কারবালা – ৬৭



কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৬৭)

📚শামে কারবালা


যেভাবে একের পর এক শহীদ হলেন – ১১

হযরত সাইয়্যেদুনা আলী আকবর (রঃ)


পরিস্থিতি এখন এমন পার্যায়ে আসল যে, পাষাণ দিলও ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাবো। সাহারা সঙ্গী হীনতার শেষ পর্যায়। সত্তর জনের মত আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, পরিবার পরিজন এর প্রায় সকলের শাহাদাতশেষে মর্মান্তিক ও হৃদয় বিদারক এক দৃশ্যের অবতারণা হল। হোসাইন কাননের একান্ত বস্নিগ্ধতা, নবীকুঞ্জের মায়াবী পুষ্প, আলীর নয়ন জ্যোতি ফাতেমার বুকের প্রাণস্পন্দন, পিতার অসহায় মুহূর্তে একমাত্র সহায়, পুরো পরিবারের চোখের মণি, নবীজির আহলে বাইতের উজ্জ্বল প্রদীপ, অবিকল নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এর অবয়ব হযরত আলী আকবর (রাদি.) কে দেখলে নূর নবীজির চেহারা পাকই যোনা সামনে এসে যেত, আঠার বছরের টগবগে তরুণ, ভগ্নমনোরথ পিতার সামনে মূর্ত আবেদন হয়েই আরজ করলেন, আব্বা হুজুর, আমাকেও অনুমতি দিন, আমিও সত্যের পথে আত্মাহুতি দিতে চাই। চাই আপনার জন্য উৎসর্গী হবার সৌভাগ্য ।


আরজ করে আকবরে, চাই যুদ্ধ যাবার আজ্ঞা হোক,

চাই সে পথের নির্দেশনা, কোন্ পথের যায় স্বর্গে লোক। 

আব্বা আমার সব মমতা, মন থেকে দিন দূর করে, 

আম্মাজানের অনুমতি আদায় করে দিন মোরে। 

আপনার আগে যুদ্ধে এ শির কাটাতে চায় এই অধীন, 

বাবার আগে মরলে সেজন অমর থাকে রাত্র দিন।”


ব্যথিত মনে পিতা তাঁর প্রিয় পুত্রের দিকে তাকালেন। বললেন, “বাবা, তোমার আমি কীসের অনুমতি দেব? তীর তালোয়ারের ঘায়ে ক্ষত বিক্ষত হতে? বৎস, তুমি তো নানা জানের প্রতিচ্ছবি। কোন্ চোখে আমি তাঁরই নূরানী আদলকে রক্তে ধুলায় লুটোপুটি খেতে, আর চলে যেত দেখবো? আমার চোখের মণি, তুমি যেওনা, আমাকেই যেতে দাও। এরা আমারই রক্তের পিপাসু! তাদের পিপাসা যে শুধু আমারই রক্তে নিবারণ হবে।” নবীর সদৃশ (আকবারা) সবিনয়ে আরজ করলেন, “বাবা, আমি আপনার বিচ্ছেদ নিয়ে বাঁচতে চাই না। আমাকে ওই হীনচক্রের কয়েদী বানিয়ে ছেড়ে যাবেন না; বরং নানাজান হুজুর সরওয়ারে দোজাহান (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এবং বাবা আলী মূর্তজা (রাদি.)'র সান্নিধ্যে বেহেশতে পৌঁছিয়ে দিন।” হায় আল্লাহ! কতো বড় সে পরীক্ষা ছিল, যা ফাতেমার দুলাল ধৈর্য্য ও সংযমের মাধ্যমে অতিক্রম করেছিলেন। তিনি বললেন, 

