কারবালা – ২২



শামে কারবালা - (পর্ব- ২২)
কারবালার ইতিহাস

ইমাম মুসলিমের দুই পুত্ৰের কাহিনি– ৩
ওদিকে ইবনে যিয়াদ জানতে পারে যে, মাশকুর জেল থেকে বালক দু'টিকে ছেড়ে দিয়েছে। ইবনে যিয়াদ মাশকুরকে তলব করল। আর জিজ্ঞেস করল, “তুমি মুসলিমের ছেলে দু'জনের ব্যাপারে কি করেছ?” মাশকুর জবাব দেয়,“আমি আল্লাহর রেজামন্দী ও সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তাদের মুক্ত করে দিয়েছি”। ইবনে যিয়াদ বলল, আমাকে ভয় করলেনা তুমি?” মাশকুর উত্তরে বলল, “যে আল্লাহকে ভয় করে, সে তো আর কাউকে ভয় পায় না”। ইবনে যিয়াদ আবার প্রশ্ন কর, “তাদের ছেড়ে দেয়ায় তুমি কি পেয়েছো?” মাশকুর তেজদীপ্ত কণ্ঠে বলে.“হে জালিম (অত্যাচারী)! এ দু'টি শিশু বুযুর্গ পিতাকে হত্যা করার কারণে তোমার তো কিছু মিলবেনা; কিন্তু নিষ্পাপ এই দু'টি শিশুর কোমল বুকে পিতৃহীনতার কঠিন জ্বালা নিয়েও যারা বন্দীত্বের দূর্দশায় নিপতিত, তাদের ছেড়ে দিতে পেরে আমি তাদের মহান পূর্ব পুরুষের শাফায়াত (সুপারিশ ) তো কামনা করি। হুযুর ছদরে কাওনাইন, সাইয়িদে সাকালাইন জনাব মুহাম্মদ মোস্তফা (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) আমার এ খেদমত তো কবুল করবেন। আমাকে শাফায়াত দিয়ে ধন্য করবেন। যখন তুমি মহান সে পুরষ্কার থেকে বঞ্চিত থাকবে”। ইবনে যিয়াদ ক্রোধান্বিত হয়ে বলতে লাগল, “আমি তোমাকে এখনই তার শাস্তি দিচ্ছি”। মাশকুর বলল, “উত্তম, আমার হাজারটিও যদি প্রান থাকে, তবে তা নবীর আওলাদের জন্য উৎসর্গকৃত।

“আছি আমি তার সে পথে বাঁচা মরার চিন্তা নেই, 
তার তরে প্রাণ তুচ্ছ, কিছু অদেয় নেই, কিচ্ছু নেই। 
একটি প্রাণে অর্ঘ্য কি হয়? থাকতো যদি হাজার প্রাণ, 
একটি বারে বিলিয়ে দিতাম তৃপ্ত বদন এ অম্লান”।

ইবনে যিয়াদ জল্লাদকে হুকুম দিল, “একে প্রথমে দোররা (চাবুক) মারতে থাক। এভাবে যতক্ষন না তার মৃত্যু হয়, এরপর দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে দিও। জল্লাদ চাবুক মারতে শুরু করল।” প্রথম আঘাতে মাশকুর পড়ল “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।” দ্বিতীয় আঘাতে বলে উঠল “আল্লাহ, আমাকে ধৈর্য্য দিন।” তৃতীয় দফা আঘাতে বলল, ইলাহী, আমার অপরাধ মার্জনা করে দিন।” চতুর্থ আঘাত আসলে বলল, “হে আল্লাহ, খান্দানে রাসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) এর ভালবাসার কারণে আমাকে এ শাস্তি দেয়া হচ্ছে।” পঞ্চম বারের আঘাতে মাশকুর ফরিয়াদ জানাল, “হে আল্লাহ আমাকে রাসুলুল্লাহ এবং আহলে বায়তের নিকট পৌছিয়ে দিন।” এরপর মাশকুর ক্রমশঃ নিরব, নিথর হয়ে গেল, জল্লাদ তার কাজ সম্পন্ন করল। ইন্না লিল্লাহে...... রাজেউন।

“শান্তির কাননে সে আত্মার বিচরণ,
তাঁর সেই সমাধিতে ফুল, নূর আগমন”। 

ও দিকে পূণ্যশীলা সেই মহিলা সারাটি দিন দুই শাহজাদার সেবা ও আপ্যায়নে মশগুল থাকলেন। রাতের বেলা তাদের আলাদা একটি কামরায় শোবার ব্যবস্থা করে নিজ ঘরে আসলেন। কিছুক্ষণ পর তার স্বামী হারেস ঘরে ফিরল। তাকে খুব ক্লান্ত পরিশ্রান্ত দেখে স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, “আজ সারাদিন আপনি কোথায় ছিলেন? উত্তরে সে বলতে লাগল, “সকালে কুফার শাসনকর্তা ইবনে যিয়াদের কাছে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়েই জানলাম যে জেল দারোগা মাশকুর নাকি মুসলিম বিন আকীলের ছেলে দুটিকে জেল থেকে ছেড়ে দিয়েছে। ফলে আমীর  ঘোষণা দিয়েছে, তাদের দু'জনকে যে ব্যক্তি ধরে এনে দিতে পারবে অথবা তাদের সন্ধান দিতে পারবে, তাদের ঘোড়াসহ প্রভূত সম্পদ পুরস্কার দেয়া হবে। ঘোষণা পেয়ে বহু লোক তাদের খোঁজে বেরিয়েছে। আমিও তাদেরকেই খুঁজতে চারদিকে চষে বেরিয়েছি। আর এতটাই দৌড়াদৌড়ি করেছি যে, আমার ঘোড়ারও দফারফা করেছি। নিরূপায় পায়ে হাঁটাহাটি করেই তাদের খুঁজতে হয়েছে। একারণেই আজ ক্লান্তির শেষ হয়েছে, শরীর জর্জরিত!” বিবি তাকে বুঝাতে লাগলেন, “ওগো আল্লাহর বান্দা, আল্লাহকে একটু ভয়তো করুন। রাসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) উনার বংশের বাচ্ছা দুটির ব্যাপারে আপনার এত ব্যস্ততা কী?” হারেস বলল, “তুমি চুপ করো তো! তোমার তো জানা নেই, ইবনে যিয়াদ ঐ ব্যক্তিকেই প্রচুর ধনরাজি বখশিশ দেবার ওয়াদা করেছে, যে এই ছেলেদের তার কাছে পৌঁছিয়ে দেবে অথবা তাদের সন্ধান দিতে পারবে।” 
স্ত্রী বলে উঠল, “কত না কমবখ্ত তারা, যারা দুনিয়ার ধন-সম্পদের লোভে দুটি এতিম শিশুকে দুশমনের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টায় রয়েছে, পার্থিব স্বার্থের বিনিময়ে পরকাল ধ্বংস করে দিচ্ছে!” হারেস বলল, “তোমার সে ব্যাপারে এত মাথা ব্যাথা কিসের ? তুমি আমার খাবার নিয়ে আস।” স্ত্রী খাবার নিয়ে আসলে সে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
—————-
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments

Popular posts from this blog

শুধু মুখে কলেমা পড়লে জান্নাত যাওয়া যাবেনা

মসনবী শরীফ বই - মউলানা রুমী (রহঃ)