কারবালা – ৩৯
কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৩৯)
📚শামে কারবালা
📚শামে কারবালা
আমর বিন্ সা’দ এর নেতৃত্বে বাহিনী—
এদিকে তো ইমামে পাকের কাফেলা বিজন মরুতে কারবালার যমীনে তাঁবু খাটাচ্ছিলেন, আর ঐদিকে ইয়াযীদী হুকুমত এই পবিত্র আত্মাসমূহের প্রতি প্রলয়যজ্ঞ চালাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুতিতে মশগুল। প্রস্তুতি মোতাবিক পরদিনই আমর বিন সা'দ চারহাজার সৈন্য নিয়ে মোকাবেলা করার জন্য কুফা থেকে এখানে এসে পৌঁছে।
আমর এর পরিচয়:—
হুযুরে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর বিশিষ্ট সাহাবী, ঐতিহাসিক ইরানবিজেতা আশারায়ে মুবাশশারাহ (বেহেস্তের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ জন) এর অন্যতম হযরত সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস (রাদিঃ) এর পুত্রই হচ্ছে এই আমর বিন সা'দ। তবে আফসোস, দুনিয়াবী মালসম্পদের লোভ-লালসা ও পার্থিব মর্যাদার উদগ্র বাসনা এই বদনসীবকে ধংস করে দেয়।
মন্দ পরিণামের প্রেক্ষাপট এভাবে তৈরী হয় যে, এই সময়ে কুর্দিরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে দম্ভাবতা অঞ্চলে আক্রমণ করে বসেছিল। ইবনে যিয়াদ তখন আমর বিন সা'দকে ‘রায়’ এর গভর্ণর বানিয়ে চার হাজার সিপাহী নিয়ে কুর্দীদের দমন করতে নির্দেশ দিয়েছিল। নির্দেশ, মত আমর বিন সা'দ চার হাজার সৈন্যসহ রওনা হয়। ইত্যবসরে সে 'হাম্মামে আইয়ান নামক স্থানে এসে পৌছলে, তখনই ইমাম হোসাইন (রাদিঃ) এর ব্যাপারে ইবনে যিয়াদের এমন একজন সেনাপতির দরকার পড়ে যে ইমামের মোকাবেলা করবে। যে ভাবা অমনি সে আমর বিন সা'দ কে পুনরায় ডেকে পাঠায়। যখন সে ইবনে যিয়াদের কাছে আসে, তখন ইবনে যিয়াদ জরুরী নির্দেশ দেয়, এই মূহুর্তে প্রথমে হুসাইনের মোকাবিলা করো, এরপর গভর্ণর পদে যোগদান করে অন্য কাজ সমাধা করবে। “ইবনে সা'দ বলল, আল্লাহ্ আপনার প্রতি রহম করুন, আমাকে এ কাজ থেকে রেহাই দিন।” ইবনে যিয়াদ বলল, “হ্যাঁ রেহাই এভাবেই দেওয়া যায়, এর শাসনভার ছেড়ে দাও, আমার দেয়া নিয়োগ পত্র ফেরত দিয়ে দাও।” ইবনে সা'দ এই দুটি প্রস্তাবের মধ্যে একটি বেছে নিতে এক দিনের সময় চাইলে ইবনে যিয়াদ তাকে একদিনের সময় দেয়। ইবনে সা'দ এই বিষয়ে নিজের বন্ধু-বান্ধবদের কাছে পরামর্শ চাইল। সবাই ইমামের মোকাবিলা করতে নিষেধই করলো। ইবনে সা'দ এর ভাগ্নে হামযা বিন মগীরা শো'বা যখন তা জানতে পারল, তখন সে উপস্থিত হয়ে বলল– “মামাজান, আমি আপনাকে আল্লাহর দোহাই দিচ্ছি, হোসাইনের মোকাবিলায় গিয়ে আল্লাহর না ফরমানী এবং রক্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার অপরাধে জড়াবেন না। খোদার কসম, যদি আপনাকে আপনার পৃথিবী, মাল সম্পদ, এমনকি সমগ্র দুনিয়ার রাজত্ব থেকেও বের করে দেয়া হয়, তথাপিও সেটা কি এরচেয়ে উত্তম নয় যে, আপনি হুসাইনের রক্তে রঞ্জিত অবস্থায় আল্লাহর সমীপে উপস্থিত হবেন?”
