কারবালা – ৪০



কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৪০)
📚শামে কারবালা

শিক্ষনীয় বিষয়—
যখন কোন মানুষের মধ্যে লোভ-লালসার মন্দ প্রবণতার উদ্রেক হয়, তখন সে আদল ও ইনসাফ, সবর ও নির্ভরশীলতা এবং সন্তুষ্টচিত্ত হওয়ার মতো উত্তম গুনাবলী থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। পরিণামে তারমধ্যে এমন ঘৃন্য ঔৎসুক্যের সৃষ্টি হয়, তাতে সে বৈধ-অবৈধ, হালাল ও হারাম দেখেনা; বরং সময় সময় লোভের এ উম্মত্ততা অন্যায়ভাবে অপরের জানমাল হরণেও প্রবৃত্ত করে। হুযুর সাইয়িদে আলম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এ প্রসঙ্গে এরশাদ করেন, “লোভলালসা থেকে বেঁচে থাক, কেননা এটাই তোমাদের পূর্ববর্তীদের- ধংস করেছিল, এটাই তাদের খুন খারাবীতে লিপ্ত করেছিল, সেটা হারামকে হালাল করেছিল, (মুসলিম শরীফ, অধ্যায় : যুলুমের নিষিদ্ধতা) 
অপর এক বর্ণনায় সত্যের সংবাদদাতা নবীজি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন,
দু'টি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘ বকরীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েও এতটা ক্ষতি করতে পারে না, যতটা সম্পদ ও মর্যাদার প্রতি মানুষের মোহ তার দ্বীন ও ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্থ করে।(তিরমিযী : পাথির্ব নিরাসক্তির অধ্যায়সমূহ)
“ইবনে সা'দ, তুই পেলি কি রায়ের হুকুমত ? 
জলদী পেলি অত্যাচারের শাস্তিটা আলবৎ। 
সৃষ্টিকুলে ধিকৃত হে, ধংস হলি তুই, মরদুদ,
তোর দুই জাহানে শুধুই যে লানৎ ! 
দুনিয়া পেতে দ্বীন থেকে তুই মুখ ফিরিয়ে কই,
দুনিয়া কিবা স্বস্তি নাহি, পেলি কি ইযযৎ? 
তুইতো উজাড় করলি ওরে যাহরার এ গুলশান, 
জাহান্নামের শাস্তি তো দেখ, পুরবে মনোরথ।
কারবালায় পৌঁছে ইবনে সা'দ আরযা বিন কায়স আহমসীকে নির্দেশ দিল; হোসাইনের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস কর, তিনি এখানে কেন এসেছেন, কী চান তিনি? কিন্তু আরযা ছিল ঐ শ্রেণীভূক্ত, যারা ইমামকে চিঠির পর চিঠি দিয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এ কারণে ইমামের নিকট যেতে লজ্জা ও সংকোচ বোধ করছিল। ফলত: সে যেতে অস্বীকৃতি জানাল। ইবনে সা'দ সৈন্যদের মধ্যে অপরাপর শীর্ষস্থানীয় যাদেরকেই এ কাজের নির্দেশ দিচ্ছিল সবাই একথা বলে অস্বীকার করছিল যে, আমিও আমন্ত্রনকারীদের মধ্যে ছিলাম। কোন মুখে তাঁর সামনে যাব ? এভাবে কেউ যাবার জন্য তৈরী হচ্ছিল না।
এ অবস্থা দেখে কাসীর বিন আব্দুল্লাহ শা'বী নামক অত্যন্ত দুঃসাহসী ও বেপরোয়া একলোক বলল, “হুসাইনের কাছে আমি যাচ্ছি। আর যদি আপনি বলেন, তো খোদার শপথ, অতর্কিত এক হামলায় আমি তাঁর (হুসাইন রাদি.) দফা রফা করে দেব।" ইবনে সা'দ বলল, “আমি এটা বলছি না যে, তুমি আচমকা আক্রমন করে তাঁকে কতল করে দাও; বরং আমি বলছি যে, আগে তাঁর কাছে যাও, গিয়ে জিজ্ঞেস করো যে, তিনি কেন এসেছেন আর কিইবা চান?” কাসীর রওয়ানা হয়ে গেল। আবু সুমামা সায়েদী তাকে এগিয়ে আসতে দেখে ইমাম পাককে বললেন, “হে আৰু আব্দুল্লাহ্ (হুসাইন রাদিঃ) খোদা আপনার মঙ্গল করুন, দুনিয়ার মধ্যে - সবচেয়ে খারাপ এবং রক্তপাতকারী লোকটি আপনার নিকট আসছে।” এটা বলেই আবু সুমামা দাড়িয়ে গেলেন এবং এগিয়ে এসে কাসীরকে বললেন, “তলোয়ার এক পাশে রেখেই ইমামের সাথে দেখা করতে পারো।” সে বলল, “খোদার কসম, এটা কখনো হতে পারেনা, আমি দূত হিসাবে একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। শুনে নাও তো ভালো, নয়তো আমি ফিরে যাচ্ছি।" আবু সুমামা বললেন, “ঠিক আছে তরবারী না রাখো, তো তোমার তরবারীর হাতলে আমি হাত রেখে আছি, তুমি ইমামের কাছে প্রস্থাব পেশ করো।” 
