কারবালা – ৬৬
কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৬৬)
📚শামে কারবালা
****************
যেভাবে একের পর এক শহীদ হলেন – ১০
হযরত আব্বাস আলামদার—
এক এক করে প্রিয়জনদের লাশ হয়ে পড়ে থাকা ইমামে পাকের জন্য এতটাই হৃদয় বিদারক ছিল যে, কখনও তিনি হাঁটুতে মুখ গেড়ে কারবালার মাটিতে বসে পড়েন, কখনও আসমানের দিকে শুন্য দৃষ্টি মেলে নিজ শাহাদাতের শুভমূহুর্তটি আসার বাকী প্রহর গুণতে থাকেন, কখনও বা স্বজনহারা বেদনাক্লিষ্ট, বিষন্ন মজলুম মহিলাদের প্রতি অসহায় নেত্রে তাকাতে লাগলেন। একজন শাহজাদা আলী আকবরই বেঁচে, বাকী আব্বাস আলামদার বাহুবল হিসেবে সামনে আছেন। এখন মজলুম ইমামের কোমর ভেঙ্গে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। যুলুম-নির্যাতনের পাহাড় নেমে আসছে। তাই চুড়ান্ত ধৈর্য ও সংযমের অন্বেষায় উৎসর্গের শির ঝুঁকিয়ে নিজ স্রষ্টা ও মুনিবের প্রতি আরাধনায় মশগুল। যখন উজ্জল ললাট প্রভুর উদ্দেশ্যে ঝুঁকিয়ে রহস্যের মনযিল অতিক্রম করতঃ উপরে উঠালেন, তখন আব্বাস আলামদার (রাদি.) আরজ করলেন, “এখন গোলামদের মধ্যে তো আমি এ ঝান্ডাবরদার ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট নেই। শিশুদের অন্তর, যুবকদের জেহাদ এবং বৃদ্ধদের দূর্বল হাতে চালানো তরবারী দেখলাম । যদ্দরুন এ পর্যন্ত ঝান্ডা উঁচিয়ে রাখা ছাড়া যেন আর কোন কাজেই আসল না, সেতো আপনার এ গোলাম আব্বাস।
হে ফাতিমার নয়ন জ্যোতি, এখন তো শিরা ফেটে রক্তগুলো বেরিয়ে এসে আল্লাহ্র রাস্তায় বয়ে যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। অনুগ্রহ করে আমাকেও অনুমতি দিয়ে আমার সৌভাগ্যের তারা দীপ্ত করুন।” ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতার প্রতীক ইমামে পাক ভায়ের মাথাটি বুকে লাগালেন। স্নেহ ও ব্যথাবিগলিত কিছু অশ্রু মুক্তোবিন্দুর মত চোখ বেয়ে নেমে গন্ডদ্বয়ে চিকচিক করতে লাগল। অনেকক্ষণ এ অবস্থায় থেকে বলতে লাগলেন, “কী আর করবো, আল্লাহ্র ইচ্ছেই চুড়ান্ত। তাঁরই ইচ্ছায় আমরা সমৰ্পিত। কিন্তু কাওসার এর সাকীর হে মানিক, শিশুদের তৃষ্ণা মায়েদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে দিচ্ছে। পিপাসায় অস্থির শিশুরা। তাদের অস্থিরতা মায়েদের সহ্য হচ্ছে না কিছুতেই।” এটা শুনে আব্বাস আলামদার তাঁবুর দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁবুর মুখেই তিনি হযরত সাকীনা ও আলী আসগরের পিপাসার যন্ত্রণা দেখে ব্যাকুল হয়ে পড়লেন। আলীর শার্দুল রাগে ঠোঁট কামড়ে ধরে বলে উঠলেন, “আফসোস! সামনেই ফোরাত নদী, আর এ বাচ্চারা একটি একটি ফোঁটা পানির জন্য ধুঁকে মরছে। আমি এখনই ফোরাতের পাড়ে যাচ্ছি, পানি এনে শিশুদের তৃষ্ণা আমি মেটাবোই।”
এ কথা শুনতেই সাইয়িদা যয়নবের চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেলো। তিনি আর্তনাদ করে বলে উঠলেন, “ভাইয়া, নদীর কিনারায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রাচীর মোকাবিলা করতে তুমি একাই যাবে?
আব্বাস আলমদার বললেন, “বোন আমার, তোমার উদ্বেগ কীসের? যদি সেখানে সশস্ত্র বাহিনী থাকে, তোমার ভায়ের হাতে কি নাঙ্গা তলোয়ার নেই?”