(অর্থাৎ এ অবস্থায় আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার চাইতে সমগ্র দুনিয়ার বাদশাহী পরিত্যাগ করা ঢের ভালো)
['রায়' এলাকাটি হল- খোরাসানের একটি শহর, বর্তমানে যা ইরানের রাজধানী শহর 'তেহরান' রূপে বিদ্যমান।]
ইবনে সা'দ বললো, “ইনশাআল্লাহ, আমি (তোমার পরামর্শ অনুযায়ী) সেটাই করবো।” (✍🏼ত্বাবরী ২৩৩, ✍🏼ইবনে আসীর ২১/৪)
ইবনে সা'দ রাতভর এ বিষয়ে ভাবতে লাগল এবং আবৃত্তি করতে থাকল,
“রায়ের তখত ছাড়বো কিনা যার মোহে আজ অন্ধ প্ৰায়,
হোসাইন খুনের কলঙ্ক হোক তবু বুঝি চাইব রায়!
হোসাইন খুনে মিলবে জানি নির্ঘাত সেই জাহান্নাম,
টানছে আবার, রাজক্ষমতা, রায়ের রূপে চোখ জুড়ায়।” (✍🏼ইবনে আসীর ২২/৪)
আব্দুল্লাহ ইবনে ইয়াসার আল জুহানী বর্ণনা করেন, “যখন আমর বিন সা'দ হুসাইন (রাদিঃ) এর বিরুদ্ধে অভিযানের নির্দেশ পায়, তখনই আমি তার কাছে যাই। সে আমাকে জানাল, “আমীর আমাকে হুসাইনের বিরুদ্ধে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল; কিন্তু আমি তা প্রত্যাখ্যান করেছি।” আমি তাকে বললাম, 'আল্লাহ তায়ালা তোমাকে দিয়ে খুব ভাল কাজ করিয়েছেন। আল্লাহ তোমাকে উত্তম নির্দেশনা দিন, তুমি এটা কক্ষনো করবেনা। হুসাইনের মোকাবিলায় কোন অবস্থাতেই যাবেনা।” এটা বলে আমি তার কাছ থেকে চলে আসি। পরে কেউ এসে আমাকে জানাল, ইবনে সা'দ তো হুসাইনের বিরুদ্ধে মানুষদের উত্তেজিত করছে। এটা শুনে আমি পুনরায় তার কাছে যাই। কিন্তু সে আমাকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আমি বুঝতে পারলাম যে, এখন সে হুসাইনের মোকাবিলায় যেতে মন স্থির করে ফেলেছে। আমি (হতাশ চিত্তে) ফিরে আসলাম ।(✍🏼ত্বাবরী ২৩২/৬)
ইবনে সা'দ ইবনে যিয়াদের নিকট এসে বলল, “আপনি আমার জন্য রায়ের হুকুমত লিখে দিয়েছেন। লোকেরাও তা জেনে গেছে। কাজেই ওই নির্দেশনামা এখন কার্যকর করুন। হুসাইনের বিরুদ্ধে অভিযানে আমার সাথে কুফার অমুক অমুক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পাঠান।” ইবনে যিয়াদ বলল, “আমি আমার ইচ্ছা পূরণে তোমার কোন হুকুম পালনে মোটেও বাধ্য নই যে, যাকে তুমি বলবে তাকেই সঙ্গে পাঠাব। যদি তুমি আমার সৈন্যদের নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাক তো বল, নয়তো (রায় সংক্রান্ত) আমার নির্দেশনামা ফেরত দাও।” ইবনে সা'দ বলল, “ঠিক আছে, আমি যেতে প্রস্তুত।” (✍🏼ইবনে আসীর ২২/৪)
অতঃপর ৬১ হিজরীর ৩রা মুহাররাম ইবনে সা'দ চারহাজার সৈন্যসমেত ইমামে পাকের বিরুদ্ধে কারবালায় এসে পৌঁছে।
পরবর্তী পর্ব–
শিক্ষনীয় বিষয়
শিক্ষনীয় বিষয়

Comments
Post a Comment