছেন সিজদায় পড়া কারবালা বলে “রক্তিম ধরা, এই সিজদা কি খেল্ বুঝে ওরা?”
প্রাণপ্রিয় বোন সাইয়িদা যয়নব এ প্রলয়ঙ্করী দৃশ্য দেখে তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসলেন। আর্তনাদ করতে করতে তিনি ছুটে আসলেন। বলতে লাগলেন, “হায়রে প্রাণধিক ভাই আমার! হায় আমাদের কর্ণধার। আসমান ছিঁড়ে যদি মাটিতে পড়তো!”
সেই মুহুর্তে ইবনে সা'দ ইমামের পাশেই দাঁড়ানো ছিল। তাকে দেখে সাইয়িদা বলে উঠলেন, “আমর বিন সা'দ, ইমাম আবু আবদুল্লাহ (হুসাইন) এর হত্যাকান্ডের এ দৃশ্য তুমি উপভোগ করছ?”
ইবনে সা'দের চোখে দুনিয়ার চাকচিক্যের মোহ ও লোভের আবরণ পড়ে গিয়েছিল। তবে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল বলেই সাইয়িদা যয়নবের এ বুকফাটা আর্তনাদ আর এ মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে এ পাষাণেরও চোখ ফেটে পানির ধারা দু’গন্ড বেয়ে নেমে আসল। লজ্জায় এতটুকু হয়ে সাইয়িদার দিক থেকে সে চোখ ফিরিয়ে নিল। (✍🏼তাবরী ২৫৯/৬)
চির-অভাগা খোলী ইবনে ইয়াযীদ হযরত ইমাম পাকের নুরানী শির মোবারক পবিত্র দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে এগিয়ে আসল। কিন্তু ভয়ে তার হাত কেঁপে উঠল। কম্পিত দেহে সে পেছনে হটে গেল। তার ভাই কুলাঙ্গার হাশাল বিন ইয়াযীদ ঘোড়া থেকে নেমে শির মোবারককে দেহ মোবারক থেকে বিচ্ছিন্ন করে তার ভাই খোলীর হাতে অর্পন করল। কেউ বলেছেন, শিমার ছিল শ্বেতী রোগ বিশিষ্ট। সেই হতভাগ্যই শির মোবারক কেটে নিয়েছিল। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছিলেন, "আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, এক ডোরাকাটা কুকুর আমার আহলে বাইতের পবিত্র রক্তে মুখ দিচ্ছে।” হযরত ইমাম জা'ফর সাদেক (রাদি.) বলেন, “সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা পঞ্চাশ বছর পরে প্রকাশ পেল, যখন শ্বেতীরোগী শিমার যুল জওশন ইমামে পাকের রক্ত বইয়েছিল।" হযরত মুহাম্মদ বিন ওমর বিন হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আমি কারবালায় হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহ্ আনহুর সাথে ছিলাম। তিনি শিমারকে দেখে বললেন, “আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুল সত্য, রাসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়সাল্লাম) এরশাদ করেছেন “যে, আমি এক ডোরা কাটা কুকুরকে আমার আহলে বাইতের পবিত্র রক্তে মুখ দিতে দেখেছি।” সাইয়িদা যয়নব (রাদিয়াল্লাহু আনহা) দৌড়ে প্রিয় ভায়ের দিকে অগ্রসর হলেন।
দিশেহারা ছুটতে গিয়ে পড়েন বুঝি এই,
অযুত সেনায় যয়নবের আজ কুচ পরোয়া নেই।
সৈন্যরা যে রাখলো ঘিরে ইমামের ওই লাশ,
চেঁচিয়ে বলেন, “পথ করে দাও, যাবো ভায়ের পাশ।
ফাতিমার এ পুত্র, আমি কন্যা যাত্রার,
প্রিয় ভাইকে দেখবো আমি, এই দেখা শেষবার।
ওই যায় তো চলে, নিয়ে কাটা শির,
বিনা শিরে পবিত্র ধড় কী তড়পথ অস্থির!