হায়দার পুত্রের তেজোদীপ্ত কথাশুনে পিপাসার্তদের কিছুটা প্রবোধ আসলো। ভগ্নহৃদয়ে কিছুটা আশার আলোর সঞ্চার হয়। পানির মশক কাঁধে ঝুলিয়ে ফোরাতের দিকে রওয়ানা হলেন। শত্রুরা পথ রোধ করে দাঁড়ালে তিনি বললেন,
“হে কুফাবাসী, শাম (সিরিয়া) বাসী, আল্লাহকে ভয় কর। রাসুলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) কে সমীহ কর, আফসোস, শত আফসোস ! তোমরা রাসুলের দৌহিত্রকে আহ্বান করে এনেছ, আবার তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতাও করেছ। শত্রুদের সাথে মিলে তাঁদের জন্য পানি বন্ধ করে দিয়েছ। তাঁর সঙ্গী-সাথী, প্রিয়জন ও নিকটাত্মীয়দের হত্যা করেছ। নবী পরিবারের শাহজাদী এবং ছোট্ট শিশুদেরকে এক ফোঁটা পানির জন্য যন্ত্রণা দিচ্ছ? দেখো, তোমাদের মধ্যে কারো জন্যে তাওবার দুয়ার খোলা আছে। এখনো সময় আছে, যুলুম-নির্যাতন আর আওলাদে রাসুল হত্যা থেকে ফিরে এসো!” হতভাগ্য দলের মধ্য থেকে শিমার ফুল জওশন, শাবস বিন রিবঈ, হাজর ইবনুল আহজার- এ তিন জন সামনে এসে বলল, “যদি সমগ্র পৃথিবীও পানিতে ভরে যায়, তবুও আমরা তোমাদের এক ফোঁটা পানি নিতে দেব না।” এটা শুনতেই শেরে হায়দার ক্রোধে ফেটে পড়লেন। বাঘের মত হুঙ্কার দিয়ে তিনি বললেন, “এ মাথা কাটা পড়তে পারে; কিন্তু পাপিষ্ট দুরাচারের সামনে ঝুঁকতে পারে না।” বলেই চকচকে কৃপাণ নিয়ে তিনি তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। শায়ের বলেন–
আব্বাস আলমদার আসেন, শত্রু খবরদার যুদ্ধ মাঠে চকিত হেরে দীপ্তি সে যোদ্ধার।
চতুর্দিকে শোর পড়ে যায় অমনি আরেক বার,
হুঁশিয়ার হে দুশমন সবে, হুঁশিয়ার! খবরদার!
সাবাশ! সবে অবাক মানে, পিতা যে হায়দার
খোদার সিংহ নয় তো বটে, কিন্তু যুলফিকার !
হযরত আব্বাস (রাদি.)'র রণ-হুঙ্কার—
“হায়দারেরই পুত্র আমি রাখবি স্মরণে,
বৃক্ষে যেন ফল শোভা পায় নবীর কাননে।
সাহস দেখে খুশী হলে দেখবি নয়নে,
পিয়াস হলেও কাওসারওয়ালার খুন যে বদনে।
শপথ, দেখিস মারব যেন গজব ভূবনে
শেরে খোদার আশেক আমি, শান্তি সেই মনে।
আব্বাস আলমদার (রাদি.)'র হামলা তো নয়, যেন ইয়াযিদীদের উপর নেমে আসা আল্লাহর গজব। ঘোড়া হুমড়ি খেয়ে পড়তে লাগল। অশ্বারোহী সৈন্যদের হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে পড়তে লাগল। পলায়নপর ভীত হরিনীর মত ওরা দিগিবিদিক ছুটতে লাগল। আর তিনি মারতে মারতে কাটতে কাটতে নদীর কিনারায় গিয়ে উপনীত হলেন। নদীর তীরে বহু সৈন্য অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত শাহারায় মোতার ছিল। তারা তাঁর সামনে লোহার প্রাচীর হয়ে দাড়িয়ে গেল। তিনি তাদের বললেন, “তোমরা কি মুসলিম, না কাফির?”
