কারবালা – ৪৬



কারবালার ইতিহাস (পর্ব -৪৬)
📚শামে কারবালা

আশুরার রাত ৯ই মুহররম—
ইমামে পাকের মেঝো ছেলে হযরত যয়নুল আবেদীন বলেন, “বৃহস্পতিবার (কারবালার ঘটনার আগের দিন) সন্ধ্যায় আমি বসা ছিলাম। আমার ফুফু সাইয়িদা যয়নব আমার শুশ্রূষায় নিমগ্ন, এমন সময় আমার আব্বাজানের কাছে হযরত আবুযর গিফারীর আযাদকৃত গোলাম হুওয়াই বসে বসে তলোয়ার ধার দিচ্ছিলেন, আর নিম্নোক্ত শেয়ের গুলো আবৃত্তি করছিলেন।

“আফসোস হায় কেমনরে তুই সময় অকাল, 
ভুলে যাস ত্বরা আপন স্বজন, সন্ধ্যা সকাল। 
কত জ্ঞানী গুণী বলি দিয়ে তুই করিস বেহাল, 
হায়রে সময় মিটে না কি তোর সে মনের ঝাল? 
আল্লাহর দিকে সব তরী শেষে উঠায় তো পাল, 
চলবে এমন যিন্দা সবার একটিই চাল, 
ঘনিয়ে এল এতটাই কি যাবার সে কাল!
মহিমা গাহি সেই আল্লাহর, যিনি লা-মেসাল। 

তিনি বার বার শেয়েরগুলো পড়ছিলেন। আমি তার সংকল্প ও মনের ভাব বুঝে ফেলি। আর এটাও বুঝতে পারি যে, দূর্যোগের ঘনঘটা সমুপস্থিত।
নিজেরও অজান্তে হয় অশ্রুপাত। তবুও ধৈর্য আর সংযমের মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রন করে চলি।
 কিন্তু আমার ফুফু হযরত যয়নবও শেয়েরগুলো শুনলেন এবং তাঁর মানসিক অবস্থা টের পেয়ে গেলেন, তলোয়ার ধার দেয়া হচ্ছিল। তিনি ধৈর্য রাখতে পারলেন না। ধৈর্যহারা হয়ে আমার আব্বাজানের কাছে এসে কান্না জুড়ে দিলেন। 

বলতে লাগলেন "হায়রে আজ যদি আমার মরণ হতো। হায়রে, মা জননী ফাতেমা, আব্বাজান আলী মূর্তজা, ভাই হাসানও চলে গেলেন। ভাইয়া, আপনি গত হয়ে যাওয়া তাদের স্থলাভিষিক্ত, আমাদের সংরক্ষক, আর পরম আশ্রয় ছিলেন।” 

বোনের এ অস্থিরতা এবং বিচলিতভাব দেখে তিনি বললেন, 
“দেখো বোন, শয়তান যেন তোমাদের ধৈর্য, সম্ভ্রম আর বিবেক বুদ্ধি লোপ না করে দেয়?” 

বোন বললেন, “আমার মা-বাপ আমার তরে উৎসর্গ আপনার পরিবর্তে আমি নিজের জীবন বিসর্জন দিতে চাই।” 

বোনের বেদনাসিক্ত, দরদপূর্ণ এ হাল তাঁকেও সামান্য বিচলিত করে তুলল। ভারাক্রান্ত হৃদয় অশ্রু বিগলিত হয়ে ঝরতে লাগল। বললেন, 
দুর্যোগ যদি একটিও রাত ছাড়তো তবে সে নিদ্রিত হত ! এটা শুনে হযরত যয়নবের অবস্থা আরও বেগতিক হল। বিলাপ করে ক্রন্দন করতে লাগলেন, আর বলতে লাগলেন "জোর জুলম কি আপনাকেও আমাদের থেকে ছিনিয়ে নেবে? আমার কলিজা তো ফেটে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” একপর্যায়ে চিৎকার করে বেহুঁশ হয়ে পড়লেন । 

