কারবালা – ২৬



শামে কারবালা - (পর্ব- ২৬)
কারবালার ইতিহাস

ইমামে আলী-মাকাম'র যাত্রা– (পর্ব – ২)
আমর ইবনে সাঈদ ইবনে আস (যিনি ইয়াষীদের পক্ষে মক্কার গভর্ণর ছিলেন) তাঁর ভাই ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদের নেতৃত্বে কিছু ঘোড় সরওয়ারকে ইমামের কাফেলাকে বাধা দানের উদ্দেশ্যে পাঠালেন। যথানির্দেশ তারা কঠোর বাধা আরোপ করে। এমনকি তাদের ও ইমামের সঙ্গীদের সাথে মারপিঠ-সংঘর্ষও হয়। তারা আহবান জানান, হোসাইন, আপনি কি আল্লাহকে ভয় করেন না? মুসলিম জামাত থেকে আপানি নিষ্ক্রান্ত হচ্ছেন? উম্মতের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করতে যাচ্ছেনা?” তিনি উত্তর দিলোনা, 
“আমার কর্ম আমারই জন্য, তোমাদের কর্ম তোমাদের জন্য। তোমরা আমার কর্ম থেকে মুক্ত, আমি তোমাদের কর্ম থেকে ভিন্ন”।

'সাফফাহ' নামক জায়গায় আররেব বিখ্যাত কবি ফারাজদাক্ এর সাথে সাক্ষাৎ হল, তিনি তার কাছ থেকে ইরাকের অবস্থাদি জানতে চাইলেন, তিনি বললেন, “আপনি একজন জ্ঞাত ব্যক্তিকেই জিজ্ঞেস করলেন, হযরত তাদের অন্তর আপনার সাথে; কিন্তু তরবারীতো রয়েছে বনু উমাইয়ার সাথে। তার পরেও ঐশী সিদ্ধান্ত আসমান থেকেই আসে। আল্লহ্ যা চান, তা-ই করেন। 
ইমাম বলেন,
“সর্ববিষয় আল্লাহর হাতেই নিহিত, তিনি যা চান, করেন এবং আমাদের প্রতিপালকের প্রতিদিন রয়েছে নতুন জৌলুস, যদি আসমানী ফায়সালা আমাদের পছন্দের অনুকুলে হয়, হবে আমরা তাঁর নেয়ামতের শোকর আদায় করব। আর সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বেলায়ও তিনিই সাহায্যকারী ও সহায়ক। আর যদি ফায়সালা আশানুরূপ না হয়, তবে যে ব্যক্তির উদ্দেশ্য সৎ হয় এবং তাকওয়া (খোদাভীরুতা) হয় তার রহস্য, সে এটা দেখে না যে, ফয়সালা পক্ষে আছে, না বিপক্ষে।
✍🏻ইবনে আসীর পৃ. ১৬/৪ তাবরী, ২১৮/৬, আলবিদায়াহ ১৬৬/৮।

ফারাজদাকের সাথে আলাপ আলোচনার পর ইমামের কাফেলা অগ্রসর হতে লাগল । এমন সময় তাঁর ভাগ্নেদ্বয় হযরত আউন এবং মুহাম্মদ (রাদি.) তাঁদের পিতা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর (রাদি.) এর একটা চিঠি নিয়ে আসলেন এবং ইমামকে রাস্তায় পেয়ে চিঠিটা অর্পন করলেন, যাতে লিখা ছিল,

"আমি আপনাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে অনুনয় করছি, আমার এই চিঠি পাওয়ামাত্রই আপনি ফিরে আসুন, কেননা আপনি যেখানে যাচ্ছেন, সেখানে আপনার এবং আহলেবাইত তথা আপনার পরিবার-পরিজনের সর্বনাশ হওয়ার আশংকা রয়েছে। খোদা না করুন, আপনার যদি কিছু হয়ে যায়, তবে দ্বীনে ইসলামের আলো তো নিভে যাবে। আর পৃথিবীটা হারিয়ে যাবে চির অন্ধকারে। আপনি হেদায়তের অনুসারী পথপ্রদর্শক, ঈমানদারের আশার আলো, আপনি তাড়াহুড়ো করে রওয়ানা হবেন না। চিঠি প্রেরণের পরপর আমি নিজেও আসছি।”
✍🏻ত্বাবরী খণ্ড ৬, পৃ.২১৯