তারা উত্তর দিল “মুসলমান।” তিনি বললেন, “এটাই কি তোমাদের মুসলমানের পরিচয় যে, ফোরাতের পানি পশু পাখি পান করে তৃপ্ত হবে, আর রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) উনার পুত্র, কন্যা এবং দুধের শিশুরাও এক ফোঁটা পানির অভাবে ছটফট করবে? আমি নিজের চোখে দেখে এসেছি, তারা পিপাসার যন্ত্রণায় কেউ নেতিয়ে পড়ছে, কেউবা বেহুঁশ হয়ে পড়ছে।”
তিনি তাদের সাথে এসব কথাবার্তা বলছিলেন, ওদিক থেকে ইয়াযিদী বাহিনীর সিপাহী তাদের সেনানায়ক আমর বিন সা'দের হুকুম নিয়ে পৌঁছে। নদীতীরে নিয়োজিত সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বলল, “আমাদের সেনা প্রধানের নির্দেশ, পানির একটি ফোঁটাও যেন হুসাইনের তাঁবু পর্যন্ত পৌঁছতে না পারে।”
নির্দেশ শুনে ইয়াযীদ বাহিনী বর্শা উঁচিয়ে দাঁড়াল। শেরে খোদার শার্দুল এক ঝটকা মেরে শত্রু সৈন্যের সারি ভেদ করে ঘোড়া চালিয়ে দিলেন এবং নদীর পানিতে নামিয়ে দাঁড়াকরলেন। বেহেশতী তৃষাতুর আঁজলা ভরে পানি নিলেন; কিন্তু আহলে বায়তের তৃষ্ণা মনে পড়ে যাওয়ায় আর পান করতে পারলো না। স্বগত বলে উঠলেন, “আব্বাস, তুমি তো নিজের তৃষ্ণা মেটাতে নদীর কিনারায় আসনি! যতক্ষণ নিষ্পাপ শিশু আলী আসগর এবং সকীনার তৃষ্ণা মেটাতে পারবে না, ততক্ষণ এ পানি পান করা তো তোমার উচিৎ হবে না।” এই বলে তিনি পানি ফেলে দিলেন। এবার হযরত আব্বাস মশক ভর্তি করে পানি নিলেন। আর তা বাম কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে আসলেন। চারদিক থেকে শোরগোল পড়ে গেল, “যদি এ মশক হুসাইনের তাঁবু পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তবে আমাদের সকল শ্রম পন্ড হয়ে যাবে। জলদী তাকে বাঁধা দাও। মশক কেড়ে নাও। পানি ফেলে দাও।” এদিকে আহলে বায়তের এ পানি সরবরাহক আব্বাসের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা এটাই চলছিল যে, কোন ক্রমে এ মশক পিপাসার্তদের তাঁবু পর্যন্ত যেন পৌঁছছে যায়। তিনি চাচ্ছিলেন ঘোড়া উড়িয়ে নিয়ে হলেও তাঁবুতে পৌঁছে যাবেন; কিন্তু সামনে কয়েক শত তীর পানির মশককে তাক করে দেখতে পেলেন। তিনি পানির মশক বাঁচাতে একদিকে সরে আসতে আসতে সৈন্যদের অপর সারির এতটাই কাছাকাছি হয়ে গেলেন যে, উভয় সারির ঘেরায় পড়ে গেলেন। যখন তিনি নিজকে শত্রুদের ঘেরার মধ্যে দেখলেন, তখন উম্মত্ত বাঘের মত আক্রমন শুরু করলেন। শত্রুশিবিরে শোরগোল পড়ে যায়। লাশের পর লাশ পড়তে লাগল, রক্তের স্রোত প্রবাহিত হতে লাগল। শেরেখোদার কলিজার টুকরা কারবালার ময়দানে প্রমাণ করে দিলেন যে, আমার বাহুতে আছে হায়দরী ত্বাকৎ, শিরায় বইছে আলীর রক্ত। লাশের স্তুপ বানিয়ে দিলেন। আচানক যারারা নামের এক পাপিষ্ট ধোঁকার আশ্রয় নিয়ে তাঁর বাম বাহুতে এমন এক আঘাত হানল তা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিল। তিনি তৎক্ষনাৎ মশক ডান কাঁধে নিয়ে নিলেন এবং (ডান) হাতে তলোয়ারও চালাতে থাকলেন। কিন্তু এখন না হাতে ঐ শক্তিও থাকল, না এক হাতে দুই কাজ সমাধা হতে পারছিল। আত্মরক্ষামূলক চেষ্টা করতে তিনি একদিক থেকে পাহারারত ফৌজের উপর ঘোড়া উঠিয়ে দিলেন। ভেবেছিলেন এভাবে রাস্তা হয়ে যাবে। কিন্তু এ গাজী (ধর্মযোদ্ধা)'র খেদমত সম্পন্ন হওয়ার সময় দ্রুত ঘনিয়ে আসছিল। এক পর্যায়ে নাফেল ইবনুল আরযাক ডান বাহুতে ও আঘাত করে বসল। ফলে ঐ হাতও কাটা পড়ল। হায় আল্লাহ্! শেরে খোদার এ সন্তানের কেমন সে হিম্মত! মশকের ফিতে দাঁতে চেপে ধরলেন; কিন্তু মশক বাঁচানোর কোন চেষ্টাই আর সফল হলনা। এক অভিশপ্ত এবার মশক লক্ষ করে একটি তীর এমনভাবে ছুঁড়ল যে, তা মশক ভেদ করে চলে গেল। ফলে সব পানি নিচে পড়ে গেল। আরব বীরত্বের কলঙ্ক সে কাপুরুষরা দেখল যে, এ বীর মুজাহিদ এখন তা বাহু কর্তিত। এজন্য চারপাশ থেকে তাঁর উপর হুমড়ে পড়ল । এক যোগে আক্রমন চালিয়ে তাঁকে আঘাতে জর্জরিত করে ফেলল । এক যালিম হাতুড়ি দিয়ে মাথায় এমন আঘাত করে বসল যে তিনি “ভাইয়া, আমাকে ধরুন” বলে ঘোড়া থেকে পড়ে গেলেন।
“হঠাৎ করে আর্তি আসে, কোথায় আমার প্রিয়জন,
শেষ হল আব্বাসের সময়, উঠাও আমার প্রিয়জন।
শত্রুরা যে কাটলো এ শির, বাঁচাও আমার প্রিয় জন,
এ মাথাটি তোমার বুকে লাগাও আমার প্রিয় জন।
শুনতে পেয়ে সেই সে আওয়াজ, উঠলো হেঁকে ইমাম শাহী,
“জলদী এসো নবীর ছবি, ভাঙলো কোমর, বাঁচলে নাহি।"
ভায়ের আর্তি শুনামাত্র ইমামে আলী মাকাম দৌড়ে আসলেন। সেই মুহূর্তে ইমামের মুখে শব্দ ছিল।(এখন আমার আমার পিঠটাও ভেঙ্গে গেল।)
দু'বাহু কর্তিত, আঘাত জর্জরিত ভায়ের কাছে এসে তাঁর বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। কবির ভাষায় সে চিত্র—
“লাশের পরে ঝুঁকে হোসাইন কাঁদে জার জার,
পদ্ম নয়ন দুটির পরে মরি, ভাই আমার।
শত্রু ঘেরা যুদ্ধেও ভাই ভায়ের প্রতীক্ষায়
ঘুরিয়ে দু চোখ খুঁজছে বুঝি ভাইকে বার বার।
ভাষা কোন মৌন তোমার, খুলছে না ওই মুখ,
বলছ না কই কথা, আমি কেঁদেই যে উম্মু
ব্যাকুল হয়ে শুধায় হোসেন,
ভাইগো জবাব দাও জওয়ান আমার,
সহযোগী ভাই পো জবাব দাও।
প্রাণ যে তোমার ওষ্টাগত নবীর দৌহিত্র,
নূর নবীজির নয়ন জ্যোতি ভাই গো জবাব দাও
হেঁচ দিয়ে প্রাণ পাখীও যায় বেরিয়ে যায়৷
কোলের পরে এলিয়ে মাথা, বিদায় নিয়ে যায়।
চাচাও বুঝি বিদায় নিলেন হায়' বলে আকবর,
কান্না জড়া হোসেন বলে, 'ভাই কেন নিখর?
মুখ তুলে চাও, ধুলোয় ভরে গেল যে অধর,
হুসাইনের আজ নেইকো সহায়, হায়রে ভূবন পার।
কে দেবে আজ নবীজির এই দুলালে সহায়তা
ভর জীবনের সখ্যতা আজ ধুলোয় যে লুটায়।
শত্রুকুলে আতঙ্ক, হে আমার যুবক ভাই,
আমার এমন অনুরাগী আর খুঁজে না পাই।
শেরে খোদার চিহ্ন বুঝি জগৎ ছেড়ে যায়,
হোসেন তোমায় জানত নিজের পরান, বুকের ঠাঁই।
অসির সহায় ছেড়ে দিয়ে আসলে ভায়ের কোলা,
শ্বাপদ কুলে ছিন্ন এখন সাগরে কল্লোল

Comments
Post a Comment