আব্বাজান তাঁর মুখে পানি ছিটিয়ে দিলেন, তাঁর চেতনা ফিরে আসলে আব্বাজান বললেন, “বোন আমার! আল্লাহকে ভয় কর, তাঁর কাছে ধৈর্য ও শক্তি কামনা কর। জেনে রেখো, যমীনবাসী সকলেই মৃত্যু বরণ করবে, আর আসমানবাসীরাও কেউ বেচেঁ থাকবে না। আল্লাহ্ পাক জাল্লাশানুহুর পবিত্র সত্তা ছাড়া সকলেই ফানা হবে। আমার আব্বা, আম্মা, আমার ভাই এরা তো আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন, তাঁদের জন্য এবং প্রত্যেক মুসলমানের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ছিলেন আদর্শের দৃষ্টান্ত। সে দৃষ্টান্ত থেকে ধৈর্যের শিক্ষা নাও।” 
এ রকম আরও কথাবার্তা বলে তাকে সান্তনা দিলেন। অতঃপর বললেন “প্রিয় বোন আমার, আমি তোমাকে শপথ দিচ্ছি, আমার এ শপথ পূর্ণ করো।

 শোনো, আমার ওফাতের পর (অধৈর্য হয়ে) জামাকাপড় ছেঁড়া-ছেঁড়ি করবে না, মুখে আচঁড়ও কাটবে না, হল্লামাতম কিংবা বিলাপ করবে না।” বোনকে সবর ও ও শোকর, ধৈর্য -নিয়ন্ত্রনের তালীম দিয়ে তিনি তাঁবুর বাইরে আসলেন। সাহায্যকারীবাহিনীকে প্রতিরক্ষা জরুরী ব্যবস্থার নির্দেশমূলক দিলেন।

তাঁবুগুলো পরস্পর কাছাকাছি নিয়ে আসা হলো। তাঁবুর রশি একটির সাথে অপরটা সংযুক্ত করে দেয়া হলো । তাঁবুগুলোর পেছন দিকে পরিখা খনন করা হল। আর তাতে লাকড়ি ও ডালপালা স্তুপ করা হল, যাতে তুমুল যুদ্ধের মূহুর্তে আগুন লাগিয়ে দেয়া যায়। এর ফলে পেছন থেকে শত্রুরা হামলা করতে পারবে না। এর পর সকলে ইমামের সাথে সারা রাত নামায, দুআ, ইস্তেগফার এবং বিনয় বিগলিত একান্ত রোদনে কাটিয়ে দিলেন।

“হুকুম দেন এ তাঁবু গুলোর করো হে খুব হেফাজত, 
তাঁবুর পিছে গভীর গর্ত খুঁড়তে বললেন হযরত। 
আসতে যেতে একটি রাস্তা রাখবে শুধু সেই না পথ, 
গর্ত জুড়ে আগুন লাগাও'- দিলেন তিনি এমনি মত, 
অমনি খুড়তে লাগলো সবাই যেইনা পেল এজাযত, 
গর্তে আরো জ্বাললো আগুন যেমনটি চান সে হযরত 
সেই ফজরের নামাযেতে ছিলো যে তাঁর ইমামত, 
বিনয় ভক্তিপূর্ণ এই যে ছিল তাঁর শেষ এবাদত। 
লুটল সবাই সিজদারই স্বাদ, এমনি ছিল সে কসরত, 
মুখগুলো সব নিল যে স্বাদ কতই ভক্তি মহব্বত ! 
অবশেষে তাঁবুর দিকেই ফিরলো যে তাঁর গতিপথ, 
মুহররমের দশতারিখে ঘটলো সূর্যের যিয়ারত।
সিজদা এবং নামাযেতে মর্যাদার এ ভোর, 
বিনয় এবং এবাদতে সে কান্নার এ ভোর 
হায়রে এ ভোর, বিপদ এবং মুসীবতের ভোর, 
মুহররমের দশ তারিখ এ শাহাদতের ভোর। 
সর্বহরা সর্বনাশা বিষাদের এই দিন, 
প্রিয় নবীর বংশধরের নিধনের এই দিন।

পরবর্তী পর্ব - 
ছোট কিয়ামত

Comments

Popular posts from this blog

শুধু মুখে কলেমা পড়লে জান্নাত যাওয়া যাবেনা

মসনবী শরীফ বই - মউলানা রুমী (রহঃ)