কারবালা – ৫৭
কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৫৭)
📚শামে কারবালা
যেভাবে একের পর এক শহীদ হলেন – ১
তারা সবাই ইমামবাহিনীর কাছে পৌছে তীরের বৃষ্টি ছুঁড়তে লাগল। অল্প সময়ে ইমামে পাকের সহযোগীদের সবগুলি ঘোড়াকে আহত করে দিল। ইমামের মরন-পণ সঙ্গীদের আত্মপ্রত্যয়ে এতে সামান্য ভাটা পড়ল না, তাঁরা ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন। এর পর অনেক দীর্ঘ সময় ধরে পদাতিক অবস্থাতেই তারা এমন বীর বিক্রমে ও প্রানপণে লড়তে থাকলেন যে, কুফা পক্ষীয়দের নাকানি-চুবানি খাইয়ে দিলেন।
আইয়ূব ইবনে মাশরাহ আল খাইওয়ানী বলাবলি করত যে, “খোদার কসম! হুর বিন ইয়াযীদের ঘোড়ায় আমার তীর লেগেছিল, যা ওটার কণ্ঠনালীতে বিদ্ধ হয়ে গেল। কাঁপতে কাঁপতে ঘোড়া লুটিয়ে পড়ল। আর হুর! সে ঘোড়ার পিঠ থেকে বাঘের মত লাফ দিয়ে ময়দানে এসে পড়ল। আর নাঙ্গা তলোয়ার উদ্যত করে এ শেএর আওরাতে শুরু করল–
“আমার ঘোড়াকে যদিও বা তোমরা ঘায়েল করে অচল করে দিয়েছ, (তো কী হয়েছে) আমি স্বাধীনচেতা, বাঘের চেয়েও ভয়ঙ্কর সাহসী ।
আইয়ূব বিন মাশরাহের বর্ণনায় এও রয়েছে যে, “আমি হুরের মত এমন অসি চালনা করতে কাউকে দেখিনি,” প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, এমনতর প্রচন্ড যুদ্ধ সম্ভবত আর কোথাও হয়নি, যা কারবালার ময়দানে হুসাইনী ও ইয়াযীদিদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল।
ইমামে পাক নিজেদের তাঁবু গুলো এমন বিন্যাসে গেঁড়েছিলেন এবং পরস্পর বেঁধেছিলেন, যাতে কুফাপক্ষীয়রা একটি মাত্র দিক ছাড়া অন্য কোন দিক থেকে হামলা করতে পারছিল না। এ অবস্থা দেখে ইবনে সা'দ নিৰ্দেশ দিল যে, তাঁবু গুলো উপড়ে ফেলো, যাতে চতুর্দিক থেকে আক্রমন করা যায় । নির্দেশ মত যখন কুফাবাহিনী তাঁবু উপড়াতে এগিয়ে এল, তখন ইমামে পাকের কিছু নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীরা তাঁবুগুলোর অভ্যন্তরে এসে পড়লেন, আর তাঁবুর দিকে আগত, তাঁবু উপড়ানোরত এবং লুটতরাজকারীদের তীর- তরবারী নিয়ে প্রতিহত ও বিনাশ করতে লাগলেন। ইবনে সা'দ এ পর্যায়েও নিজ সৈন্যদের ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যর্থতা দেখতে পেয়ে নির্দেশ দিল যে, “তাঁবু গুলো জ্বালিয়ে দাও।” নির্দেশ পাওয়ামাত্র আগুন লাগিয়ে দেয়া হল । আগুনে তাঁবু গুলো পুড়তে লাগল। ইমামে পাক তা দেখে বললেন, “ওগুলো জ্বালাতে দাও, এ অবস্থায়ও এরা চতুর্দিকে থেকে হামলা করতে পারবে না ।
কেননা প্রথম দিকে তাঁবু গুলো প্রতিবন্ধক হয়েছিল, আর এখন আগুন । বস্তুতঃ তাই হল। আগুন প্রতিবন্ধক হওয়ায় ওরা আর পেছন দিক থেকে হামলা করতে পারছিল না। অভিশপ্ত শিমার ইমামের খাস তাঁবু যা, অপরাপর তাঁবুগুলো থেকে আলাদা ছিল, যেখানে মহিলা ও শিশুরা অবস্থান করছিলেন, তাতে বল্লমের আঘাত করতে করতে তার সাথীদের বলছিল, ‘আগুন নাও, আমি এ তাঁবু এবং এর অভ্যন্তরে যারা আছে তাদের জ্বালিয়ে দেব।” তাঁবুর মহিলারা একথা শুনে হাউ মাউ করে বেরিয়ে পড়লেন।
ইমামে পাক যখন এ অবস্থা দেখলেন, তখন বললেন, “রে যুল-জওশনের - পুত্র,তুই আমার আহলে বাইতকে আগুনে জ্বালাতে চাইছিস, খোদা তোকে জাহান্নামের আগুনে জ্বালাবেন। শিমারের সঙ্গীদের মধ্যে হামিদ বিন মুসলিম ও শাবছ বিন রিবঈ তাতে বাধা দিল বরং তার আত্মমর্যাদায় ঘা দিয়ে বলল, “তোমার মত বীর পূরুষের জন্য মহিলাদের সাথে এমন আচরন করা নিতান্ত লজ্জাষ্কর। খোদার কসম, তোমাদের পক্ষে শুধুর পুরুষদের কতল করাই তোমাদের আমীরকে খুশী করার জন্য যথেষ্ট।” তাদের কথায় শিমার তার মত পরিবর্তন করে ফিরে দাড়াল। শিমার ফিরে দাঁড়াতেই যুহাইর ইবনে কাইন দশজন সঙ্গীদের নিয়ে তার উপর এবং তার সঙ্গীদের উপর হামলা করলেন। আবু ইয্য আদ দ্বারাবীকে মেরে তাঁবু থেকে দূরে হটে যেতে বাধ্য করলেন।
ইত্যবসরে আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমাইর কালবী ইয়াযীদের বাহিনীর সাথে প্রচন্ড যুদ্ধে লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে গেলেন। তাঁর বিবি দৌড়ে লাশ মোবারকের নিকট আসলেন। শিয়রে বসে চেহারা থেকে রক্ত ধুলো ময়লা ইত্যাদি পরিস্কার করতে করতে বলছিলেন, “তোমার বেহেস্ত যাত্রা শুভ হোক।” পাপিষ্ট শিমার বাক্যটা শুনে ক্ষোভে ফেটে পড়ল। সে স্বীয় গোলাম রুস্তমকে ডেকে বলল, “এই বেটীর মাথায় লোহার ডান্ডা মার।” গোলাম তাঁর কথামত এক ঘা বসাতেই পূন্যাত্মা বিবির মাথা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। আর সেই মুহুর্তেই সে নিজ স্বামীর কাছে বেহেশতী ঠিকানায় পৌঁছে গেল।
কবির ভাষায়–
“জান্নাতের ওই কুসুম কানন ভর ফাগুনে হাসছে কী!
প্রেমের বলি শহীদানের বরাত গুলো আসছে কি?”
পরবর্তী পর্ব–
যেভাবে একের পর এক শহীদ হলেন – ২

Comments
Post a Comment