“বেটা, আল্লাহ্ তায়ালা ও তাঁর রাসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এর সাথে আমি অঙ্গীকারাবদ্ধ, নচেৎ তোমার মত অমূল্য রত্ন এ সন্তানকে মাটিতে লুটে গড়াগড়ি খেতে কে দেবে? ঠিক আছে, যাও বাবা! হুসাইন (রাদি.) ও আজ পাষানে বুক বেঁধেছে। দেখছি, পরীক্ষার শেল কত ভারী হয়।" সুন্দরকুলের সুন্দরতম হযরত ইউসুফ (আ.) এরও প্রিয়তম প্রেমাস্পদ আখেরী নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)'র দৌহিত্র হযরত হুসাইন (রাদি.) ওই সুন্দর যুবকপুত্র, মাহবুবে খোদা সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম এর সাদৃশ্য-অবয়ব ঐ হতভাগ্য (ইয়াযিদী) দের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, যেখান থেকে এ পর্যন্ত কেউ ফিরে আসছিল না। ওই সময় ইমামে পাক তো বলেননি যে, বেটা, আমার চোখে পট্টি বেঁধে দাও।” এখন হযরত ইবরাহীমও ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম) কে সালাম জানিয়ে, তাঁদের আহ্বান করে বলতে ইচ্ছে করছে, আমাদের শেষ নবীর দৌহিত্রের ধৈর্য্য তো দেখুন!

কারবালার মজলুম নিজ হাতে আঠার বছরের সৌম্য তরুণপুত্রকে রণসাজে সজ্জিত করলেন । ঘোড়ায় আরোহন করিয়ে বললেন, বেটা, যাও, জান্নাতে পৌছে নানাজানের খেদমতে আমার সালাম বলবে। আব্বা আলী মূর্তুজা ও আম্মাজান ফাতেমাকেও সালাম জানাবে।” হযরত আলী আকবর নিজ পিতাকে এবং তাঁবুতে অপেক্ষমান কষ্টকাতর বিবিদেরকে সালাম জানালেন। অতঃপর যুদ্ধের ময়দানে রওয়ানা হলেন। ওই সময়ে ইমামে পাক ও আহলে বায়তের পাক বিবিগণ এবং বাচ্চাদের উপর যে বাড় বয়ে গিয়ে ছিল, নিঃসন্দেহে তাতে আল্লাহ্র আরশ দুলে উঠেছিল।

সন্তানের এ বিচ্ছেদ এমন, 'উহ্' করাও যাচ্ছে না, তাদের ছিল সংখ্যা এমন, হিসাব করাও যাচ্ছে না। ব্যথার ক্ষতও ছিল এমন, মুখে বলাও যাচ্ছে না, আঘাতগুলো ছিল এমন নিজে নেয়াও যাচ্ছে না। 

“পুত্র হারার দুঃখ কেমন হুসাইন থেকে নাও জেনে, 

যুবক ছেলের কী বিরহ, চাও তো পিতার বুক পানে।”


বিরহ কাতর, যন্ত্রণা ক্লিষ্ট মা তরুণ ছেলেকে বিদায় দেবার সময় বলছিলেন,

“আলী আকবর, আমার শ্রমের কথাটা কিন্তু মনে রাখো, 

শান্ত বাগান উজার করো না, মিনতি আমার শুনে রাখো। 

মায়েরে একেলা ছেড়ে গো মানিক, চিরতরে তুমি যেও না ধন, 

যুগ যুগ তুমি বেঁচে থেকো, মরি, আমারে আগে তো করো দাফন। 

মা যতকাল বেঁচে আছি এই, হয়োনাকো তুমি ঘরের বার 

তুমি যদি বাপু, যাও গো চলেতো কী হবে আমার জানাযা’র?” 


তাঁবু ছেড়ে আসে আলী আকবর, পেছনে মায়ের কান্নাস্বর, এগিয়ে দিতে যে আব্বা আসেন ফেটে যায় বুঝি সে অন্তর। অপূর্ব সে এক যাত্রা ছিলো যে, পয়গম্বরের ছবি তো যায়, পেছন ফিরে সে দেখে নেয়, ফের জননী পিছে না ছুটে তো হায়। 

“মায়ের কান্না বিলাপ হয়ে সে বাজিছে কানেতে বারংবার, 

দীর্ণ করে কী হৃদয় সে সুর, ফাটে না এমন সে বুক কার? 

