কারবালা – ৪৫
কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৪৫)
📚শামে কারবালা
📚শামে কারবালা
সহযাত্রীদের উদ্দেশ্যে ইমামের ভাষণ ও জবাব
এর পর ইমামে পাক নিজের সফরসঙ্গীদের জড়ো করলেন। ইমামের প্রিয়পুত্র সাইয়িদুনা আলী আওসাত হযরত যয়নুল আবেদীন (রাদিঃ) বর্ননা করেন, “আমি তাঁর নিকট গিয়ে বসলাম, উদ্দেশ্যে ছিলো- আব্বাজান কী বলেন, তা ভালো করে শুনবো। অথচ আমি ছিলাম অসুস্থ। তিনি তাঁর সফরসঙ্গীদের উদ্দেশ্যে খুতবা | দিলেন,
“আমি আল্লাহর প্রশংসা করছি, আনন্দিত কিংবা বেদনাগ্রস্থ উভয় অবস্থায়। আল্লাহর সর্বোত্তম হামদ ও সানা, হে আল্লাহ আমি আপনার প্রশংসা করছি, আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, আপনি আমাদের নবী প্রেরণের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন, আপনি আমাদেরকে শোনার জন্য কান দিয়েছেন, দেখার জন্য চোখ দিয়েছেন, আরো দিয়েছেন অন্তরসমূহ, কুরআন শিখিয়েছেন, দ্বীনের উপলদ্ধি দান করেছেন, অতঃপর (আমার সঙ্গীরা)!
আমি আমার সঙ্গীদের চাইতে কারো সঙ্গীদেরকে বেশী বিশ্বস্ত আর উত্তম মনে করিনা। আমার আহলে বাইত তথা পরিবার বর্গের চাইতে কারো পরিবারবর্গকে বেশী সৎকর্মপরায়ন এবং আত্মীয়তাসচেতন বলে মনে করি না। আল্লাহ্ তা'য়ালা তোমাদের সবাইকে আমার পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান নসীব করুন। শুনেরাখো, আমার স্থির বিশ্বাস যে, আমাদের এ সময় কাল থেকে দুশমনদের মোকাবিলায় (শুরু হবে)। আমি তোমাদের খুশী মনে অনুমতি দিচ্ছি। তোমরা রাতের অন্ধকারেই (নিরাপদ স্থানে) চলে যাও, আমার পক্ষ থেকে তার কোন সমালোচনা হবেনা। একটি করে উট নিয়ে নাও, তোমরা এক এক জন আমার আহলে বায়তের এক এক জনের হাত ধরে সঙ্গে নিয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা তোমাদের সবাইকে উৎকৃষ্ট বদলা দেবেন। পরে তোমাদের আপন আপন শহর বা গ্রামে চলে যাবে। এক সময় আল্লাহ তা'য়ালা মুসীবত সহজ করে দেবেন। নিঃসন্দেহে এ (শত্রু)রা আমাকেই শুধু হত্যা করতে চায়। আমাকে কতল করতে পারলে এদের আর কাউকে প্রয়োজন নেই।” (✍🏻ইবনে আসীর ২৪/৪, ✍🏻ত্বাবরী ২৩৮/৬)
সহযাত্রীদের প্রত্যুত্তর—
ঐ ভাষণ শোনার পর ইমামের ভাইপো, ভাগ্নেবৃন্দ সমস্বরে বলে উঠলেন, “আমরা কি শুধু এ উদ্দেশ্যেই চলে যাবো যে, আপনার পরে আমাদের বেঁচে থাকতে হবে? ঐ দিন যেন আল্লাহ্ আমাদের না দেখান।”
ইমামে পাক আকীলের সন্তানদের উদ্দেশ্যে বললেন, “মুসলিমের শাহাদৎ তোমাদের জন্য যথেষ্ট, কাজেই আমি তোমাদের অনুমতি দিচ্ছি, তোমরা চলে যাও।" তেজদীপ্ত স্বমহিমাধন্য ভায়েরা বললেন, “আমরা মানুষদের কী জবাব দেব? নিজ সর্দার, নিজ মুনিব, নিজেদের সর্বোত্তম ভাইটিকে আমরা শত্রুদের কবলে রেখে চলে এসেছি? এটাও কি হয় যে, আমরা তাঁর সহযোগী হয়ে একটি তীর চালাইনি, না একটা বর্শা নিক্ষেপ, না তলোয়ারের একটি আঘাত এবং জানতেও পারবনা (শত্রু আক্রান্ত) অসহায় ভাইটির কী পরিণাম হলো? খোদার কসম ! আমরা কখনো এমনটি করবনা! বরং আমরা নিজেদের জান মাল, পরিবার-পরিজন সবকিছু আপনার চরণে উৎসর্গ করবো। আপনার সাথে মিলে আপনার দুশমনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো । যে পরিণাম আপনার হবে, সেটা আমাদেরও হবে। আল্লাহ্ যেন আমাদের সেই জীবন না দেন, যাতে আপনার পরেও বেঁচে থাকতে হয়।
হযরত মুসলিম বিন আওসাজা আলআসাদী দাঁড়িয়ে বললেন, “আমরা আপনাকে রেখে যদি চলে যাই, আপনার প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালার কাছে আমরা কী জবাব দেব? খোদার কসম! আমি ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার সঙ্গ ছাড়বোনা, যতক্ষণ না দুশমনের বুকে আমার এ বর্শা নিক্ষেপ করি এবং তলোয়ার না চালাই। খোদার কসম, যদি আমার হাতে কোন অস্ত্রই না থাকে, তবুও আমি দুশমনদের বিরুদ্ধে পাথর মেরে হলেও যুদ্ধ করতাম। এভাবেই আমি আপনার চরণে উৎসর্গ হয়ে যেতাম।” (✍🏼ইবনে আসীর ২৪/৪)
হযরত সা'দ বিন আবদুল্লাহ্ হানাফী উঠে বললেন, “খোদার কসম, আমরা ঐ পর্যন্ত আপনার সঙ্গ ত্যাগ করব না, যতক্ষণ না আল্লাহ্ তা'য়ালা এটা দেখে নেন যে, আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) উনার পরে তাঁর আওলাদে পাককে কীরূপে হেফাযত করেছি। খোদার কসম, যদি আমার এটাও জানা হয় যে, আমাকে সত্তরবার এভাবে কতল করা হবে যে, প্রত্যেক বারই জীবন্ত জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আমার ভষ্ম বাতাসে ছড়িয়ে দেয়া হয়। তথাপিও আমি আপনার সঙ্গ ছাড়বোনা। আর এখন তো একটিবার মাত্র মৃত্যুবরণ করা যে মৃত্যুতে রয়েছে অনন্তকালের সম্মান ও মর্যাদা। তবে ওটাকে কেন আমি হাসিল করবনা?”