পুত্রদ্বয়ের মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়ে দিয়ে হযরত আব্দুল্লাহ মক্কার শাসনকর্তা আমর বিন সা'দের সাক্ষাতে স্বয়ং রওয়ানা হলেন। তার সাথে আলাচনা করে বললেন, আপনি আপনার পক্ষ থেকে ইমাম হোসাইনের কাছে একটি পত্র লিখুন, যাতে তাঁর নিরাপত্তাসহ তাঁর সাথে সদাচরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মক্কায় ফিরে আসার আমন্ত্রণ থাকবে।” আমর বিন সা'দ বললো, চিঠিতে বিষয়বস্তু আপনি নিজেই লিপিবদ্ধ করুন, তাতে আমার সীলমোহর দেয়া হবে।” কথামত আমরের জবানীতে হযরত আব্দুল্লাহ চিঠি প্রস্তুত করলেন। যার ভাষ্য নিম্নরূপঃ

“হুসাইন ইবনে আলীর প্রতি মক্কার গভর্ণর আমর বিন সা'দ” “আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি আপনাকে ঐ মনোবৃত্তি থেকে রক্ষা করুন, যাতে আপনাকে ধ্বংসের সম্মুখীন হতে হয়। তিনি আপনাকে ঐ পথ প্রদর্শন করুন যাতে আপনার জন্য কল্যাণ নিহিত। আমি জানতে পেরেছি যে, আপনি ইরাক অভিমূখে যাত্রা করছেন, আল্লাহর কাছে আমার এটাই প্রত্যাশা যে, তিনি আপনাকে অনৈক্য ও বিভেদ সৃষ্টি থেকে বাঁচিয়ে রাখুন, কারণ, তাতে যে, আপনার ধ্বংসের আশংকা রয়েছে। আমি আপনার কাছে আব্দুল্লাহ ইবনে জা'ফর এবং আমার ভাই ইয়াহ্ইয়া বিন সা'দকে পাঠাচ্ছি, আপনি তাদের সাথে ফিরে আসুন, আমি আপনার নিরাপত্তা দিচ্ছি। আপনার সাথে আমি উত্তম আচরণ এবং সৌজন্যমূলক ব্যবহার করবো। আল্লাহ স্বাক্ষী এবং তিনিই কার্যসম্পাদনকারী।”

চিঠিতে আমর সীল করে দিলে তা নিয়ে হযরত আব্দুল্লাহ এবং ইয়াহ্ইয়া ইমাম (হুসাইন রঃ) এর কাছে উপস্থিত হলেন।

তিনি এ চিঠি পড়লেন এবং ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানালেন। তখন আব্দুল্লাহ বললেন,ব্যাপারটি কী? আপনি ফিরে না যাওয়ার জন্য এভাবে জেদ ধরলেন কেন? উত্তরে ইমাম বললেন,
“আমি রাসুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে স্বপ্নে দেখলাম। সেই স্বপ্নে তিনি আমাকে এমন একটি নির্দেশ দিয়েছেন, যা আমাকে পালন করতেই হবে। হোক তার ফলাফল আমার পক্ষে কিংবা বিপক্ষে।” 
বাকী উভয়জন বললেন, “কিন্তু স্বপ্নটা কী?” উত্তরে ইমাম বললেন, “সেই স্বপ্নের বৃত্তান্ত আমি কাউকে বর্ণনা করিনি এবং করবও না, যতক্ষন না আমি আমার প্রভূর সাক্ষাতে মিলিত হই।”

“দুই ভুবনের দৌলত যদি যায়, যাবে তায় কি? 
মোস্তফারই এই যে দামান হাত থেকে যায় কি?”