এবার তিনি ইয়াযিদবাহিনীর মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন। খোদাপ্রদত্ত নূরের জ্যোতিতে যুদ্ধ ক্ষেত্র জ্বলজ্বল করছিল, উজ্জ্বল ললাট থেকে নবীর রূপচ্ছটা যেন বিকীর্ণ হচ্ছিল, চেহারার চমক রণক্ষেত্রে আলোর ভূবন রচনা করছিল।


সদরুল আফাযেল হযরত মাওলানা সাইয়িদ মুহাম্মদ নঈমুদ্দীন মুরাদাবাদী। (রহ.) কতই না সুন্দর করে বর্ণনা করেছেন,


“বু তুরাবের তনয় তিনি হুসাইন বুকে মানিক ধন, 

শেরে খোদার সিংহ শাবক, বীরকুলে অতুল রতন। 

অপূর্ব সে বীরের ছবি, তেজস্বী দেহের গড়ন, 

সুবাসভরা সে কেশরাজি, সূর্যমুখী সেই বদন। 

শাহ্জাদা সে বীর তনয়, আলী আকবর সুদর্শন, 

রূপ কাননে পুষ্প সেরা, উছলে পড়ে সে যৌবন। 

চেহারাতে ফুটছিল কী জীবন রবির সেই কিরণ, 

হযরত আলীর বীরত্বে সে উদ্ভাসিত সেই নয়ন। 

মরুর যমীন কুফায় যেন চমকে সে আলোর ভূবন, 

যখন এলো যুদ্ধ সাজে মা ফাতেমার চাঁদ-বদন। 

মর্যাদারা সুযশ গায় আর সাহস কয় অভিবাদন, 

বীরত্বেরা লাগাম টানে, হিম্মতে আগলে চরণ।

কৃপাণ হবে মরন দ্যুতি, পৌরুষের আজ হয় মরণ, 

চোখ তুলে চায় সেদিক পানে কার সে সাহস হয় এমন? 

শত্রু কুলে ভয় জাগে কী! কাঁপছে যেন বীর চরণ, 

বীরের মাঝে শংকা জাগে সাহসহারা হয় যে মন। 

শোর পড়ে যায় এমন যুবক দেখছে কি কেউ কখন? 

বীর বাহাদুর জগত কুলে জন্মেবুঝি কেউ এমন ? 

বিদীর্ণ হয় মাথার খুলি, কৃপাণ হানে কোপ যখন, 

শরস্ত্রান ও বর্ম লোহার যায় উড়ে যায় সেই সে ক্ষণ। 

বজ্র হানে, বিজলী খেলে, তালোয়ারে মার এমন, 

শয়তানেরে উল্কা ছোঁড়ে, উথাল পাথাল হয় গগন। 

যুদ্ধ কলা, শৈলী রণের, দেখো নঈমের নয়ন, 

আবাল বৃদ্ধ অবাক মানে, আকবরের এ কেমন রণ!


কারবালার ময়দানে আলী (রাদি.) পৌত্র কৃপান উম্মুক্ত করলেন, যার দ্যুতি চোখ ধাঁধিয়ে গেল। বীর ব্যঞ্জক কবিতা আওড়ালেন,

“আমি হুসাইন ইবনে আলীর বেটা নাম আলী আকবর 

মোরা নূর নবীজির আহলে বায়ত তাঁর নিজস্ব ঘর। 

সব বর্শা কি তীর ছুঁড়বো এমন, নয় যা লক্ষ্যচ্যুৎ, 

দেখো, হানব আস মোর পিতারে রক্ষে যা মজবুত। 

হবে বীর হাশেমী নওজোয়ানের সেই সে কৃপাণ তেগ, 

আমি সেই হাশেমী, আহলে বায়তে এমনি জোশ, আবেগ।


কবিতার এ পংক্তি আওড়ানোর পর তিনি আল্লাহ্র নামের এক হায়দরী হুঙ্কার দিয়ে বললেন, 

“রে দুরাচার, যদি তোরা নবী বংশের রক্তেরই পিপাসু হয়ে থাকিস, তবে তোদের মধ্যে বীর যোদ্ধা যে, তাকে ময়দানে পাঠিয়ে দে”। হায়দরী বাহুর ত্বাকৎ দেখতে চাস, তো আয় আমার সাথে লড়তে।” 