(✍🏼তাবরী-২৩৯/৬)
হযরত যুহাইর বিন কায়েন উঠে বললেন, “খোদার কসম, আমি তো এটাই চাই যে, “আমাকে কতল করা হোক, আবার জিন্দা করা হোক। আবারও কতল করা হোক, আবারও জিন্দা করা হোক, এভাবে সহস্রবার জিন্দা করে সহস্রবার কতল করা হোক আর আমার সহস্রবার কতল হওয়ার বিনিময়ে আল্লাহ্ আপনার পবিত্র সত্তা এবং আপনার আহলে বায়তের নওজোয়ানদের বাঁচিয়ে রাখতেন। (তবেই উত্তম)।
মোট কথা এভাবে তাঁর প্রতিটি সহচর আর নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গী নিজ নিজ আত্মনিবেদনের ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। আর রাসুলে পাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এর পবিত্র বাণীর বাস্তবায়ন করতঃ উভয় জগতের সৌভাগ্য অর্জন করলেন। যেমন- হযরত আনাস ইবনে হারেস (রাদিঃ) বর্ণনা করেন,
“আমি রাসুলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) কে বলতে শুনেছি যে, আমার এই বেটা (হুসাইন) সেই ভূখণ্ডে নিহত হবে, যাকে কারবালা বলা হয়। তোমাদের মধ্যে যেই সেখানে উপস্থিত থাকবে সে যেন তাঁকে সাহায্য করে।” সুতরাং আনাস বিন হারেসও কারবালায় গেলেন এবং ইমাম হোসাই (রাদিঃ) এর সাথে শাহাদাত বরণ করেন। (✍🏼সিররুশ শাহাদাতাইন পৃঃ ২৯, ✍🏻বিদায়াহ্ ওয়ান্নিহায়া)
অতএব, আল্লাহ তাঁদের দিয়েছেন উত্তম প্রতিদান।
কবির ভাষায়—
পূণ্যবানের ইমাম, তাঁহার আজব দেখি সে লস্কর,
আব্বাস যাঁর উঁচায় নিশান বীরত্ব আর তেজ প্রখর।
অগ্রভাগে বীর সেনানী নবীর রূপে রূপনগর
সৃষ্টিতে যাঁর সব ক্ষমতা, চালান তিনি এই বহর।
পায় তো এমন বীর সেনানী কোথায় আছে সেই প্রধান,
কোথায় পাবে সৈন্যরাও এমনি নায়ক বীর মহান ?
ইমাম শাহীর সৈন্যরা সে বাহ্যতঃ যদিও কম,
আল্লাহ্ তায়ালার কাছে কিন্তু কদর তাঁদের আর রকম।
বিক্রমে সে বিরল সেনা, বীরত্বে তার তুল্য নাই,
খলিল ত্যাগে উজ্জীবিত, প্রাণ দিতে যে কুণ্ঠা নাই।
ধৈর্য্য এবং সহিঞ্চুতায় ক্ষুধায়ও প্রাণ শান্ত রয়,
প্রাণ ত্যাজে সে বীর মুজাহিদ সিংহপুরুষ সে নির্ভয়।
হুসাইন পায়ে আত্মবলি হাসিমুখে দেয় সবে,
তাঁর প্রেমে শির দিল সবাই এমন প্রেমিক কই ভবে?
যৌবনের ঐ নাম লিখে যায় রক্তে ভেজা নকশা তাঁর,
মাযহাবে দেয় সর্বসহায় এই অবদান কোথায়, কার ?
বীরত্ব আর যৌবনেরে ত্যাগ করে এ বীর জওয়ান,
বিশ্ব বুকে নজীর কোথা? এমন প্রেমের আত্মদান !”
পরবর্তী পর্ব -
আশুরার রাত ৯ই মুহররম

Comments
Post a Comment