শত্রু খোদার আনন্দেতে ফেরে ঢোল,
'আলীর বেটা শহীদ হল' পড়ে তো শোর গোল।
আলীর বাগান উজাড় আজি, বসতি হয় লোপাট,
এ প্রবাসে ভায়ের শোকে বোন যে মরণ ঘাট।
হঠাৎ দেখে যয়নবে ওই ভাই ইমামের ধড়,
ঝাপটে ধরে ভয়ের লাশে কাঁদে নিরন্তর।
লাশের পরে ঝুঁকে কাঁদে বিরহী যয়নব,
“তোমার কথাই পূর্ণ, আমার ব্যর্থ হল সব।
আর্তি ছাড়া ভাগ্যে আমার আর কিছু না রয়,
শহীদ হলে তুমিই মোরা সবে নিরাশ্রয়।”
'তাযকেরায়ে সিবতে ইবনে জোযী'তে রয়েছে, ইমামের পবিত্র দেহে ৩৩ (তেত্রিশ)টি বর্শার জখম, ৪০ (চল্লিশ)টি তরবারির জখম এবং তাঁর পিরহান (জামা) শরীফে ১২১ (একশ' একুশ) টি তীরের ফুটো (ছিদ্র) ছিল।
আসমানে ওই কাঁপন জাগে, আন্দোলিত এই যমীন,
এর আগে কী ঘটেছিল, সে বর্ণনা খুব কঠিন।
বেহায়া, বদনসীব পাষণ্ডেরা খুলে নিল তাঁর পবিত্র দেহের সবগুলো কাপড়। সম্পূর্ণ নিরাবরণ করে ফেলল মুসলিম জাহানের শ্রদ্ধেয় ইমামকে। মস্তকবিহীন দেহ মোবারক থেকে তাঁর জুব্বা শরীফ কায়েস বিন মুহাম্মদ বিন আশআস নিয়ে ফেলল। বাহর বিন কা'ব নিল পায়জামা। আসওয়াদ বিন খালেদ জুতো জোড়া খুলে নিল। আমর বিন ইয়াযীদ নিল পাগড়ী মোবারক, চাদর মোবারক নিল ইয়াযীদ বিন শোবল, সিনান ইবনে আবস
নখয়ী বর্ম আর আংটি লুঠে নিল। বনু নহশলের জনৈক ব্যক্তি তরবারী নিয়ে ফেলল, যা পরবর্তীতে হাবীব ইবনে বদীল'র বংশে আনীত হয়। এতটা যুলুম অনাচার করার পরও সিরিয়া ও কুফার পাষন্ড খুনীদের হিংসা বিদ্বেশের আক্রোষ মেটেনি। চির দুর্ভাগারা ইমামের পবিত্র শরীরের উপর ঘোড়া দৌড়িয়ে তাঁকে ছিন্ন-ভিন্ন করে ফেলে। এ পাশবিক উম্মত্ততার পর ইয়াযিদী দস্যুরা পর্দানশীন পবিত্র মহিলাদের তাঁবুতে প্রবেশ করে, আহলে বাইতের যাবতীয় মালামাল লুঠ করে নেয়। (✍🏼তাবরী)
এ পাশাবিকতা ও বর্বরতায় প্রকম্পিত হল যমীন, আল্লাহর আরশ দুলে উঠল, আকাশ বাতাস রক্তাশ্রু বর্ষণ করল, জড় বৃক্ষ, তরু-লতা থেকে ক্রন্দন ও বিলাপের আতধ্বনি উচ্চকিত হল।
আহলে বাইতে পাকের প্রতি ঘৃণ্য তোদের এ আচরণ
খোদার লা'নত তোদের প্রতিই আহলে বাইতের হে দুশমন।
কারবালার এ বিজন মাঠে যুলুম অত্যাচারের মরুঝড় বয়ে গেল, গুলশানে মুস্তফা (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এর পুষ্প কলিরা টর্ণেডোর বলি হয়ে গেল, লুণ্ঠিত হল আলীর ঘর বাড়ী, উৎপাটিত হল যাত্রার সজীব কানন। দলিত মথিত করা হল প্রিয় নবীর এ সাজানো কুঞ্জ। পরদেশের অচিন পরিবেশে শিশুরা হয়ে গেল ইয়াতীম, বিধবার শ্বেতবাস নিলেন সম্ভ্রান্ত বিবিগণ। বিশ্ব মুসলিমের পরম শ্রদ্ধেয়রা আজ বরণ করলেন করুণ বন্দী দশা। ৬১ হিজরীর ১০ মুহররম পবিত্র জুমা'র দিন সংঘটিত হল এ মর্মান্তিক ঘটনা। সেদিন ইমাম পাকের বয়স ছিল ৫৬ বছর ৫ মাস ৫দিন। সত্যানুরাগীদের অহংকার, সেই প্ৰাণপণ যোদ্ধা সেদিন মাতামহের সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছিলেন। সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে আপনজনদের নিয়ে এমন দৃঢ় চিত্তে নিজ প্রাণ আল্লাহর পথে উৎসর্গ করেছিলেন যে, যার কোন নজীর পাওয়া যাবেনা।
এমনি নজীর রেখে গেলেন ইমাম হুসাইন হাশর তক, ভুলবে না সে এই অবদান, সর্বদা যে খুঁজবে হক।
(প্রথম খন্ডের এখানে সমাপ্তি)
পরবর্তী পর্ব
শাহাদত পরবর্তী ঘটনাসমূহ

Comments
Post a Comment