কিন্তু সামনে বাড়ার মত এমন হিম্মত কার আছে? কার বুকে এমন ছতি আছে, যে একাকী সেই নরশার্দুলের সামনে আসে। যখন তিনি দেখলেন যে, কেউ এগিয়ে আসছে না, দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হওয়ার মত সাহস তাদের কারো নেই, তখন তিনি লাগাম টেনে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন। আর বিদ্যুৎ গতিতে হামলা শুরু করে দিলেন। যে দিকেই তিনি অগ্রসর হতেন, দুশমনের দল ভেড়া বকরীর পালের মত পালাতে দেখা যাচ্ছিল। এক একটি ঝটিকা আক্রমনে বহু মাথা কাটা পড়তে লাগল। একবার ডান পাশে এগিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করেন, আবার বাম পাশে হামলা করেন তো তারা দিগবিদিক ছুটতে থাকে। আরেকবার মাঝখানে চক্কর মেরে লাশের স্তুপ রচনা করেন। এবার চতুর্দিকে শোর পড়ে যায়। বীর কুলের হৃদস্পন্দন যায় থেমে, বাহাদুরেরা হিম্মত হারায়। আহলে বায়তের এ রাজপুত্রের হামলা তো নয়, যেন ইয়াযিদীদের উপর নেমে আসা আল্লাহর আযাব। মরুর বুকে সূর্যের তাপে লড়াই করতে করতে নবীকুঞ্জের সজীব পুষ্পে তৃষ্ণা প্রবলতর হয়ে উঠল। ঘোড়া ঘুরিয়ে শ্রদ্ধেয় পিতার খেদমতে হাজির হয়ে আরজ জানালেন, (আব্বা, বড়ই পিয়াস) "পিপাসার যন্ত্রণায় যে অস্থির হয়ে গেলাম। এক পেয়ালা পানি পেলে এদের সব কটিকেই মৃত্যুর ঘাটে পৌঁছিয়ে দিতাম।” ইমামে পাক নিজের নয়নমণিকে তৃষ্ণার্ত দেখলেন; কিন্তু শাহাদত পিয়াসী এ সন্তানকে দেবার মত পানিই বা কোথায়? স্নেহ সিক্ত হাতে সন্তানের রক্তিম চেহারা থেকে ধুলো ময়লা মুছে সাফ করে দিলেন। বললেন, “বেটা, তৃষ্ণা মেটাবার সময় তোমার এখন ঘনিয়ে এসেছে। এবার কাওসার পরিবেশন কারীর হাত থেকে কাওসারের পেয়ালা পান করতে পাবে। যার স্বাদ না কল্পনা করা যাবে, না মুখে বর্ণনা করা যাবে। এর পর পিপাসা তোমাকে আর কষ্ট দেবেনা। প্রিয় বৎস, (শৈশবে) আমি কখনো পিপাসার্ত হলে রাসুলাল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আমার মুখের মধ্যে তাঁর পবিত্র জিহ্বা স্থাপন করতেন। আজ এ পিপাসায় তুমি আমার জিভ চুষে নাও। কিছুটা শান্তি হয়তো পাবে। তৃষিত সন্তান ইমামে পাকের জিভ চুষলেন। বাস্তবিকই তার কিছুটা স্বস্থি বোধ হল। দ্বিতীয় বার বিদায় দেবার সময় ইমামে পাক প্রিয় পুত্রের মুখে বৃদ্ধাঙ্গুলী রাখলেন। তিনি আবার ময়দানে অভিমুখী হলেন। শত্রু সৈন্যের সামনে এসে ডাক দিলেন

( একাকী লড়ার মত কেউ কি আছে?) আমর বিন সা'দ তারেক বিন শীশকে বলল, “বড় লজ্জার কথা তো, এ তরুণ হচ্ছে একা, আর তোমরা আছ সহস্র সৈন্য, তোমাদের মধ্যে কারো সাহস হচ্ছে না তার সামনে যেতে! শেষ পর্যন্ত সে এগিয়ে এসে হামলা চালাল, আর তোমাদের সৈন্য সারি তছনছ করে দিল, তোমাদের বীর জওয়ানদের খতম করল। ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, প্রচন্ড রোদে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত, শ্রান্ত! এর পরও সে তোমাদের চ্যালেঞ্জ করে হুঙ্কার ছাড়ছে? আর তোমাদের কেউ তার সামনে যাবার সাহস করছ না। ধিক তোমাদের বীরত্বের দাবীকে! আত্মমর্যাদা কিছু থাকে তো, এ তরুণের মোকাবিলা করে তাকে শেষ করে দাও। যদি তুমি তা করতে পার, তবে ওয়াদা করছি তোমাকে মৌসেল'র শাসনভার দিয়ে দেব।” তারেক বলল, “দেখো শেষে আবার এটা হবে না তো যে, আমি

