কারবালা – ৬৫



কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৬৫)

📚শামে কারবালা

****************

যেভাবে একের পর এক শহীদ হলেন – ৯

হযরত মুহাম্মদ ও আউন—


চার ভ্রাতুষ্পুত্রের শাহাদাতের পর আবদুল্লাহ ইবনে জাফর ত্বাইয়ার এর দুই পুত্র ইমাম আলী মাকাম এর আপন ভাগ্নেদ্বয়, হযরত সাইয়েদা যয়নবের কলিজার টুকরোদ্বয় হযরত মুহাম্মদ এবং আউনের পালা আসল। 'বাগে যাহরা'র দুটি জান্নাতী ফুল এগিয়ে এসে আরয করল, 'মামাজান, আমাদেরও উৎসর্গ হবার অনুমতি দিন।' ইমামে পাক বললেন, 'না, তোমাদের জন্য অনুমতি নেই, আমি তোমাদেরকে এ জন্য সাথে নিয়ে আসিনি যে, নিজের চোখেই তোমাদের তীরের লক্ষ্য হতে এবং বর্শার মাথায় তড়পাতে দেখব। তোমরা তোমাদের মায়ের সাথে, থেকো।' মুহাম্মদ এবং আউন বলল, 'মামা হুযুর, আম্মাজানের নির্দেশ এটাই। দেখুন, উনিও সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।' ইমামে পাক নিজ সাহোদরা সাইয়িদা যয়নবকে লক্ষ্য করে বললেন, “প্রিয় বোন আমার, একটু খেয়াল করো। আমার উপর আঘাতের পাহাড় কেন?” আমি কোন্ চোখে এই ফুলের মত বাচ্চাদের বুক তীর বর্ণায় ছেদ হতে দেখব? সাইয়িদা যয়নব বলতে লাগলেন, “ভাইয়া, প্রিয় ভাই আমার, আমি ক্ষুদ্র বলেই কি আমার এ সামান্য উপহারটুকু গ্রহণ করবেন না? আপনি যদি আমার এ উপহার গ্রহণ না করেন, তবে আম্মাজান ফাতিমা যাত্রাকে কী জবাব দেব? যখন তিনি প্রশ্ন করবেন, “বেটি, ঐ কঠিন সময়ে তুমি কী নযরানা দিয়েছিলে, যখন সরওয়ারে কাওনাইন'র শাহজাদার সমীপে সবাই জানের নযরানা পেশ করছিল? দেবার মত এ দুটি সন্তানই শুধু আছে। দু'জনকেই আপনার চরণে উৎসর্গ করলাম।” 

বলতে বলতেই সাইয়িদার কণ্ঠ কান্নারূদ্ধ হয়ে পড়ে। ইমামে পাক সজল চোখে নিজের বোনকে দেখলেন। হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। ভাগ্নেদ্বয়কে বুকে জড়িয়ে নিলেন। বিদায় দেবার সময় মা তাকিয়ে রইলেন, আমার নয়নের তারা দুটি ইয়াযিদী যজ্ঞে আত্মাহুতি দিতে চিরতরে চলে যাচ্ছে। তারা যাবার সাথে সাথেই তো নেকড়ের পালের মত দুশমনেরা ঝাঁপ দেবে এবং এদের ছিন্ন ভিন্ন করে ছাড়বে। কিন্তু ধৈর্যশীলা মা জননী নিজ বুকে হাত রাখলেন, আর আসমানের দিকে মুখ তাকিয়ে বললেন, “মাওলা, তোমার সন্তুষ্টিতে আমিও সন্তুষ্ট।


যাহরা কাননের বেহেশতী ফুল জা'ফর তাইয়ার'র পৌত্র, মাওলা আলী'র দৌহিত্র যুদ্ধ ক্ষেত্রে আসলেন। শত্রুর সামনে এসে বললেন, 

“শোনো আমাকে চিনে রাখো,

দাদা আমার দোজাহানের সম্রাটেরই ইয়ার, 

ভূবন জয়ী ফখরে আরব, জা'ফরে ত্বাইয়ার।

প্রিয় নবীর জ্ঞান-গরিমার অংশে পেলেন বর, 

রক্তে সাদা চকমকে যার উদ্যত খঞ্জর।

আল্লাহ থেকে পেলেন যিনি হাতের বিনিময়, 

জমরুদেরই ডানা তাঁকে দিলেন দয়াময়।

নানা আমার শেরে খোদা দুই কুলে সহায়,

দ্বীনদার ও সমৃদ্ধি দুই কুলে পান তায়।

উভয় কুলের রহস্য ও বেলায়তের রাজ,

আসমানে যে রাজ পোশাকে ধাঁধায় মাথার তাজ। 

ভেবো না যে নেইকো বেঁচে, আজ সে ইয়াদুল্লাহ্ (রাদি.)

আমরা আছি সিংহ-তনয়,নেই আসাদুল্লাহ্ (রাদি.)।”


উভয় রণাঙ্গনে এমন কুশলীর পরিচয় দিলেন যে, শত্রুর সারিতে রীতিমত শোরগোল পড়ে গেল। শেষতক বহু ইয়াযিদীকে মেরে কেটে নিজেরাও তীর তলোয়ারের নিশানা হয়ে বেহেস্তে যাত্রা করলেন। হযরত আউনকে আবদুল্লাহ বিন কিবতা ত্বাঈ এবং হযরত মুহাম্মদ (রাদি.) কে আমের বিন নাহ্শাল শহীদ করেছিল। ইমামে পকের সহযোগিরা তাঁদের লাশগুলো উঠিয়ে নিয়ে তাঁবুর পাশে রাখলেন।


লাশের কাছে এসে ইমাম বলেন, “ভাগ্নেরা, দেখো আজো বেঁচে আছি মামা বুকচেরা।

তোমরা আমার বুকের মায়ায় ছিলে বীর জোয়ান, 

ছিলে বুকের সাহস হয়ে, হে ভূষিতপ্রাণ! 

হাত তুলে হে বাছারা মোর একটু কথা কও, 

উঠে এসে বুকে লাগো, একটু মায়া দাও।”


ইত্যবসরে সাইয়িদা যয়নবও কাছে আসলেন। ইমামে পাক বললেন, 'নাও বোন, তোমার কুরবানী ও মঞ্জুর হয়ে গেছে। শহীদ সন্তানের মুখ দেখে যাও।” মা যখন নিজ সন্তানদের কাঁটা ছেড়া লাশগুলো দেখলেন, তখনই লাশের উপর আছড়ে পড়ে বলতে লাগলেন, 'বাছারা আমার, হায় !তোমাদের জায়গায় যদি তোমাদের মা যেতে পারতাম! (রাদি.)


Comments

Popular posts from this blog

শুধু মুখে কলেমা পড়লে জান্নাত যাওয়া যাবেনা

মসনবী শরীফ বই - মউলানা রুমী (রহঃ)