কারবালা – ৫১
কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৫১)
📚শামে কারবালা
📚শামে কারবালা
হুরের আগমন —
কবি বলেন,
“জুটলো হুরের বেহেশত ও ফের শাহাদাতের উচ্চমান,
শাহী নজর এমনি পারে আনতে ফোঁটায় জোয়ারবান।”
যুহাইর বিন কাইনের প্রত্যাবর্তনের পর আমর বিন সা'দ যুদ্ধ শুরু করার জন্য অগ্রসর হলে হুর ইবনে ইয়াযীদ ইবনে সা'দকে বলল, “খোদা তোমার মঙ্গল করুন, তুমি কি এঁদের সাথে যুদ্ধ করবে?” ইবনে সা'দ বলল, “হ্যাঁ, খোদার কসম, লড়াইও হবে এমন প্রচন্ড যে, যাতে নিদেন পক্ষে এতটুকু হবে তাদের মাথা ও হাত টুকরো টুকরো হতে থাকবে।” হুর বলল “তাদের তিনটি প্রস্তাব থেকে একটিও কি তোমার কাছে গ্রহনযোগ্য নয়?” ইবনে সাদ বলল, “আল্লাহর শপথ, যদি বিষয়টি আমার ইচ্ছাধীন হতো, তবে আমি অবশ্যই তা করতাম। কিন্তু করবো কী, তোমাদের আমীর তো মানছে না।”
হুরের মধ্যে কী এক স্পন্দন অনুভূত হল! দৃষ্টি থেকে অন্ধকারের পর্দা সরে গেল। সত্যের দীপ্তি স্বচ্ছ হয়ে ক্রমশঃ ফুটতে থাকল। হুরের এ অবস্থা লক্ষ্য করে তারই ভ্রাতৃ সম্পর্কের এক ব্যক্তি মুহাজির বিন আউস হুরকে বলল “হায় আল্লাহ, আজ তোমার অবস্থা যে অদ্ভুত! আমি তো কোন যুদ্ধেই তোমার এমন অবস্থা দেখিনি! অথচ আমার দৃষ্টিতে তুমি কুফার বীর কেশরীদের মধ্যে একজন শ্রেষ্ঠ বীর পুরুষ। তারপরও তোমার এ দশা কেন? “হুর বলল, “খোদার কসম, আমার এক দিকে জান্নাত, আর অপর দিকে জাহান্নাম। উভয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে গেছি যে কোথায় যাব।
হুর বলে, “ভাই, তুমিও বুঝি টের পেয়েছো সেই খবর ? নবীর তনয় বিপক্ষে তাই কঠিন লাগে এই সমর।
কবির ভাষায়—
“পরকালের বিনাশ চেয়ে লড়তে যাহার নেইকো ডর,
দেখাক সে জন এই লড়াইয়ে রণকুশলের তেজ বহর।
এক দিকেতে দোজখ হেরি, অন্যদিকে বেহেশত মোর,
নরক ভয়ে কম্পিত মন,
দ্বন্দ্বে ভুগি, লাগল ঘোর।”
তারপর বলল, "এখন আমি জান্নাতের দিক স্থির করে ফেলেছি। তাতে আমাকে টুকরো টুকরো করে দেয়া হোক, কিংবা জীবন্ত জ্বালিয়ে দেয়া হোক!”
এই বলে তিনি ঘোড়ার লাগাম টেনে চাবুক হানলেন, আর হতভাগ্যদের দল থেকে বেরিয়ে ইমামে আলী মকামের নিকট পৌঁছে গেলেন ।
কবি বলেন–
বেরিয়ে সে হুর দরাজ গলায় দুশমনেরে শুধায় ফের,
দেখলি, কেমন আল্লাহ ওয়ালা নরক থেকে হয় সে বের?
ইমামে পাকের চরণে উপস্থিত হয়ে হুর আরজ করল, “হে ইবনে রাসূলিল্লাহ! আমার প্রাণ আপনার জন্য উৎসর্গ হোক, আমি সেই ব্যক্তি, যে আপনাকে ফিরে যেতে দেয়নি। সারাটি পথ আপনার সাথে সাথে থেকে পাহারা দিয়েছি এবং এ জায়গায় থেমে যেতে আপনাকে বাধ্য করেছি। কিন্তু লা-শরীক এক আল্লাহর কসম, আমার এটুকু ধারণা পর্যন্ত ছিলনা যে, তাদের মন্দ-অদৃষ্ট এ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, আর তারা আপনার সব শর্তগুলো প্রত্যাখ্যান করবে। আমি ধারণা করছিলাম যে, তারা আপনার শর্তসমূহ থেকে কোন একটি শর্ত মেনে নেবে এবং একটি সমঝোতার দিক উন্মোচিত হবে। আল্লাহর কসম, আমি যদি জানতে পারতাম যে, এ লোকগুলো আপনার সাথে এমনতর আচরণ করবে, তবে আমি কখনো তাদের সাথে থাকতাম না এবং যে সব বে-আদবী আমার পক্ষ থেকে প্রকাশ পেয়েছে আমি কখনো তা করতাম না। এখন আমি কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত, আল্লাহর কাছে তাওবা করছি। আর নিজ প্রাণ আপনার জন্য উৎসর্গ করছি, দয়া করে বলুন, আমার এ তাওবা কি কবুল হবে?” তিনি বললেন, ”হ্যাঁ, আল্লাহ তোমার তওবা কবুল করবেন এবং তোমাকে ক্ষমাও করবেন। তোমার নাম কি, ভাই?” বলল, ”হুর ইবনে ইয়াযীদ।” ইমাম বললেন, ”তুমি দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর ইচ্ছায় 'হুর' তথা স্বাধীন হবে। ঘোড়া থেকে অবতরণ করো।” হুর বললেন, আমি তো তখনই অবতরণ করবো, যখন ঐ যালিমদের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে এ প্রাণ আপনার জন্যে উৎসর্গ করে দেব।”
তিনি ফরমালেন, ঠিক আছে, যেমনটি তোমার মন চায় করো। আল্লাহ তোমায় রহম করুন।“
“আরজ করি, ইবনে রাসূল, আমি যে এক গোনাগার,
প্রথম থেকেই এই গভিরোধ ছিল শুধু সেই আমার।
বিজন মাঠে আমিই মুনিব কৰেছিনু এই চলা,
ধৃষ্টতা এই হুরের ছিল, পাপটা ছিল ভিন্ন কার?
পাপটি আমার মাপ হবে সে, আরাধনা তাই করি
জীবন দিতে আদেশ হলে এই যাচনা তাই করি।”
পরম মায়ার হাতটি মাথায় রাখেন ইমাম আর শুধান,
“তোমার ওজর কবুল হবে, দোয়া দিনু প্রাণভরি।
তওবা করো প্রভুর কাছে, ক্ষমা হবে পাপরাশি,
আমিও তোমায় দিলামগো হুর, সন্তোষের এ সুখ হাসি,
অনুমতি দিলেম তোমায়, যুদ্ধে জীবন দাও বাজী,
শাহাদাতের পূণ্য সুধা, জুটবে ভালে দুঃখনাশি।
পরবর্তী পর্ব -
হুর এর অভিভাষণ

Comments
Post a Comment