নবী-দৌহিত্র, ফাতেমার দুলালকে কতল করে নিজের আখেরও বরবাদ করব, আর তুমিও ওয়াদা পূরণ করবে না।” 

ইবনে সা'দ শপথ করে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করল। এবার বদ নসীব মৌসেল এর হুকুমত লাভের লালসায় রাসুল কাননের ফুল'র সাথে মোকাবিলা করতে বের হল । সামনে আসামাত্রই সে নবী সদৃশ (আলী আকবর) মহান সত্তার প্রতি বর্শা ছুঁড়ে মারল । অভিজাত পুরের রাজপুত্র সুনিপূণ রণকৌশলে তার আক্রমন প্রতিহত করে শত্রুর বিদ্বেষপূর্ণ বক্ষে বর্শার এমন এক আঘাত চালালেন যে, তাঁর বক্ষ ভেদ করে চলে যায়। আর সে ঘোড়ার পিঠ থেকে ঢলে পড়ে। শাহজাদা তার লাশ পদদলিত করলেন। এটা দেখে তার পুত্র আমার বিন তারেক ক্রোধোম্মত্ত হয়ে প্রিয় দর্শন শাহজাদার উপর আক্রমণ চালাল। শাহজাদা সে আক্রমণ থেকেও নিজেকে বাঁচিয়ে এক হায়দরী হামলায় সে দুশমনের দফারফা করে তাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলেন। তার পর তারেকের দ্বিতীয় পুত্র তালহা বিন তারেক নিজ পিতার ও ভায়ের বদলা নিতে আগুনের হল্কা হয়ে ইমামজাদার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। হুসাইনজাদা তার মোকাবেলা করলেন এবং তাকেও রক্তে ধুলোয় মিশিয়ে শত্রু সৈন্যদের হায়দরী সিংহের এমন ভীতি-আক্রান্ত করে দিলেন যে, সবাই হতভম্ব হয়ে রইল।


ইবনে সা'দ খ্যাতিমান বাহাদুর মিসরা' বিন গালিবকে হুসাইনতনয়ের মোকাবিলায় পাঠাল। মিসরা' বর্শা নিয়ে শাহজাদার উপর হামলা চালাল। শাহজাদায়ে হুসাইন তলোয়ার চালিয়ে সে হামলা রুখে দিয়ে মিসরা'র মাথায় এমন হায়দরী আঘাত হানলেন যে, মিসরা' দুটুকরো হয়ে পড়ে রইলেন। এখন শাহজাদার মোকাবিলা একাকী করতে আর কারোরই হিম্মত হচ্ছিল না। শেষতক 'ইবনে সা'দ মাহকম বিন তোফাইল বিন নওফেলকে এক হাজার আরোহী সৈন্য নিয়ে হযরত আলী আকবরকে আক্রমন করতে হুকুম দিল। নিৰ্দেশমত ঐ দুর্বৃত্তরা তাঁকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে হামলা চালাল। ইমামের শাহজাদাও সাহস-বীরত্বের জৌলুস দেখিয়ে শত্রু নিধন করতঃ রক্তে ধুলোয় মেশাতে থাকলেন। কিন্তু চতুর্দিক থেকে আসা মুহুর্মুহু তীর বর্শার অবিরাম হামলায় তিনি জর্জরিত হয়ে গেলেন এবং প্রচুর রক্তক্ষরণে ক্রমশঃ দূর্বল হয়ে হাতপা অসাড় অনুভব করতে লাগলেন। হাত তাঁর অবশ হতে চলল আর চতুর্দিক থেকে উপর্যপরি তলোয়ার আসতে থাকল। এভাবে ফাতেমী কাননের এ রক্তিম পুষ্প নিজ রক্তে স্নাত হয়ে গেলেন ।


“বর্ণাঘাতে কার সে বাছার দীর্ণ হল বুক, 

লাশের পরে অসুর নাচে পায় তারা কী সুখ? 

রণাঙ্গনে ডাক পড়ে কে আব্বা, আব্বা হায়; 

তাঁবু ছেড়ে বাইরে এসে কে বলে, 'বাপ, আয়? 

