কারবালা – ৬১



কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৬১)

📚শামে কারবালা


যেভাবে একের পর এক শহীদ হলেন – ৫

আবু শা’সা ইয়াযীদ ইবনে যিয়াদ আল কিন্দী প্রথম দিকে ইবনে সা'দের সৈন্যদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। কিন্তু যখন তিনি দেখলেন যে, ইয়াযীদ বাহিনী ইমামে পাকের দেওয়া সবগুলো শর্তই প্রত্যাখ্যান করে দিল, তখন তিনি ইয়াযীদ বাহিনী থেকে বের হয়ে ইমামে পাকের সহযোগীদের মধ্যে শামিল হয়ে গেলেন। তীর চালনায় তিনি অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। এবার তিনি ইমামে পাকের সামনে এসে দুই হাঁটু মাটিতে গেঁড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং আবৃত্তি করলেন,

“আমি ইয়াযীদ, আমার পিতা মুহাছির, আমি দুঃসাহসিকতায় হিংসবাঘ, হে খোদা, আমি ইমাম হুসাইনের মদদকারী, ইবনে সা'দকে পরিত্যাগকারী আর তার থেকে দুরত্ব রক্ষাকারী”।

অতঃপর তিনি শত্রুর দিকে উপুর্যুপরি, একশ'টি তীর চালালেন। তম্মধ্যে মাত্র পাঁচটি তীরই শুধু লক্ষ্যচ্যূত হয়। এছাড়াও তিনি আরো পাঁচজন শত্রু সৈন্যকে পূর্বেই নিহত করে ছিলেন। পরিশেষে এ যোদ্ধাও ময়দানে লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে গেলেন।


এভাবে আমর বিন খালেদ, জব্বার ইবনে হারেস, সা'দ মজমা ইবনে ওবায়দুল্লাহও এক এক করে উৎসর্গ হয়ে গিয়েছেন। শুধুমাত্র সুয়াইদ ইবনে উবাই আলমুতা আল-খাসআমী একজনই বাকী ছিলেন। 

✍🏼ইবনে আসীর- ৩০/৪, ত্বাবরী ২৫১/৬


ইমামের এই নিবেদিত প্রাণ সঙ্গীরা যে ধৈর্য্য ও সংযম, বীরত্ব ও সাহসিকতা এবং আত্মোৎসর্গ হওয়ার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে ছিলেন, তার কোন দৃষ্টান্ত মিলবেনা। ছোট্ট একটি কাফেলার উপর মুসীবতের পাহাড় ভেঙ্গে পড়েছিল। অন্যায় অত্যাচারের ঝড় বয়ে গিয়েছিল, তথাপিও তারা মনোবল হারাননি,সত্যের প্রহরা থেকে মুখ ফেরাননি। নিজ প্রাণের মায়া কেউই করেননি। বরং প্রত্যেকেই আলোকপিন্ডে পতঙ্গের মতই ইমামের জন্য আত্মাহুতি দিয়েছিলেন এবং বেহেশতী কাননের শোভা বর্ধন করেছিলেন।

“প্রতি ফোঁটায় উঠল হেসে এক এক নতুন বিশ্ব ধাম, 

কে বলেরে শহীদানের রক্ত ফোঁটা হয় নাকাম? 

বিধাতারই দয়ার ছায়া সমাধিতে ঘর বানায়, 

হাশর মাঠে সেই করুণা দেখবি পুরায় মনোষ্কাম ।

ময়দানেতে আসলো আলী মর্তুজারই ফূল, 

মোস্তাফারই কানন সে মা ফাতেমারই ফুল, 

দ্বীনের বাগে সজীব সে এক সত্য, সেবার ফুল । 

বেহেস্ত হতে আসলো যে হুর, স্বর্গীয় দূত আসল প্রচুর, 

আনল খোদার তরফ হতে ‘সাল্লে আলা'র ফুল। 

শুনরে যমীন খুব হুঁশিয়ার, লাশগুলো এ দেখিস সে কার, 

নবীজির এ আহলে বাইত, দলিস্ নে মর্যাদার ফুল।


এবার অপরাজেয় বীর, শেরে খোদার ব্যঘ্রশালার বাঘগুলোর, যাত্রার বাগানে প্রস্ফুটিত গোলাপদের, নবীকূলশিরমণি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম))র কলিজার টুকরোগুলোর পালা এসে গেলো। ঐ হাশেমী নওজোয়ানদের ময়দানে আগমন হচ্ছিল, যাঁদের দেখে বীরপুরুষের বুকেও হৃদপিন্ডের দাপাদাপি শুরু হয়। বীরত্বের মূর্ত প্রতীক ঐ নওজোয়ানদের খুন-পিয়াসী তরবারীগুলোর হামলায় সিংহ-প্রাণ বীরও আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠে। তাঁরা রনকূশল,আক্রমনের এমন শৈলী দেখালেন যে, কারবালার তৃষার্ত যমীনকে শত্রুর রক্তে পরিতৃপ্ত করে দিলেন। কিন্তু এঁরা তো মাত্র জনাকয়েক। পক্ষান্তরে সহস্রাধিক সুসজ্জিত শত্রুসৈন্য, কতক্ষনই বা লড়তে পারেন। যেহেতু তাঁদের জন্য পানি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। যুদ্ধও একজনের বিরুদ্ধে একজন করছিল না। কাজেই আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে ক্রমশঃ শাহাদাতের অমীয় সুধাই পান করে যাচ্ছিলেন তাঁরা। ইবনে সা'দ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল যে, যদি এসব জাঁ-বাজ পুরুষদের জন্য পানি বন্ধ করা না হত এবং একজনের মোকাবেলা একজনই করতো, তবে আহলে বাইতের এক জওয়ান তার পুরো বাহিনীকেই পরাস্ত করে দিত।


পরবর্তী পর্ব–

যেভাবে একের পর এক শহীদ হলেন – ৬

Comments

Popular posts from this blog

শুধু মুখে কলেমা পড়লে জান্নাত যাওয়া যাবেনা

মসনবী শরীফ বই - মউলানা রুমী (রহঃ)