অতঃপর তিনি আমর বিন সা'দের এ চিঠির উত্তরে লিখেন, 
“যে আল্লাহর পক্ষে (মানুষকে) আহবান করে, আর নেক আমলও সম্পাদন করে, সে আল্লাহ ও তার রাসুলের বিরুদ্ধাচরণকারী কিভাবে হতে পারে ? নিংসন্দেহে আমি একজন মুসলমান। আপনি আমাকে নিরাপত্তা, সৌজন্য এবং সদাচরণের উদ্দেশ্যে আহবান করছেন। শুনে রাখুন, আল্লাহর নিরাপত্তাই সর্বোত্তম নিরাপত্তা। যারা দুনিয়াতে আল্লাহকে ভয় করে না, কিয়ামতে আল্লাহ তাদের নিরাপত্তা দেবেন না। আল্লাহর কাছে আমার প্রার্থনা তিনি যেন দুনিয়াতে তাঁকে ভয় করে চলার তাওফীক দেন, যাতে কিয়ামতের দিন তাঁর নিরাপত্তার যোগ্য হতে পারি। এ চিঠি আপনি যদি বাস্তবিকই আমার সাথে সৌজন্য ও ভদ্রতার সদুদ্দেশ্যে লিখে থাকেন, তবে আল্লাহ্ তা'লা আপনাকে উভয় জগতে উত্তম পুরষ্কার দিন। সালামান্তে .......
✍🏻ত্বাবরী খণ্ড ৬, পৃ. ২১৯  

মুসলমান, আশেকে রাসূল (সল্লল্লাহু আলইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) গভীর উপলব্ধির বিষয় হচ্ছে, ইমামে আলী মাকাম (হুসাইন রাদিয়াল্লাহু) কে তাঁর বন্ধু-বান্ধব, সহচরবৃন্দ এবং শুভাকাংখীরা একান্তই ভক্তি মুহাব্বতের কারণে কতই না বুঝাতে চেয়েছেন, জোর দিয়ে বলেছেন যে, আপনি কুফা যাবেন না। কুফাবাসী অকৃতজ্ঞ, তাদের মুহাব্বতের দাবী মুখেই সীমাবদ্ধ, অন্তরে বা কার্যতঃ এরা তা দেখাতে পারবে না। শুভাকাংখীদের এ পরামর্শ ছিল নিঃসন্দেহে আন্তরিকতাপূর্ণ। ইমামের পবিত্র উদ্দেশ্যের সাথেও তাদের কোন দ্বন্দ্ব ছিল না। বরং কুফাবাসীর বিশ্বাসঘাকতার আশংকায় তারা মনে করেছিলেন যে ইমাম (হুসাইন) দুঃখ কষ্টের সম্মুখীন হয়ে যাবেন। তাদের মনে এ ভয়ও বিরাজ করছিল যে, খোদা না করুন, ঘটনাচক্রে যদি ইমাম স্বয়ং শহীদ হয়ে যান, তো ইসলামের আলো নিভে যাবে, দুনিয়া অন্ধকারে ছেয়ে যাবে। আর আমরা নবীজির প্রিয়দৌহিত্র, আমাদের মুক্তির দিশারী, আমাদের একান্ত আশ্রয়স্থল ইমামহারা হয়ে যাবো। কিন্তু শত জীবন উৎসর্গ হয়ে যাক, ইমামের সামনে তো নানাজান, যাঁর আশ্রয়ে জ্বীন- ইনসান, হুযুর মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ সল্লল্লাহু আলইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র বাণীর হাতছানি, যার বাস্তবায়ন তিনি যে কোন মূল্যেই করে যাবেন, পরিণাম যেটাই আসুক, কার্যত তিনি তা করেই দেখিয়েছেন।