মর্ত্যেরই এ পরীক্ষাতে কাটল সময় ঢের, 

শ্বাপদ কুলে হারাই মানিক এই যে সময়ের। 


শাহ জাদা ঘোড়ার পিঠ থেকে ঢলে পড়তে পড়তে ডাক দিলেন–


“করুন স্বরে এ আর্তি যেই শুনেন আব্বাজান, 

সহিষ্ণুতার পাহাড় তবু হৃদয় যে খান খান 

নাঙ্গা পায়ে ছুটেন তিনি, বক্ষে চেপে হাত, 

করব কী হে আলী, আমি কত সই আঘাত? 

স্বজনহারা এই মুসাফির একা যাই কোথা? 

অসহায় এ বাপের এমন বিচ্ছেদ ও ব্যথা ! 

সজল চোখে খুঁজেন কোথায় মোর আলী আকবর? 

কোথায় শুয়ে আমার মানিক দাও মোরে খবর। 

যালিম তোরা, বলতো এখন দিনের আলো কই? 

আমার চাঁদে বাদল ঘিরে আঁধার নামে ওই। 

বলো, বেটার ঝাঁঝরা বুকে আছে নাকি প্রাণ? 

কোন্ সে তীরে ব্যঘ্র শাবক শুয়েছে নিষ্প্রাণ? 

কেঁদে বলেন, জল্লাদেরা বলো গো আমায়, 

আকবরের ওই লাশটা দেখাও আছে সে কোথায় ?

শোনরে, নচেৎ তার পাশে আজ শুইয়ে দে আমায়, 

কাটরে আমায়, নয়তো দেখা সেই প্রিয় বাছায়। 

সৈয়দ এই মুসাফির আজ ক্লান্ত যে তৃষ্ণায়, 

তোমাদেরই নবীজির এ দৌহিত্র হায়”! 

এই না বলে হুসাইন যিনি দুই কুলে সুলতান, 

রক্তে ভেজা দেখেন যবে সেই প্রিয় সন্তান। 

দুঃখে ভাঙ্গে বুকটা আরো ন্যুজ্ব হয় কোমর, 

প্রাণটা আসে মুখে দেখে, ভাঙ্গা সেই পাঁজর।“ 

আকবর গো, তোমার দুঃখে ভাঙ্গবে যে পাষান, 

বাপ কেন আজ থাকবে ধরায় হারিয়ে সন্তান? 

কাঁদেন ইমাম যেই না হেরে দুঃখেরই পাহাড়, 

শত্রু যেন দেখে না লাশ, কভু নিজ বেটার, 

বুড়ো বাপে রেখে চলে যুবক সন্তানে, 

ক্ষুধার মুখে তীরের জখম খেল ওই জানে। 

তোমায় বুঝি দুঃখ দিল ঘাতের পরে ঘাত, 

কুরবান হই দুঃখী বাবা, তোমার দুঃখের সাথ।


কারবালার মজলুম শাহজাদার শির মোবারক নিজ কোলে তুলে নিলেন আলী আকবর চোখ খুললেন।

“নয়ন মেলে সামনে দেখেন পিতাকে আকবর, 

জিভ দেখালেন শুষ্ক এমন তৃষিত অধর। 

অন্তিমতার পাংশুটে রূপ ঘিরলো চাঁদ বদন, 

এপাশ ওপাশ ফিরলো দুবার জড়িয়ে আসে স্বর। 

ভবের লীলা সাঙ্গ করে বুজলো দুই নয়ন, 

হুসাইনের ওই ঘর যে উজাড় সে যোহরের ক্ষণ।


অমিত তেজী যুবক পুত্র যখন বাবার কোলে এসে প্রিয় জীবন আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে সঁপে দিয়ে ফেরদৌস অভিমুখে যাত্রা করলেন, তখন মজলুম পিতা তাঁর পুত্রের লাশ মোবারক কারবালার মাটিতে শুইয়ে দিয়ে বললেন, 

“বৎস, তোমায় যারা কতল করেছে, আল্লাহ্ তাদের কতল (ধ্বংস) করুন।” 

এ লোক গুলো আল্লাহ্ ও রাসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এর মর্যাদা হানি করতে কী স্পর্ধা দেখাল। প্রিয় সন্তান আমার। তোমার পরে ধিক্ এই পৃথিবীকে!