টিকা — [এ থেকে বুঝাযায় যে সব লোকেরা মুহাব্বতের উচ্চ কণ্ঠে দাবী করে তাকে ডেকেছিল, তারাই ক্ষমতার সাথে মিলিত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছিল। কারণ তাদের মোটা অংকের উৎকোচ মিলেছিল। তাদের আচরণ বর্ণিত হয়েছে] ...
সে বলল, “আল্লাহর শপথ এটাও হবেনা, তুমি আমার তরবারীর হাতলে হাত লাগাতেই পারবেনা।” আবু সুমামা বললেন, “তবে যা বলার আমাকে বলো, আমি ইমামের খেদমতে পৌঁছে দেবো। কিন্তু আমি এই অবস্থায় তোমাকে তাঁর কাছে যেতে দেবো না। কেননা তুমি একজন দুষ্ট লোক।” উভয়ের মধ্যে অপ্রিয় বাকবিতন্ডা হল। পরে কাসীর প্রস্তাব না বলেই ফিরে গেল। গিয়ে ইবনে সাদকে অবস্থার বর্ণনা দিল। (✍🏼ত্বাবরী ২৩৩/৬)
এরপর ইবনে সা'দ কুররাহ ইবনে ক্বায়েস হানযালীকে ডেকে বলল, এ কাজটা তুমি করো। কুররা রওয়ানা হয়ে গেল। তাকে আসতে দেখেই ইমাম নিজ সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করলেন “কেউ কি লোকটাকে চিনতে পার ?” হাবীব ইবনে মুজাহের বললেন, “জী হ্যাঁ, তাকে আমি চিনি, সে হানযালা গোত্রের, তমীমী সম্প্রদায়ের লোক। আমার বোনের ছেলে। আমি তো তাকে উত্তম আকীদার মনে করতাম। আশ্চর্য, সেও শত্রুদের সাথে এখানে এসে গেছে!”
ইত্যবসরে কুররা এসে পৌঁছে। সে এসে ইমামকে সালাম জানাল। আর ইবনে সা'দ এর কথা তাঁর কাছে ব্যক্ত করল। উত্তরে তিনি বললেন, “তোমাদের কুফা শহরের লোকেরা অনেক চিঠি লিখে আমাকে ডেকেছে। এখন আমার আগমন যদি তাদের অপছন্দ হয়, তবে আমি ফিরে যাচ্ছি।” হাবীব ইবনে মুজাহের কুররাকে বললেন, তুমি কি ফিরে গিয়ে ঐ যালিমদের দলভুক্ত হবে? শোন, সহযোগিতা তাঁদেরই করো, যাঁদের সম্মানিত পূর্বপুরুষের বদৌলতে আল্লাহ আমাদের এবং তোমাকে ঈমান দ্বারা সম্মানিত করেছেন।” কুররা বলল, “আমি যার সাথে আছি, তার পয়গামের জওয়াব তাকে অবশ্যই পৌঁছাব। এর পরেই দেখবো, আমাকে কি করতে হয়।” কুররা ইবনে সাদকে ইমামের উত্তর জানিয়ে দেয়। উত্তর শুনে ইবনে সা'দ বলল, “আশা তো করছি যে, আল্লাহ আমাকে হুসাইনের সাথে যুদ্ধ করা থেকে নিষ্কৃতি দেবেন।” অতঃপর সে নিজের প্রস্তাবনা এবং ইমামের উত্তর লিখে ইবনে যিয়াদের নিকট প্রেরণ করল । (✍🏼ত্বাবরী ২৩৬/৬)
ইবনে সা'দের ধারণা ছিল যে, এ সমঝোতামূলক পত্রের মাধ্যমে হয়তো কোন সন্ধি বা আপোষ রফার ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে এবং আমিও এ অন্যায় কাজ থেকে বেঁচে যাবো। কিন্তু দুর্ভাগ্যই তার নিয়তি হয়ে গিয়েছিল। কাজেই তার এ লেখা পড়ে ইবনে যিয়াদ নিম্নোক্ত কবিতার পংতিটি আওড়াল, 
আমাদের (হাতের) থাবা যখন তাকে বেঁধে ফেলেছে, তখন সে মুক্তি চাইছে, অথচ এখন তো পালাবার কোন অবকাশ নেই। সে আমর বিন সা'দকে উত্তরে লিখল যে, “তোমার চিঠি আমি পেয়েছি। তুমি যা লিখেছে তা বুঝতে পারলাম। হুসাইন এবং তার সকল সঙ্গীকে বল, ইয়াযীদের বাইআত ( বশ্যতা) গ্রহন করতে। যদি তাঁরা বাইআত গ্রহন করে নেন, তবে আমরা যা সমীচিন তাই করবো।”
ইবনে সা'দ যখন এই চিঠি পেল তখন বলল, আমি বুঝে গেছি যে, ইবনে যিয়াদের কাছে নিরাপত্তা ও শান্তির প্রস্তাব মঞ্জুর হয়নি। 

পরবর্তী পর্ব–
পানি বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ

Comments