আজকাল সত্যের অপলাপকারী, অসাধু এবং জাহিল লোকেরা, যারা এই জাতীয় পূণ্যাত্মাবর্গের মুহাব্বত থেকে বঞ্চিত, প্রেমের গুঢ়রহস্য মা'রেফাতের অন্তর্নিহিত তত্ত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ন অজ্ঞ, তারা নিজেদের দূভার্গ্য ও মন্দ নিয়তির কারণে ইমামে আলী মাকামের প্রতি নানারকম অপবাদ, অনুচিৎ দোষারোপ করে চলেছে। (নাউযুবিল্লাহ) ইমামে আলী মাকামের উচ্চতর মর্যাদা এবং তাঁর সুমহান | কীর্তির প্রকৃতরূপ কতটুকুইবা অনুধাবন করা যাবে? ইমামের বাণী তো শুনুন, ন্যায় সততার উপর তাঁর দৃঢ়তা দেখুন, নিঃসন্দেহে তিনি অনাগত প্রজন্মের জন্য আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। নিজের কর্মকান্ডে প্রমাণ রেখেছেন যে, এভাবেই জালিম- অত্যাচারীদের সামনে সত্যের বাণী উচ্চারণ করা যায় এবং এভাবেই সত্য-ন্যায়ের পতাকাকে উড্ডীন রাখা হয়। মর্যাদায় যেমন তিনি অনেক উচ্চে ছিলেন, তেমনি তাঁর মহান কর্মকান্ডেরও প্রতিফলন দেখিয়েছিলেন। তিনি দেখিয়ে দিলেন যে, পতনধর্মী বিপদ-আপদ, অসহনীয় দুঃখ যাতনাও আমার পায়ের মাটিতে সামান্য কম্পনও জাগাতে পারেনা। জীবন মৃত্যু তাঁর পায়ের ভৃত্য। দুনিয়ার জন্য তিনি সবক রেখে গেছেন সত্যিকার দরদী বন্ধুর জন্য নিজের সর্বস্ব কুরবান করে দেয়া, তাঁর জন্য সব লাঞ্চনা ও যন্ত্রনাকে হাসিমুখে সহ্য করে যাওয়া এটা আদৌ কোন পরাজয় নয়, এটা অমর্যাদার কিছু নয়, এটা অতি উঁচু মর্যাদার বিজয় এবং উভয় জগতের ইয্যত। বরং

“তোমার যেটা নসীব হলো কারবালার ওই ময়দানে, 
সাফল্য আর শাহাদতে সালাম জানায় সম্মানে।
 সহস্র এ ভক্তি ও প্রেম, অকুণ্ঠ এ শ্রদ্ধা লও,
উম্মতে আজ সালাম কহে, তোমার পায়ে ঠাঁই মানে”। 

ইবনে যিয়াদ দুরাচারের নিকট খবর পৌঁছে গিয়েছিল যে, ইমামের কাফেলা কুফার দিকে ইতিমধ্যেই রওয়ানা হয়ে গেছেন এবং ক্রমান্বয়ে 'মনযিল' অতিক্রম করে চলেছেন। সে ঐ কাফেলার গতিরোধে পদক্ষেপ নিতে শুরু করল। 

এক পর্যায়ে সে পুলিশের সর্বোচ্চ ব্যক্তি হাছীন ইবনে নুমাইর তমীমীকে নীলনকশা বাতলে দিয়ে সৈন্য-সামন্ত সহকারে পাঠিয়ে দিল। হাছীন বিন নুমাইর কাদেসিয়া পৌঁছে সৈন্যদেরকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দিল। রাস্তার যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। কিছু আরোহী বাহিনীকে তথ্য সংগ্রহের জন্য আগে পাঠিয়েদিল। যাতে ইমামের গতিবিধির খবরও মিলতে থাকে এবং কুফাবাসী আর ইমামের মধ্যে সংবাদ আদান-প্রদানের যোগসূত্রিতাও সৃষ্টি হতে না পারে।

(পরবর্তী পর্ব – হযরত কায়েস (রাদিঃ) এর শাহাদত)
———————
#শামে_কারবালা
#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

Comments

Popular posts from this blog

শুধু মুখে কলেমা পড়লে জান্নাত যাওয়া যাবেনা

মসনবী শরীফ বই - মউলানা রুমী (রহঃ)