শত্রু সেনাদের অন্তর্ভূক্ত হুমাইদ বিন মুসলিমের বর্ণনা, 'আমি দেখলাম, তাঁবুর মধ্য থেকে এক ভদ্র মহিলা দৌড়ে বেরিয়ে আসলেন, তিনি এমন রূপ ঐশ্বর্যের অধিকারী ছিলেন যে, মনে হলো যেন হঠাৎ এক সুর্যের উদয় হয়েছে। তিনি “ভাইয়া, হায়রে আমার ভাইপো!" বলে আর্তনাদ করতে করতে আসছিলেন। পাগলপ্রায় হয়ে আলী আকবরের লাশের পর মূর্ছিত হয়ে পড়ে গেলেন। আমি লোকদের কাছে মহিলার পরিচয় জানতে চাইলে তারা বললো, “ইনি হুসাইনের সহোদরা যয়নব বিনতে ফাতিমা বিনতে রাসুলুল্লাহ সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম।'


প্রিয় আমার দীর্ঘকেশী লুকালে কোথায়,

বিজন দেশে ময়না আমার হারালে কোথায়? 

কোথায় তোমার চোট লেগেছে দেখাও সে আমায়, 

দুঃখিনী এই ফুফুর বুকে প্রাণ রাখা যে দায়! 

অষ্টাদশী এই জীবনেই সমন এলো হায়, 

শ্যন পড়েছে কোন্ সে চোখে আমার কলিজায় ?”


ব্যথিত হৃদয়, বিষণ্নচিত্ত এ ফুফুই শাহজাদা ইমাম আলী আকবরকে বড় যত্নে লালন পালন করেছিলেন। মহিলাদের তাঁবু থেকে এতক্ষণ শাহজাদার প্রলঙ্করী শাহাদাতের দৃশ্য অবলোকন করছিলেন, যখনই প্রিয় ভাতিজাকে রক্তেধুলোয় গড়াতে দেখলেন, অধৈর্য হয়ে পড়লেন, নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা মোটেই অবশিষ্ট রইল না। তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এসে ভাতিজার খন্ডবিখন্ড লাশের পাশে পড়ে গেলেন। কারবালার মজলুম (ইমাম হুসাইন) দুঃখিনী বোনের এ দশা দেখে তাঁর হাত ধরে তাঁবুতে নিয়ে গেলেন এবং বললেন, রাসূলের প্রিয় আহলে বায়ত, আল্লাহ্ তায়ালা আজ তোমাদের ধৈর্যের শেষ দেখতে চান। ধৈর্য্য ও সংযম এর পরিচয় দাও। আজ সবকিছু কুরবানী দিয়ে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করে নাও। 

ইমাম তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসলেন। শাহজাদার লাশ মোবারাক, প্রাণপ্রিয় পুত্রের খন্ডিত দেহ উঠিয়ে তাঁবুর পাশে এনে রাখলেন। এর পর আসমানের দিকে তাকিয়ে রাব্বুল ইযযতের দরবারে আরজ করলেন, “মাবুদ, আজ তোমার একজন অনুগত বান্দা তোমারই উদ্দেশ্যে তার সবচে' বড় নযরানা পেশ করে ইবরাহীম (আ.) এর সুন্নত পালন করল। মাওলা, আমার এ অর্ঘ্যটুকু গ্রহণ করে আমায় ধন্য করো। (রাদি আল্লাহু আনহু)


বিপন্ন, বিরহী জননী যখন তাঁরই নয়নমণি সন্তানের টুকরো হয়ে যাওয়া লাশ দেখলেন তখন আর্তনাদ করে বলে উঠলেন,–

“কোথায় গেলি হে ফাতেমার লা'ল আমারও বুকের ধন? 

কোথায় হারালি দুঃখিনী মায়ের জীবনের বন্ধন ? 

তিন দিন ধরে পিপাসায় ছিলি, কোথায় লুকালি আজ? 

নবীর আহলে বাইতের ধন, পরিলি খুনের সাজ? 

মরি, মরি, আমি প্রাণের দুলালে একটির বার তো দেখি, 

মুহাম্মদের প্রতিচ্ছবিটি আরেকটিবার দেখি।”

--

Comments

Popular posts from this blog

শুধু মুখে কলেমা পড়লে জান্নাত যাওয়া যাবেনা

মসনবী শরীফ বই - মউলানা রুমী (রহঃ)