কারবালা – ৩৮



কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৩৮)
📚শামে কারবালা

কারবালার ময়দানে – 
মোট কথা ইমামে পাক চলতে চলতে ২রা মুহাররাম ৬১ হিজরী সনে বৃহস্পতিবার নিজের সঙ্গীসাথী ও পরিবার পরিজন নিয়ে এ ময়দানে তাঁবু গাড়লেন। হুরও তাঁর সামনাসামনি তাঁবু গেড়েছিল, যদিও হুরের অন্তরে আহলে বাইতে নবীর মর্যাদা নিঃসন্দেহে সমুন্নতই ছিল এবং সে নামাযসমূহ তাঁরই পেছনে আদায় করছিল; কিন্তু ইবনে যিয়াদের নির্দেশে সে নিরুপায় ছিল। এবং সে এটাও জানতো যে, আমি যদি ইমামের সাথে কোনরূপ সদয় আচরণ করি, তবে এক হাজার সৈন্য সামন্তে পরিবেষ্টিত হয়ে সেটা লুকানো অসম্ভব। আর ইবনে যিয়াদ তা জানতে পারলে ক্ষমা তো করবে না; বরং কঠিন শাস্তি দেবে। একারণে সে ইবনে যিয়াদের হুকুমই বরাবর পালন করে যাচ্ছিল। যদিও কোন কোন কিতাবে এমনও আছে যে, হুর শুভ নিয়তির সুবাদে তাঁর সাথে গোপন সাক্ষাৎ করে একজন শুভাকাংখী হিসাবে বলেছিল যে, ইবনে যিয়াদের অনেক সৈন্য এসে ঘিরে ফেলছে, সুতরাং এটাই আপনার জন্য সমীচিন হবে যে, আপনি রাতের অন্ধকারে এখান থেকে সরে পড়ুন, আমি আপনার পিছু নেবনা, এরপর আমার উপর যা-ই আসুক আমি সয়ে নেব।”
ইমামে পাক সঙ্গী সাথীদের নিয়ে রাতের ভাগে যাত্রা শুরু করেছিলেন, রাতে চলতে চলতে ভোরে সেই স্থানেই নিজেদের আবিষ্কার করলেন, যেখানে থেকে গতরাত যাত্রা করে ছিলেন। (সা আদাতুল কাওনাইন) এ অবস্থা এবং সেই জনহীন মরু প্রান্তরের উদাস, বিষণ্ন পরিবেশ লক্ষ্য করে ইমাম পাক জিজ্ঞেস করলেন, “এ স্থানের নাম কি?” লোকেরা উত্তর দিল, এ জায়গার নাম 'কারবালা'। বলা হয়,” যেই মাত্র তিনি 'কারবালা' শব্দ শুনলেন, বললেন,
“এটাতো 'কারব’(দুঃখ) ও 'বালা' (বিপদ), এখানেই আমাদের সফরের মালপত্র রাখার এবং বাহন জন্তু গুলোকে বসানোর স্থান, আমার স্বপক্ষের লোকজনদের কতল হওয়ার স্থান।”
“এই যমীনের নাম হলে ঠিক কারবালা, 
সইতে হবে ভাগ্যে যা সে হরবালা। 
আলে নবীর বুকেই হেথা তেগ হানে, 
মাতম করে নবীর খুনে, সয় জ্বালা। 
কঠিন বিপদ,চোখ ফেটে বয় অশ্রু আর, 
জলে স্থলে কান্না, মলিনমুখ লালা।”
“খুন বহাবে শত্রু মোদের এই সে যমীন কারবালা, 
ফিরবোনা আর যিন্দা মোরা, মরবো করে সব পালা। 
হেথায় দেবো পরীক্ষা সব নবীর প্রিয় পরিজন, 
তৃষ্ণা বুকে, শির কাটাবে হেথায় তাঁরই সব স্বজন।” 
'”কারবালা' তার নাম বুঝিবা এই তো হেরি সেই যমীন,
শিশুর মূখেও দেয় না পানি, রক্তে নদী হয় রঙিন।
নবীর ঘরের দুলাল সবে শহীদ হবে এক এক জন, 
লাশ হয়ে সব উঠবো, করুণ চক্ষে চেয়ে রয় গগণ।” 
এমন বেদনাদায়ক কথাবার্তা শুনে তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত আলী আকবর (রাদিঃ) আরজ করলেন, “আব্বা এ আপনি কী বলছেন?” বললেন, “প্রিয় বৎস, যখন তোমার দাদাজান আলী (রাদিঃ) সিফফীনের যুদ্ধ থেকে ফিরছিলেন, তখন এখানে পৌঁছে বলেছিলেন, আমার নয়নমনি, কলিজার টুকরা হুসাইনকে চরম অসহায় অবস্থায় এখানেই শহীদ করা হবে।” 
তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “বেটা, তখন তুমি কী করবে?” আমি বলেছিলাম, “ধৈর্য ধারন করবো” তিনি বল্লেন, “হ্যাঁ, ধৈর্যই ধারন করবে। কেননা “ধৈর্যশীলদের ধারনাতীত পুরষ্কার দেয়া হবে।”
(📚রাওদ্বাতুশ শুহাদা-১৬৩)
তাঁবু খাটানোর জন্যে যখন (কারবালার) মাটিতে খুঁটি গাড়া হচ্ছিল, তখন মাটির নিচে তাজা রক্ত বের হচ্ছিল। এ পরিস্থিতি দেখে ইমাম পাকের সহোদরা সাইয়্যিদা যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, “ভাইয়া, এটাতো রক্তাক্ত যমীন, এখানেতো মনে ভয় হচ্ছে।” তিনি বললেন, “আল্লাহর ইচ্ছাতে রাজী হয়ে এখানেই মনযিল করো, এটাই শহীদানের (নির্ধারিত) জায়গা এবং প্রতিশ্রুত জায়গা। আমাদের সর্বাবস্থায় ধৈর্য্যধারণ করতে হবে।
শুধুই ব্যথার তৃষ্ণা আছে এই যে প্রেমের উপত্যকায়, তৃষ্ণাতুরের রক্তস্রোতে তার বালুকা সব ভেসে যায়।
“জিজ্ঞাসিলে হযরতে কেউ বসত কোথা, বলেন তিনি, 
মদীনারই মানিক এখন কারবালাতেই বসত মানি।” 

পরবর্তী পর্ব–
আমর বিন্ সা এর নেতৃত্বে বাহিনী

Comments

Popular posts from this blog

শুধু মুখে কলেমা পড়লে জান্নাত যাওয়া যাবেনা

মসনবী শরীফ বই - মউলানা রুমী (রহঃ)